প্রযুক্তি, দেশপ্রেম ও নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা

এমআইএসটিতে সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। ঢাকা, ১৩ মে ২০২৬ছবি: আইএসপিআরের সৌজন্যে

প্রযুক্তি, দেশপ্রেম ও নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়েই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, আধুনিক যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলে চলবে না; প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হতে হবে।

বাংলাদেশ মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) অধ্যয়নরত সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম এ কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে জাতির ক্রান্তিলগ্নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেশের মুক্তিকামী মানুষকে দিকনির্দেশনা ও সাহস জুগিয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে সামরিক সদস্য ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করেছে। তাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করা তরুণ কর্মকর্তাদের জাতীয় দায়িত্ব।

বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের পরিবর্তিত চরিত্র তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল ট্যাংক, কামান বা প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট, তথ্যযুদ্ধ ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। সবকিছু বিদেশ থেকে কিনে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শন ধারণ করে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর ও সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে গ্রুপ ছবিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম (সামনের সারিতে মাঝখানে) ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ঢাকা, ১৩ মে ২০২৬
ছবি: আইএসপিআরের সৌজন্যে

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি। জুলাইয়ের জাতীয় চেতনা রাষ্ট্রের জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও নবায়নের আহ্বানকে সামনে এনেছে। ১৯৭১ এবং জুলাইকে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানো যাবে না।

তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, একজন সামরিক কর্মকর্তা কেবল একজন কমান্ডার নন; তিনি দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক। সৈনিকেরা তাঁদের কর্মকর্তাদের আচরণ, সিদ্ধান্ত, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম অনুসরণ করেন। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে হতে হবে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল। দুর্যোগে জনগণের পাশে দাঁড়ানো, যুদ্ধে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা এবং বিভ্রান্তির সময়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন কর্মকর্তার মৌলিক দায়িত্ব।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উগ্রবাদ, বিভাজনমূলক প্রচারণা, গুজব, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বাস, সহনশীলতা, সহাবস্থান ও মধ্যপন্থার দেশ। ধর্ম মানুষের চরিত্র, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও সাহসকে শক্তিশালী করে, কিন্তু ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা জাতীয় ঐক্য নষ্ট করতে পারে। তাই তরুণ কর্মকর্তাদের চরমপন্থা, সাম্প্রদায়িকতা, মব মানসিকতা এবং বিভ্রান্তিকর বয়ানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এটি গড়ে উঠবে শৃঙ্খলাবদ্ধ চিন্তা, দেশপ্রেম, জ্ঞান, সাহস, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে। তিনি তরুণ কর্মকর্তাদের ‘বাংলাদেশ প্রথম’ আদর্শ ধারণ করে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণরত তরুণ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।