বেঁচে আছেন তাঁরা, অথচ ছড়ানো হচ্ছে মৃত্যুর গুজব

বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাসকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে সিঙ্গাপুরে, সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছে তাঁর মৃত্যুর গুজব। তাঁর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তির পাশাপাশি ধর্মীয় আলোচক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের নিয়েও মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েছে সম্প্রতি। এই গুজব ছড়াতে কখনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের ফটোকার্ডের আদলে ফটোকার্ড তৈরি করা হচ্ছে, কখনো আবার এআই দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসকে অসুস্থ অবস্থায় ১১ মার্চ ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুটি অস্ত্রোপচারের পর ১৫ মার্চ সকালে তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয় সিঙ্গাপুরে।

তিনি ঢাকার হাসপাতালে থাকার মধ্যেই ফেসবুকে যমুনা টিভির ফটোকার্ডের আদলে বানানো একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে মির্জা আব্বাসের ছবির সঙ্গে লেখা হয়– ‘না ফেরার দেশে চলে গেলেন মির্জা আব্বাস।’ যাচাই করে দেখা যায়, এমন কোনো ফটোকার্ড যমুনা টিভি প্রকাশ করেনি। তাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেল ঘেঁটে ওই দাবির কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি।

তবে একই নকশার একটি ফটোকার্ড পাওয়া যায়, যেখানে লেখা ছিল—‘উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়া হচ্ছে মির্জা আব্বাসকে।’ ওই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে ভুয়া শিরোনাম বসিয়ে গুজবের ফটোকার্ডটি করা হয়েছে।

রিউমর স্ক্যানার সোমবার তাদের এক প্রতিবেদনে মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানায়। তাঁর ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) মিজানুর রহমান সোহেল বলেন, মির্জা আব্বাস সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তাঁর মৃত্যুসংক্রান্ত প্রচারিত দাবিটি মিথ্যা।

এর আগে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজাকে নিয়েও মৃত্যুর গুজব ছড়ায়। একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, কুষ্টিয়ার প্রশাসনিক ভবনে সংবাদ সম্মেলনের সময় হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

তবে যাচাই করে দেখা যায়, এই দাবিরও কোনো ভিত্তি নেই। একই সঙ্গে মূলধারার কোনো গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রেও তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের একটি ভিডিওতে তাঁকে সুস্থ অবস্থায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

লিংক

এরপর আলোচিত ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীকে নিয়েও গুজব ছড়ানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়, তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মারা গেছেন। এমনকি হাসপাতালে ভর্তি অবস্থার একটি ছবিও প্রচার করা হয়।

কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, আজহারীর মৃত্যুর দাবিটি সঠিক নয়। প্রচারিত ছবিটিও বাস্তব নয়; এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

আজহারীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করেও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কোনো দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং সেখানে নিয়মিত বিভিন্ন পোস্ট প্রকাশ হতে দেখা গেছে।

লিংক

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মা মারা গেছেন বলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ায়।

এ নিয়ে আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ৮ মার্চ প্রকাশিত এক অ্যাডমিন পোস্ট পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়, ‘মাননীয় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের শ্রদ্ধেয় মায়ের মৃত্যুর খবরসংক্রান্ত যে তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। সবাইকে এ ধরনের গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা এবং বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো যাচ্ছে।’

তারও আগে কণ্ঠশিল্পী হায়দার হোসেনকে নিয়েও মৃত্যুর গুজব ছড়ানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৈনিক যুগান্তরের ফটোকার্ডের আদলে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়—তিনি ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

যাচাইয়ে জানা যায়, এমন কোনো ফটোকার্ড যুগান্তর প্রকাশ করেনি। সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট বা ইউটিউব চ্যানেলেও এ ধরনের কোনো সংবাদ নেই।

আলোচিত দাবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হায়দার হোসেনের নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়, ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কৃপায় আমি বেঁচে আছি এবং ভালো আছি। আমাকে আপনাদের প্রার্থনায় রাখার জন্য ধন্যবাদ।’ (অনূদিত)

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ফটোকার্ড, এআই দিয়ে তৈরি ছবি কিংবা সম্পাদিত গ্রাফিক্স ব্যবহার করে পরিচিত ব্যক্তিদের মৃত্যু বা দুর্ঘটনার গুজব ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। এসব কনটেন্ট অনেক সময় জনপ্রিয় ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমের ডিজাইন নকল করে তৈরি করা হয়, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই বিভ্রান্ত হন। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কোনো দাবি দেখলে তা যাচাই না করে বিশ্বাস বা শেয়ার না করার পরামর্শ দিচ্ছেন ফ্যাক্ট চেকাররা।