হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার বিচার ১৮০ দিনে শেষের বিধান বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার যে বিধান আইনে রয়েছে, তা বাধ্যতামূলক নয়; বরং নির্দেশনামূলক বলে এক রায়ে উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন। কারণ, আইনের ২০ ও ৩১ক ধারায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ার কোনো পরিণতি নিশ্চিত করা হয়নি।
ইডেন কলেজের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগের এক মামলার বিচার ওই সময়সীমার মধ্যে শেষ না হওয়ার প্রেক্ষাপটে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে করা এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৭ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় দেন। ১২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়।
২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারায় বিচারপদ্ধতি এবং আইনের ৩১ক ধারায় ট্রাইব্যুনাল ইত্যাদির জবাবদিহি বিষয়ে বলা আছে। ধারা দুটি তুলে ধরে পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন, ৩০ক ধারা সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মামলার বিচারকার্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ার কারণে কোনোভাবেই নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করা যায় না। বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার যে সংবিধিবদ্ধ বিধান রয়েছে, তা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। কেননা আইনের ২০ ও ৩১ক ধারায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ার কোনো পরিণতি নিশ্চিত করা হয়নি। আইনের উল্লেখিত ধারাগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ার কারণে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুমোদন দেয় না বলেও রায়ে এসেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারার ভাষ্য, বিচারের জন্য মামলা পাওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল বিচারকার্য সমাপ্ত করবে। আর আইনের ৩১ক ধারা অনুসারে, কোনো মামলা এ আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে ট্রাইব্যুনালকে তার কারণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের নিকট দাখিল করতে হবে। এর একটি অনুলিপি সরকারের নিকটও দাখিল করতে হবে। প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
যে মামলা ঘিরে রায়
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীর কলেজে যাতায়াতের সূত্রে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর পাভেল ওই ছাত্রীকে একটি বাসায় নিয়ে যান এবং সেখানে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করেন। পরবর্তী সময়ে পাভেল ওই ছাত্রীকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। এতে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রীর মা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে পাভেলসহ আরও তিনজনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ১৭ জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরবর্তীকালে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১–এ স্থানান্তর করা হয়। ট্রাইব্যুনাল পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ট্রাইব্যুনাল ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই অভিযোগ আমলে নেন। পরবর্তীকালে পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়, অপর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়।
তবে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি এবং নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ–সংবলিত প্রতিবেদ দাখিল করা হয়নি উল্লেখ করে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট করেন সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল। রিটে দাবি করা হয়, বিচারকার্যের জন্য মামলার নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করেন। কিন্তু ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির এক আদেশে (৩৪ নম্বর) দেখা যায়, মামলাটির কার্যক্রম তখনো ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, যা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ক ধারার লঙ্ঘন।
রিট আবেদনকারীর ভাষ্য, ২০ ধারায় নির্ধারিত সময়সীমার (১৮০ দিন) মধ্যে বিচারকাজ শেষ হয়নি। আইনের ৩১ক ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদনও পাঠানো হয়নি, যদিও আইন অনুযায়ী তা আবশ্যক। এ সত্ত্বেও মামলার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা আইনের বাধ্যতামূলক বিধানের লঙ্ঘন।
সাইফুল ইসলামের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্ট রুল দেন। পাশাপাশি মামলাটির কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে ২০২৩ সালের ৭ জুন রায় দেন হাইকোর্ট। মামলাটির কার্যক্রমে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে রায়ের অনুলিপি গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে মামলাটির বিচার শেষ করতে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দেওয়া হয়।