একইভাবে বেড়েছে নিউজপ্রিন্ট কাগজ, বই, পেনসিল, মুছনি বা ইরেজার, স্কেল, জ্যামিতি বক্স, মার্কারসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের দাম। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফটোকপি করতে হয়। সেখানেও সেবামূল্য বেড়েছে।

শুধু এখানেই শেষ নয়, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া-আসা ও তাদের হালকা খাবার (টিফিন) দেওয়ার পেছনে অভিভাবকদের ব্যয় বেড়েছে।

কারণ, ঢাকায় রিকশাভাড়া ও বাসভাড়া বেড়ে গেছে এবং হালকা খাবার হিসেবে ব্যবহৃত উপকরণগুলোর দাম বেড়েছে।

দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চার কোটি। কেউ সচ্ছল পরিবারের সন্তান। তাদের তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। তবে অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারগুলো শিক্ষা উপকরণের বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছে।

ঢাকার শেওড়াপাড়ায় গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালানো মনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, গত সপ্তাহে তিনি মেয়ের জন্য একটি খাতা কিনেছেন ৫০ টাকা দিয়ে। তিন মাস আগেও একই খাতা ৩৫ টাকা ছিল। তিনি বলেন, ১৫ টাকা বাড়তি দাম তাঁর জন্য অনেক কিছু।

দাম কতটা বাড়ল

দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২০ সালের শুরু থেকে। তবে তা খাদ্যপণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। চলতি বছরে এসে মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে শিক্ষা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি শুরু করেন উৎপাদক ও বিক্রেতারা। দেশে গত মে মাসেও যে ডলার ৮৬ টাকা ছিল, তা অক্টোবরে উঠেছে ১০৫ টাকায়।

দাম বেশি বেড়েছে কাগজের। বিক্রেতারা বলছেন, ডলারের দামের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে কাগজের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। নিউজপ্রিন্ট কাগজের দামও বিশ্ববাজারে বাড়তি। নীলক্ষেতের দোকানগুলোতে এক রিম নিউজপ্রিন্টের দাম চাওয়া হয়েছে ২৭০ টাকা, যা বছরের শুরুতে অর্থাৎ গত জানুয়ারি মাসে ১৬০ টাকা ছিল। খুচরায় এক দিস্তা নিউজপ্রিন্ট বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়।

বাজারে বিভিন্ন দামের পেনসিল আছে। কম দামের পেনসিলের দাম বছরের শুরুতেও ছিল প্রতিটি ৫ টাকা। এখন সেটা ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার কিছু ভালো মানের পেনসিলের দাম প্রতিটি ১০ থেকে বেড়ে ১৫ টাকা হয়েছে।

বিক্রেতারা বলছেন, কলমের দাম খুচরা পর্যায়ে বাড়েনি। যে কলম পাঁচ টাকা ছিল, তাঁরা তা একই দামে বিক্রি করছেন। তবে পাইকারি দর বেড়েছে। এ কারণে তাঁদের মুনাফা কমেছে।

নীলক্ষেতের দোকানি রেদোয়ান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সুপরিচিত ব্র্যান্ডের একটি কলম এখন কেনেন গড়ে ৩ টাকা ৮১ পয়সা দরে, যা আগে কিনতেন ৩ টাকা ৪৭ পয়সায়। বিক্রি করতে হয় ৫ টাকা দিয়েই।

সাধারণ মানের একটি জ্যামিতি বক্সের দাম ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২৫ টাকা এবং একটি ইস্পাতের স্কেলের (১২ ইঞ্চি) দাম ১৩ থেকে বেড়ে ২২ টাকা হয়েছে। কিছু কিছু বেড়েছে পেনসিল শার্পনার, মুছনি বা ইরেজারসহ বিভিন্ন উপকরণের। ছয় মাস আগে যে মার্কার প্রতিটি ১৫ টাকা ছিল, তা এখন ২৫ টাকা। আঠা বা গামের দামও বেড়েছে। ১৫ টাকায় যে গাম পাওয়া যেত, সেটি কিনতে হচ্ছে ২৫ টাকায়।

দোকানিরা বাড়তি দাম সামাল দিতে একটি কৌশল নিয়েছেন। সেটি হলো দাম ঠিক রেখে সাধারণ মানের পণ্য ধরিয়ে দেওয়া। এক দোকানি বলেন, মানুষ সাধারণত ১০ টাকা দামের পেনসিল চান। তাঁদের ওই দামেই পেনসিল দেওয়া হয়, তবে মান একটু নিম্ন।

ফটোকপি সেবামূল্য ৫০% বেড়েছে

ফটোকপি সেবামূল্য কতটা বেড়েছে, তা জানালেন জে আর জে এন্টারপ্রাইজের নূর নবী। তিনি বলেন, যাঁরা অল্প সংখ্যায় ফটোকপি করেন, তাঁদের কাছ থেকে প্রতি পাতা রাখেন দেড় টাকা, যেটা কয়েক মাস আগে ছিল ১ টাকা।

আর বেশি পরিমাণে করলে প্রতি পাতা রাখেন ১ টাকা ২০ পয়সা। এ ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে ৪০ পয়সা। কাগজ ও কালির দাম বেড়ে যাওয়ায় ফটোকপি সেবার মূল্য বেড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নূর নবী বলেন, এক প্যাকেট কাগজ (৫০০টি) আগে কিনতেন ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায়। এখন কিনতে হয় ২৭০ টাকায়।

বইয়ের দামও বাড়তি

কাগজের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বইয়ের দামও বেড়েছে। শাপলা বুক সেন্টার নামের একটি বইয়ের দোকানে গিয়ে জানা গেল, উচ্চমাধ্যমিকের রসায়ন দ্বিতীয় পত্রের একটি সহায়ক বই গত জানুয়ারিতে ছিল ৩৫০ টাকা। এখন বিক্রি হয় ৪৪০ টাকায়।

বেকারদের চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যও এখন বেশি খরচ করতে হচ্ছে। চাকরির প্রস্তুতিমূলক বইয়ের দাম বাড়তি। যেমন একটি সাধারণ বিজ্ঞানের বইয়ের দাম এখন ২০০ টাকা, যা আগে বিক্রি করা হতো ১৬০ টাকায়। দোকানিদের আশঙ্কা, আগামী জানুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষ সামনে রেখে সব ধরনের বইয়ের দাম বাড়বে।

‘চাপ বাড়তি’

বেশির ভাগ পরিবারের সন্তানদের স্কুল-কলেজে যাওয়ার বাহন রিকশা, অটোরিকশা ও বাস। ঢাকায় বাসভাড়া ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০ টাকার রিকশাভাড়া হয়েছে ৩০ টাকা। অটোরিকশাচালকেরা মিটারে চলেন না। তাঁরা যখন যা খুশি ভাড়া হাঁকেন।

রাজধানীর সিটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিকে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থীর মা প্রথম আলোকে বলেন, এখন তো শুধু শিক্ষা উপকরণ নয়, অধিকাংশ জিনিসের দাম বেড়েছে। ফলে সংসারে বাড়তি চাপ পড়ছে।