গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। দেশে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতি ডলারের দাম ৯৪ টাকা। তবে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

দেশে যেসব মুঠোফোন উৎপাদিত হয়, তা মূলত বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করে এখানে সংযোজন করা হয়।

মুঠোফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ডলারের দাম বাড়ায় কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়েছে। ফলে খুচরা বাজারে মুঠোফোন বিক্রির দামে একটা প্রভাব পড়েছে।

গত মাসে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পরপরই মুঠোফোনের দাম বেড়ে যায় বলে জানান বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নতুন বাজেটে ব্যবসায়িক পর্যায়ে মুঠোফোনে দেওয়া ৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন দেশে স্মার্টফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিল, এতে বাজারে সেটের দাম ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। বাস্তবে হয়েছেও তা-ই।

রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে ভিভোর আউটলেটের বিক্রয়কর্মী মো. নোমান বলেন, ভিভোর একটি নির্দিষ্ট মডেলের স্মার্টফোন কিছুদিন আগে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। কিন্তু এখন তার দাম বেড়ে ১৭ হাজার টাকা হয়েছে। দাম বাড়ায় জনপ্রিয় এ মডেলের বিক্রি কমে গেছে।

মুঠোফোন বেচাকেনার অন্যতম প্রতিষ্ঠান সোয়্যাপের বসুন্ধরা শপিং মল আউটলেটের কর্মী রোকনুজ্জামান বলেন, আগে দিনে ২৫ থেকে ৩০টি স্মার্টফোন বিক্রি হতো। কিন্তু এখন তা কমে ১০ থেকে ১৫টিতে নেমে এসেছে।

স্যামসাংয়ের এক বিক্রয়কর্মীও একই কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, স্মার্টফোনের চাহিদায় কমতি দেখছেন তাঁরা। ফলে বিক্রিও কমে গেছে।

বিটিআরসির তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশে স্মার্টফোনের উৎপাদন ছিল ৩৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। মে মাসে তা কমে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এ বছর সর্বোচ্চ ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ স্মার্টফোন উৎপাদিত হয় গত মার্চে।

স্মার্টফোনের উৎপাদন কম হওয়া প্রসঙ্গে শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কোম্পানিগুলো গত মে মাস থেকে অনুমান করছিল, ভবিষ্যতে সেটের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে, যা ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই আশঙ্কা থেকে কোম্পানিগুলো আগাম স্মার্টফোনের উৎপাদন কমিয়েছে। এই প্রবণতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

জিয়াউদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, সরকার ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহার করায় স্মার্টফোনের দাম বাড়ছে। এতে স্মার্টফোনের উৎপাদন আরও নিম্নমুখী হতে পারে।

শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার বলেন, দেশীয় উৎপাদকদের লক্ষ্য থাকে বিদেশে মুঠোফোন রপ্তানি করা। কিন্তু বর্তমান কর রেয়াত স্মার্টফোন রপ্তানিবান্ধব না হওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শুধু দেশীয় চাহিদার কথা মাথায় রেখেই কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। আর স্থানীয় বাজারে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় স্মার্টফোনের উৎপাদন কমাতে হচ্ছে।

দেশে স্যামসাং, অপো, ভিভো, টেকনো, সিম্ফনি, লাভা, শাওমি, রিয়েলমির ফোনের কারখানা রয়েছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্র বলছে, দেশে ১৫ হাজার কোটি টাকার স্মার্টফোনের বাজার রয়েছে। চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি ফোন দেশেই উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ট্রানশান বাংলাদেশে লিমিটেডের সিইও রিজওয়ানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুঠোফোনের চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু চলতি বছর এপ্রিল মাসের পর থেকে তারা মুঠোফোনের চাহিদা কম দেখতে পাচ্ছেন।

রিজওয়ানুল হক আরও বলেন, বাজারে চাহিদা ও বিক্রির ওপর নির্ভর করে মুঠোফোনের উৎপাদন, কিন্তু এখন চাহিদা কমার কারণে এর উৎপাদন কমে গেছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ফোন বিক্রি কমেছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন