রাজনৈতিক পরিবর্তন সহজ করেছে সামাজিক মাধ্যম, তবে তা টেকসই হচ্ছে না: ফাহমিদুল হক

‘ফ্রম ডিজিটাল স্ক্রিন টু স্ট্রিট: সাউথ এশিয়াস জেন-জি আপরাইজিং’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান বক্তা অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের (মাঝে) হাতে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। আজ বুধবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব) ক্যাম্পাসেছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করা সহজ করেছে, কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন এবং সেই পরিবর্তনকে টেকসই করছে না বলে অভিমত দিয়েছেন অধ্যাপক ফাহমিদুল হক। তিনি বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের মধ্যে আবেগ ও ক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে তাঁদের সংগঠিত করতে পারে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।

‘ফ্রম ডিজিটাল স্ক্রিন টু স্ট্রিট: সাউথ এশিয়াস জেন-জি আপরাইজিং’ শীর্ষক সেমিনারে এ–সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র তুলে ধরেন ফাহমিদুল হক। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব) ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম ও সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ (সিএসএএস) এই সেমিনারের আয়োজন করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

২০২৫ সালে বিশ্বের অন্তত ১১টি দেশে জেন–জি তরুণদের নেতৃত্বে বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছে বলে উল্লেখ করেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন, মরক্কো, নেপাল, তানজানিয়া, পেরু, প্যারাগুয়ে, মালদ্বীপ, কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এসব আন্দোলন সরকারকে চাপে ফেলেছে। এসব আন্দোলনের মধ্যে বেশ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত, আদর্শিকভাবে খুব বেশি নির্দিষ্ট নয়, তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং মূলত অহিংস।

এসব আন্দোলনের পেছনে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে তরুণদের প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ থাকায় এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদেরও প্রভাবিত করছে।

ফাহমিদুল হক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিবাচক হাতিয়ার হিসেবে দেখলে এর আরেকটি বিপজ্জনক দিক উপেক্ষিত থেকে যায়। একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যেমন আন্দোলন ও জনমত গড়ে তোলা যায়, তেমনি জনতাকে সংগঠিত করে কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলাও চালানো সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে ২০২১ সালের হামলার উদাহরণ টেনে ফাহমিদুল হক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে কোনো নির্দিষ্ট বয়ান ও আবেগের পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হয়। পরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সেই জনতাকে বাস্তব কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ ‘কনসেনসাস মোবিলাইজেশন’ (ঐকমত্য তৈরি) থেকে ‘অ্যাকশন মোবিলাইজেশনে’ (বাস্তব মাঠে নামানো) যাওয়ার ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রসঙ্গে ফাহমিদুল হক বলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এবং উদীচী ও ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানে হামলার ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জনতাকে সংগঠিত করার বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না।’ তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, প্ল্যাটফর্মগুলো বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করা কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। সেখানে কনটেন্টের ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব সব সময় বিবেচনায় আসে না। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে হুমকি ও সহিংসতার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে এ নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণেও এমন তথ্য উঠে এসেছে।

জেন–জি তরুণেরা আদর্শের চেয়ে অভিন্ন আবেগ ও অনুভূতিতে বেশি প্রভাবিত হন বলে মন্তব্য করেন ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই আবেগ দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে সংগঠিত করে। আন্দোলনে প্রথমে কনসেনসাস মোবিলাইজেশন বা ঐকমত্য তৈরি হয়, পরে অ্যাকশন মোবিলাইজেশনের মাধ্যমে মানুষ রাস্তায় নামে।’ বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহৃত হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধের সময় ভিপিএন এবং নিরাপত্তার কারণে বাটন ফোনও ব্যবহার করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনকে শুধু ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক নয় বলে মনে করেন ফাহমিদুল হক। তাঁর মতে, আন্দোলনের আগে ও পরের ঘটনাও এর অংশ। আন্দোলনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে আবেগঘন ভাষায় মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হতো। পরে সেই বক্তব্যে শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নাগরিকের দায়িত্বের বিষয় গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভাজন ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হয়েছে।

নেপালের আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়েও বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর ছিল বলে জানান ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বেকারত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি ক্ষোভ। মূল প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ হওয়ার পর তরুণেরা গেমিং প্ল্যাটফর্ম ডিসকর্ড ব্যবহার করে আন্দোলন সমন্বয় করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সব সময় ইতিবাচক নয় বলে সতর্ক করেন ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে ঐকমত্য তৈরির পর বিকল্প প্ল্যাটফর্মে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে তা বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিবর্তন আনা সহজ করেছে, কিন্তু পরিবর্তনকে টেকসই করা কঠিন করেছে।’ তিনি মনে করেন, আন্দোলনের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, টেকসই অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম প্রয়োজন। অস্থিতিশীলতা ও অপূর্ণ প্রত্যাশা থেকে আন্দোলনের পর ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানও ঘটতে পারে।