চুয়েটের আন্দোলনে ‘রাজনীতি’ দেখছেন সরকারের কেউ কেউ, শিক্ষার্থীরা বলছেন ভিন্ন কথা
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২২ দিন ধরে অচলাবস্থা চলছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট)। এর মধ্যে নিয়োগের ২১ দিন পর গতকাল সোমবার নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন।
আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাঁকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, নতুন উপাচার্যের পদত্যাগ ও সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন বন্ধ করবেন না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কারও কারও ধারণা, এ আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। এর আগে গত মে মাসে গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে হওয়া আন্দোলন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের পেছনেও রাজনীতি ছিল বলে মনে করেন সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ।
তবে চুয়েটের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গে দলীয় রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনা করেই তাঁরা আন্দোলন করছেন। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।
চুয়েটের একাধিক সূত্রের দাবি, উপাচার্য নিয়োগ ও পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের প্রভাব থাকতে পারে। ওই নেতাদের পছন্দ-অপছন্দের কারণে উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে বলে ক্যাম্পাসে আলোচনা রয়েছে।
এ ছাড়া চুয়েটের শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগ না দিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে গত ২৭ জুলাই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই রাতেই বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা উপাচার্যের বাসভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক শাটডাউন। একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যোগ দেন। ফলে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এ পরিস্থিতি সমাধানে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে কথা হয় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একটি প্রশাসনিক পদ। কাকে দায়িত্ব দিলে বিশ্ববিদ্যালয় ভালোভাবে পরিচালিত হবে, তা সরকার বিবেচনা করবে। শ্রেণিকক্ষের সমস্যা বা শিক্ষা–সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতে পারেন। তবে উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের আন্দোলন করা সমীচীন নয় বলে তিনি মনে করেন।
ওই ব্যক্তি আরও বলেন, তাঁদের ধারণা, চুয়েটের এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। কুয়েট ও ডুয়েটে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে হওয়া আন্দোলনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে তাঁর মত।
তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একজন আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের আন্দোলনের সঙ্গে কোনো দলীয় রাজনীতির সম্পর্ক নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই এই আন্দোলন। তাঁর ভাষ্য, দলীয় রাজনীতির বিষয় থাকলে আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ অংশ নিতেন। কিন্তু এখানে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করাকেই সমাধান হিসেবে দেখছেন তিনি।
চুয়েট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এভাবে একটি উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন অচল হয়ে থাকা উদ্বেগজনক। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। তাঁদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত না করে সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে অচলাবস্থা নিরসন করা।
চুয়েটের একজন শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরাও ক্লাসে ফিরে যেতে চান। এভাবে অচলাবস্থা চলতে থাকলে সেশনজটের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান তাঁরা।