সেই চিকিৎসক সঠিক রোগনির্ণয় না করে একের পর এক উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন পুশ করেন। একবার বলেন টাইফয়েড, আরেকবার বলেন ম্যালেরিয়া। এমনকি এমনও পরীক্ষার বিল করা হয়েছে, যে টেস্ট করানোই হয়নি।’

আরজিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ‘৯ সেপ্টেম্বর বাচ্চার বুকে ইনফেকশন আছে বলে আমাদের কোনো অনুমতি ছাড়া পিআইসিইউতে নেওয়া হয়। অথচ পরে বুকের এক্স–রে রিপোর্ট দেখি স্বাভাবিক। এরপর মেয়েকে দেখতে বারবার অনুরোধ করলেও তারা দেয়নি। আমার মেয়ে পিআইসিইউতে রাত ১১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত চিৎকার করে কাঁদে। জোর করে রাতে ভেতরে ঢুকে দেখি, মেয়ে পানির জন্য কাঁদছে। তাকে তারা বিভিন্নভাবে অত্যাচার করছে, সে জন্য কাঁদছে।’

শিশুটির মা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘চিকিৎসকেরা আমাদের ব্যস্ত রাখতে একবার ডায়াপার লাগবে বলে, আরেকবার রক্তদাতা লাগবে বলে। রক্ত না দিয়েও ৪০ হাজার টাকা বিল করে। কত কত অত্যাচার করে শেষ অবধি তারা একমাত্র মেয়েটাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল।’

এসব গত সেপ্টেম্বরের কথা। আরফিয়ার মা থানা, মেডিকেল কাউন্সিল আর সংবাদমাধ্যমের দ্বারে দ্বারে মাথা কুটে চলেছেন।

একইভাবে রাজধানীর সায়েদাবাদের আবুল কালাম আজাদের শিশুপুত্র মোহাম্মদ সিয়াম আর এক বছরের শিশুকন্যার জ্বর আসে ২৩ অক্টোবর। তিনি পরদিনই চিকিৎসকের কাছে ছুটে যান। পরীক্ষায় দুই সন্তানের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সিয়ামের প্লাটিলেট ২৩ হাজারে নেমে যাওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হলে ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। ২৮ অক্টোবর চিকিৎসক তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেদিনই নিউ লাইফ হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। ২৯ অক্টোবর ভোরে সে মারা যায়। ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে তার নাকি নিউমোনিয়াও ছিল।

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। দিন দিন খারাপ হচ্ছে। অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুতে শিশুমৃত্যু হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী দায়িত্ব না নিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘দেশে এডিস মশা ছিল না, ফ্লাইটে হয়তো এই মশা আমাদের দেশে এসেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কম।’

বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আষাঢ়ে গালগল্পে এ ধরনের বাতচিতের চর্চা আমাদের আছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সভায় একজন মন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য ভুক্তভোগীদের কষ্ট দেয়। তারা সিরিয়ার শিশুর মতো আল্লাহর বিচারের আশায় বুক বাঁধে।

মন্ত্রী, মেয়র, আমলা বা দলভক্তরা যা–ই বলুন না কেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, এবার শুধু ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে মারাত্মক রূপ নিয়েছে তা নয়, উপসর্গ ও ধরনে এসেছে পরিবর্তন। ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের বেশি জটিলতা দেখা যাচ্ছে, যা আগে ছিল না। আক্রান্তদের লক্ষণ-উপসর্গ আগের মতো নয়। কোনো কোনো শিশুকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ অবস্থার অবনতিতে অনেকেই মারা যাচ্ছে।

ঢাকার শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ফেরদৌসী হাসনাত সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুরা নানা লক্ষণ-উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে, আগে তেমন ছিল না। পেট ফুলে যাওয়া, পেটব্যথা, বুকে ব্যথা, তীব্র বমি, কারও কালো পায়খানা, কারও নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এবার অনেক ছোট শিশুও আসছে। পাঁচ-ছয় মাসের শিশু তো আছেই, সাত দিন বয়সী শিশুও পেয়েছি।’

৬ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শিশুর হার ১৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। আবার ওই দিন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৫২ জনের মধ্যে ৩৮ শিশু রয়েছে। এ হিসাবে মৃতদের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ। ৩৮ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এদের মধ্যে ৮ শিশুর বয়স পাঁচ বছরের কম, ১৪ শিশুর বয়স ৫ থেকে ১০ এবং ৯ শিশুর বয়স ১০ থেকে ১৫ এবং ৭ শিশুর বয়স ১৫ থেকে ১৮ বছর।

সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ। ফলে শিশুমৃত্যু হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে প্রথম ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সে বছর ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ মৃত্যু ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি বলেছেন, পরিস্থিতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে, যাকে মহামারি না বললেও ভয়াবহ বলতেই হচ্ছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে এই ডামাডোলের মধ্যে চলে গেল ছোট্ট শিশু মধু। তাদের এক শুভানুধ্যায়ী লিখেছিলেন, ‘সালমনিলা অ্যাটাকে নিউমোনিয়ায়’ আক্রান্ত হয়েছিল মধু। চিকিৎসা চলছিল। এরই মধ্যে তার ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। আজ মধু পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

৬ নভেম্বর মধুর মা সবার কাছে দোয়া চেয়ে লিখেছিলেন, ‘মধু ভালো নেই। আমাকে যদি ভালোবাসেন, তবে মধুর জন্য মন থেকে প্রার্থনা করে দেবেন।’ এক দিন পর ৭ নভেম্বর মধু চলে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সালমোনেলোসিসের নিউমোনিয়া বিরল (অ্যাটিপিকাল) ধরনের নিউমোনিয়া। ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণের ১২ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যক্তির জ্বর, পেটে খিঁচুনি এবং ডায়রিয়ার শিকার হয়। প্রচণ্ড পেটব্যথা দেখা দিতে পারে এবং সাধারণত ৪ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়। আরও গুরুতর সংক্রমণ হলে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হতে পারে এবং সংক্রমণ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বা জীবাণুরোধক) দিতে না পারলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু, বয়স্ক ও যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি কম (ইমিউনোকম্প্রোমাইজড), তাদের সালমোনেলোসিস থেকে গুরুতর অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি থাকে। মধু সেপটিক শকে গেল, নাকি ডেঙ্গু শকে গেল; দুই শকের মধ্যে তফাত কী?—এসব প্রশ্নের উত্তরের পেছনে ছুটে মধুকে আমরা আর ফেরত পাব না। কিন্তু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অন্য মধুদের সুস্থ করে তোলাটা জরুরি।

কেন এত মৃত্যু

চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি, বিশেষ করে ঢাকার বাইরে কর্মরত চিকিৎসকদের অনেকেই এই প্রথম ডেঙ্গু মোকাবিলা করছেন। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দেশের জেলা–উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আবাসিক চিকিৎসক, চিকিৎসা কর্মকর্তা যাঁরাই থাকেন, তাঁরা প্রায় সবাই নবীন। তাঁদের অভিজ্ঞতাও কম।

ডেঙ্গু রোগীর জটিলতাকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়। দরকার হয় বিভিন্ন চিকিৎসা–সুবিধার। এসবের অভাবের পাশাপাশি অভিজ্ঞতার ঘাটতি চিকিৎসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জেলা–উপজেলা হাসপাতালে দুপুরের পর প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা হয় না। নেই প্যাথলজিস্টও। অবস্থাটা এমন জেলা-উপজেলায় রোগীর রক্তচাপ, নাড়ি পরীক্ষার বাইরে জরুরি চিকিৎসায় যেন আর কিছুই করার থাকে না।

অবসরে থাকা এক চিকিৎসকের সঙ্গে ডেঙ্গুতে মৃত শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেক জয়গায় না বুঝে রোগীদের প্রয়োজনীয় পরিমাণের অতিরিক্ত স্যালাইন দেওয়া হয়।

মাত্রা ও সময়ের ব্যাপ্তি মাথায় রেখে স্যালাইন দেওয়া হয় না। অতিরিক্ত স্যালাইন দেওয়া হলে সেটা হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি, ফুসফুসসহ দেহের বিভিন্ন অংশে ঢুকতে পারে। এতে রোগীর অবস্থা সঙিন হতে পারে।

এই চিকিৎসক বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়। এতে রক্তক্ষরণ হতে পারে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর প্লাটিলেট লাগলে তাকে প্লাটিলেটই দিতে হবে। অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেক চিকিৎসক ডেঙ্গু রোগীকে রক্ত দেন। ফলে রোগীর শরীরে আরও জটিলতা দেখা দেয়।

হালনাগাদ তথ্যের অভাব

ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু সিনড্রোম ২০১৮ সালের পর আর হালনাগাদ করা হয়েছে কি? ডেঙ্গু রং পাল্টাচ্ছে বছর বছর। ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে এ বছর তিনটি ধরনই (ডেন-১, ডেন-২ এবং ডেন-৪) সক্রিয়। এবার দেশে প্রথমবারের মতো ডেন-৪ সেরোটাইপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় ১০ শতাংশ এই ধরন বহন করছেন। ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির পেছনে এটি অন্যতম কারণ। রোগের লক্ষণ আর উপসর্গের মধ্যেও এবার রকমফের ঘটছে। অনেকেই অন্য রোগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। এটি বিশেষ করে শিশুদের সঙ্গে বেশি ঘটছে।

ডেঙ্গু চিকিৎসকদের নিজেদের মধ্যে একটা অ্যাপভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা দরকার। যেখানে চিকিৎসকেরা তাঁদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করতে পারবেন। চিকিৎসকদের পাশাপাশি জনগণকেও পরিবর্তিত নতুন তথ্য জানাতে হবে। আগে বলা হতো, এডিস শুধু দিনের বেলায় কামড়ায়। এখন বলা হচ্ছে, এটা রাতেও কামড়ায়। এটা অনেকেরই জানা নেই। সর্দি–কাশির সঙ্গে জ্বর হলে দেরি না করে ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে জোর প্রচারণা চালাতে হবে।

শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম তিন দিন জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকবে। জ্বর কমে গেলে সমস্যাগুলো বেশি দেখা দেয়। সে সময় যেন তারা চিকিৎসকের সংস্পর্শে থাকে। শিশুদের প্রচুর পানি ও তরল খাওয়াতে হবে। এ কথাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় জাতীয় কৌশলপত্র দরকার, সেটি এখনো হয়নি। কীটতত্ত্ববিদদের ধারণা, বিগত বছরের মতো এবারও ডেঙ্গু পুরোপুরি যাবে না। এখন থেকে এটি সারা বছর থাকবে। বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের পরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গসহ দুই বাংলায় চলতি বছরের নভেম্বরজুড়ে ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্ত চলবে। তারপর কমলেও শেষ হবে না। আবার সাইক্লোনজনিত বৃষ্টিপাত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে সব দায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে হা–হুতাশ করলে চলবে না। আমাদের অনেক কিছু করার আছে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কাছে সব বলে দেওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কারও রেহাই নেই।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

ই–মেইল: [email protected]