বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের ফোন করে বিদেশ ভ্রমণ ও পেশা সম্পর্কে জানতে চাওয়া এবং পোশাক, আর্থিক সামর্থ্য ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিন নারী। নারীদের একজন বলেন, ইমিগ্রেশন পুলিশের একজন সদস্য তাঁকে বলেছেন, অবিবাহিত মেয়েরা একা দেশের বাইরে যেতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে এ কথাগুলো বলেন বিদেশযাত্রায় বাধা পাওয়া অবিবাহিত ওই তিন নারী। নেপাল ভ্রমণের জন্য যেতে বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা এন্ট্রি পারমিশন ও বিমান টিকিট নিয়ে গত ৮ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন তিন নারী। তবে তাঁদের বিদেশযাত্রা আটকে যায়।
এ প্রেক্ষাপটে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ৩০ আগস্ট পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর অভিযোগ দেন তাঁরা। এতে ফল না পেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেন তিন নারী। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর রিট আবেদনকারী তিন নারী যে অভিযোগ করেছিলেন, তা নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তিন নারীর আইনজীবী ইশরাত হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হাইকোর্টের আদেশের পর অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য তিন তরুণীকে নোটিশ দিয়ে সাক্ষ্য দিতে ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বৃহস্পতিবার উপস্থিত হতে বলা হয়। অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাজারবাগের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা স্টেটমেন্ট (জবানবন্দি) দিয়েছেন। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে জবানবন্দি ও জিজ্ঞাসাবাদ চলে।
‘পরিবারের সম্মতি নিয়েই নেপালে যাচ্ছিলেন’
মেডিয়েশন নিয়ে কাজ করা সংস্থা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটির (বিমস) সঙ্গে ২০২৫ সাল থেকে যুক্ত বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন এক নারী। তিনি বলেন, নেপালে বিমসের প্রতিনিধি থাকায় সেখানে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তাঁরা। নেপালে ভ্রমণের প্রস্তুতি নেন। পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করেই তাঁরা নেপাল যাচ্ছিলেন। বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে টার্মিনালে যাওয়ার পথে তাঁদের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম থেকেই কুরুচিপূর্ণ আচরণ করা হয়। স্টুডেন্ট আইডি কার্ডের ছবি নিয়ে নানা বাজে মন্তব্য করা হয়। স্টুডেন্ট আইডিতে হিজাব পরা ছবি থাকায় একজন (পুলিশ সদস্য) বলেন, ‘একেক সময় একেক বেশ ধরেন।’ তাঁর ভ্রমণ বিষয়ে জানাতে বাবাকে ফোন করেন। বাবাকে বলা হয়, ‘আপনার মেয়ে কী করে না করে খবর রাখেন? কৃষকের মেয়ে হয়ে কী করে ঘুরতে দেশের বাইরে যাচ্ছেন?’
এরপর সেখান থেকে বের হয়ে আসেন জানিয়ে ওই তরুণী বলেন, এ ঘটনায় তাঁর বাবা ট্রমার (মানসিক সংকট) মধে৵ পড়ে যান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট তার বাবা দুর্ঘটনার শিকার হন এবং পরে মারা যান।
‘অবিবাহিত, তাই আপনাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না’
২০২৩ সাল থেকে বিমসের প্রশিক্ষক ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করছেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এক নারী। তাঁর ভাষ্য, ৮ আগস্ট তিনি আরও দুই সহকর্মীকে নিয়ে নেপালে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে যান। বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে টার্মিনালে প্রবেশ করেন। টার্মিনালের ডেস্কে পাসপোর্টসহ অন্য কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য দেন। এরপর তাদের পাশের ডেস্কে ও পরে তিনজনকে (তিন নারী) অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। অফিসে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাকে পাশে রেখে বাকি দুজনকে (দুই নারী) প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্য থেকে একজন তিন নারীর একজনের বাবাকে ফোন করেন। তখন তাঁকে বাইরে যেতে বলেন।
নিজেদের কাছে বৈধ কাগজপত্র ছিল, তবে তা যথাযথভাবে যাচাই না করে অসংগতিপূর্ণ প্রশ্ন করা হয় বলে এই নারীর অভিযোগ। তাঁর ভাষ্য, হোটেল বুকিংয়ে নেপালি ব্যক্তির পরিচয় দেখে তা নিয়েও বাজে মন্তব্য করা হয়। পরবর্তী সময়ে একজন পুলিশ সদস্য এসে তাঁদের নাম ঘোষণা করলে, তাঁরা নিজেরা মনে করেছিলেন যে তাঁরা শেষ পর্যন্ত যেতে পারছেন। তখন তিনি ওই পুলিশ সদস্যের কাছে জানতে চান তাঁদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে। তখন তিনি (পুলিশ সদস্য) জানান, আপনাদের (তিন নারী) অ্যারাইভাল টার্মিনাল দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়া হবে। তখন তাঁরা বের করে দেওয়ার কারণ জানতে চান। তখন তিনি (পুলিশ সদস্য) বলেন যে আপনারা অবিবাহিত তাই আপনাদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
বের করে দেওয়ার সময় কোনো লিখিত কাগজপত্র দেওয়া হয়নি জানিয়ে এই নারী বলেন, বাইরে এসেও তিনি বারবার বলতে থাকেন, তাঁরা টার্মিনালের বাইরে যাবেন না। তখন তিনি (পুলিশ সদস্য) জানান যে এখানে থাকলে আপনাদের সমস্যা হবে।
‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য করা হয়
বিমসে কাজ করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আরেকজন নারী। তাঁর ভাষ্য, ৮ আগস্ট নিয়ম মেনে বোর্ডিং পাস গ্রহণ করে টার্মিনালে প্রবেশ করেন। টার্মিনাল থেকে অফিসের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর কাছে স্টুডেন্ট আইডি দেখতে চাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনকে ফোন করতে বলা হয়। তখন তিনি বলেন, ডিনকে ফোন করা কেমন হবে। এরপর উপস্থিত পুলিশ সদস্য তাঁকে বলেন যে তিনি প্রয়োজনে তাঁর ঊর্ধ্বতনকে ফোন করতে পারেন। তাহলে তিনি (ওই নারী) কেন ডিনকে ফোন করতে পারবেন না?
বোর্ডিং পাস, বৈধ পাসপোর্ট, হোটেল বুকিং ও ডলার এনডোর্সমেন্ট—সব বৈধ ডকুমেন্ট নিয়েই এই নারী গিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁর (নারীর) ভ্রমণের টাকার উৎস কী তা জানতে চাওয়া এবং তাকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। পরে পুলিশ সদস্যরা তাঁর পাসপোর্ট রেখে দেন।
অফিসে উপস্থিত পুলিশ সদস্য তাঁদের অভিভাবকদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে জানতে চান, তাঁরা জানেন কি না, তাঁদের মেয়ে দেশের বাইরে যাচ্ছেন এবং তাঁদের পেশা নিয়েও প্রশ্ন করা হয় বলে দাবি করেছেন এই নারী। তাঁর অভিযোগ, পোশাকসহ পাসপোর্টের বিষয়ে নানা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে যা ছিল
বৃহস্পতিবার তিন নারীর কাছে জানতে চাওয়া হয় যে নেপালের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার কোনো আমন্ত্রণ ছিল কি না? জিজ্ঞাসার জবাবে তিন নারী বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ভ্রমণ করা। যেহেতু নেপালে বিমসের শাখা আছে, তাই ভ্রমণের মধ্যে সেখানকার কোঅর্ডিনেটর (সমন্বয়ক) সিমরানের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে নেপালের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও নৈশভোজের কথা ছিল।
নেপালের হোটেল বুকিং এবং রিটার্ন টিকিট ছিল কি না, এই প্রশ্নে তিন নারী বলেন, ছিল। যেখানে ইন্টার্ন করছেন সে প্রতিষ্ঠানের কোনো অনাপত্তি (এনওসি) ছিল কি না, এর উত্তরে তিন নারী বলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এনওসি প্রয়োজন হয় না।