ভূমির সংকটে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী

পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের কার্যকর প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

টাঙ্গাইলের মধুপুরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জমিতে লেক খননের প্রতিবাদে ‘সম্মিলিত আদিবাসী জনতা’র ব্যানারে সমাবেশ। এ আন্দোলন গড়ে ওঠে ২০২২ সালে।ফাইল ছবি: প্রথম আলো

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং গ্রামের কোল জাতিসত্তার পাঁচ পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় গত বছরের ২৭ অক্টোবর। উচ্ছেদের পর তাঁরা আশ্রয় নেন গ্রামের পাশের বাঁশঝাড়ে। সরকারি সহায়তায় কিছু টিন পেলেও তা ছিল কেবল ছাপরা দেওয়ার মতো। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগও বাড়ে। পরে ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কোনোরকমে ঘর উঠলেও ভূমিহীন উদ্বাস্তু হওয়ার বোঝা তাঁদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এখনো।

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর একজন রুমালী হাসদা। তিনি জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে তাঁরা ওই জমিতে বসবাস করছিলেন। তাঁদের জানা ছিল না, জমিটি খাস এবং তাঁরা জানতেন, তাঁদেরই আত্মীয় তিলক মাঝি, দিনু মাঝি, ভাদু মাঝিসহ কয়েকজনের নামে জমিটির রেকর্ড রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক ব্যক্তি ওই জমি রেজিস্ট্রি করে নেন। পরে তাঁর ওয়ারিশেরা আদালতে মামলা করেন। দারিদ্র্য ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কোল পরিবারগুলো মামলা পরিচালনা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় পক্ষে যায়নি।

এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলার ইউএনও মো. নাজমুস সাদাত প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতেই উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে ভূমিহীন মানুষকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ কতটা মানবিক, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এভাবে উচ্ছেদ ঠিক হয়নি, কিন্তু কী করার আছে।’

এই উচ্ছেদের ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা হলেও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে কোল জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ৮২২।

মধুপুরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উচ্ছেদের আতঙ্ক নিয়ে তাঁদের জীবন কাটছে। অনেকের বিরুদ্ধে ‘বন বিনাশের’ মামলা ঝুলছে।
মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া খাসিপুঞ্জি
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

গোদাগাড়ীর কোলদের ঘটনা দেশের সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের দীর্ঘদিনের ভূমিসংকটেরই একটি উদাহরণ। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমানের ‘আ স্টাডি অন স্ট্যাটাস অব ল্যান্ড রাইটস অব প্লেইনল্যান্ড ইনডিজিনাস অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিস ইন নর্থ ওয়েস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের প্রায় সব সূচকেই তাঁরা পিছিয়ে। অথচ তাঁদের ভূমির সুরক্ষায় থাকা বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন বাস্তবে কার্যকর নয় বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও আইনের কার্যকর প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনেক এলাকায় শ্মশানের জমিও নেই। সরকার বদলালে দখলদারও বদলায়, দখলদারি বন্ধ হয় না।
মেইনথিন প্রমীলা, রাখাইন অধিকারকর্মী

পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো সমতলের জাতিসত্তা হিসেবে পরিচিত। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, দেশে এ ধরনের জাতিসত্তার সংখ্যা ৫০-এর বেশি। তবে নির্ভরযোগ্য কোনো সরকারি তালিকা নেই।

উচ্ছেদের শঙ্কা নিয়ে মধুপুরের গারোরা

টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে বসবাসকারী গারোদের অবস্থাও অনিশ্চিত। শত বছর ধরে বসবাস করলেও ১৯৫৬ সালে বনভূমি সংরক্ষিত ঘোষণার মাধ্যমে তাঁদের ভূমির অধিকার সংকুচিত হয়। পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল পার্ক ও সংরক্ষিত বন ঘোষণার ফলে গারোদের ১৩টি গ্রাম উচ্ছেদের ঝুঁকিতে পড়ে। অথচ বনের বড় অংশ এখন কলা ও আনারসের খেতে পরিণত হয়েছে, যার মালিকানা মূলত বাঙালিদের হাতে।

মধুপুরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করা জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উচ্ছেদের আতঙ্ক নিয়ে তাঁদের জীবন কাটছে। অনেকের বিরুদ্ধে ‘বন বিনাশের’ মামলা ঝুলছে।

রাখাইন অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা বলেন, অনেক এলাকায় শ্মশানের জমিও নেই। সরকার বদলালে দখলদারও বদলায়, দখলদারি বন্ধ হয় না।

উপদ্রুত উপকূলের রাখাইনরা

উপকূলীয় পটুয়াখালী ও বরগুনায় রাখাইনদের অবস্থাও ভয়াবহ। উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী ও বরগুনায় ১৯৩০-এর দশকেও ২৩৭টি রাখাইন গ্রাম ছিল। জাল দলিল করে, হুমকি দিয়ে, আইনের ফাঁক দেখিয়ে এসব গ্রাম দিনের পর দিন দখল হয়ে গেছে। ১৯৪৮ সালে এসব অঞ্চলে রাখাইনদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। ২০১৪ সালে বেসরকারি সংগঠন কারিতাসের জরিপ অনুযায়ী, এসব অঞ্চলে রাখাইনদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৬১।

রাখাইন অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা বলেন, অনেক এলাকায় শ্মশানের জমিও নেই। সরকার বদলালে দখলদারও বদলায়, দখলদারি বন্ধ হয় না।

ভূমিহীন ৮০ শতাংশ

২০২৪ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমানের করা ওই গবেষণায় দেখা যায়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ ভূমিহীন। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, এই হার বাস্তবে আরও বেশি হতে পারে।

বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা অনুযায়ী, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জমি হস্তান্তরে রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এই আইন প্রয়োগ হয় না বলে জানান এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তাঁর মতে, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ভূমি সুরক্ষায় পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং রাষ্ট্রের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।