জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া হতে হবে সহজ, নির্ভুল
জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে একজন নাগরিকের আইনি পরিচয়ের সূচনা হয়। জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, বিবাহনিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ ১৮টি নাগরিক সেবা ও অধিকার যুক্ত। অন্যদিকে উত্তরাধিকার, সরকারি ভাতাসহ বিভিন্ন অধিকার সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন মৃত্যুনিবন্ধন। তাই যথাযথ জাতীয় পরিকল্পনার স্বার্থে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নির্ভুল হতে হবে। নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এমন হতে হবে, যেন নাগরিকেরা সহজেই সেবা পেতে পারেন।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত সুশাসন’। রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, নির্ভুল জন্মনিবন্ধন না হলে একটি এলাকায় কত শিশু জন্ম নিচ্ছে, কতটি স্কুল-হাসপাতাল প্রয়োজন কিংবা কত মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা দরকার, সরকারের পক্ষে এসব পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে নির্ভুল মৃত্যুনিবন্ধনের মাধ্যমে বোঝা যায় কোন এলাকায় কোন কোন রোগের ঝুঁকি বেশি এবং সেসব রোগ প্রতিরোধে কী কী পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান বলেন, ‘দেশের মোট জনসংখ্যা এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ডেটাবেজে থাকা সংখ্যার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। তাই প্রশ্ন ওঠে, আমরা যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছি, তা আসলে কতটা কার্যকর হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৩ সালে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। বাস্তবতা হলো, প্রায় দেড় শ বছরেও আমরা জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের কাজটি পুরোপুরি নির্ভুলভাবে করতে পারিনি। এটাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫ কোটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। অথচ জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। মূলত দ্বৈত নিবন্ধনের কারণেই এই অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। জনসংখ্যার অনুপাতে খাদ্যচাহিদা নির্ধারণসহ বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা করতে সঠিক নিবন্ধন জরুরি। তিনি নাগরিকদের সময়মতো জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করার বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন। তিনি জানান, সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে জন্মনিবন্ধনও সম্পৃক্ত। ফলে ডিজিটাল সুশাসনের সুবিধা পেতে নাগরিকদের জন্মনিবন্ধন নির্ভুল হওয়া আবশ্যক।
ডেটাবেজ নির্ভুল হওয়া কতটা জরুরি, সেই গুরুত্ব তুলে ধরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, নাগরিকেরা কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে কেবল সিস্টেম তৈরি করে কোনো লাভ নেই; সিস্টেমকে হতে হবে নাগরিকবান্ধব।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) ফারাহ শাম্মী বলেন, এলাকায় কতটি স্কুল-হাসপাতাল প্রয়োজন এবং কোন এলাকায় কী ধরনের রোগের ঝুঁকি বেশি, এসব তথ্য জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের মাধ্যমেই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ফলে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য যথাযথ নিবন্ধন প্রয়োজন।
সূচনা বক্তব্যে রেজিস্ট্রার জেনারেল আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, নির্ভুল জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ক্ষেত্রে জনবলসংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ে জায়গা–সংকট ও লজিস্টিক সহায়তারও ঘাটতি রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে অতীতে ভুয়া জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ২০ থেকে ২৫ জন উদ্যোক্তা সম্পৃক্ত করা গেলে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন সহজ হবে এবং নাগরিকদের ভোগান্তিও কমবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলের উন্নয়ন সহযোগিতা বিভাগের প্রধান মিখাল ক্রেজা বলেন, অনেক নাগরিকের সরাসরি ডিজিটাল সেবায় প্রবেশাধিকার নেই। ফলে তাঁদের পরিবারের সদস্য বা অন্যদের সহায়তা নিতে হয়। এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যা নাগরিকদের ক্ষমতায়িত করবে এবং পরনির্ভরশীলতা কমাবে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ নির্ভুল জন্মনিবন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, কোথায় নতুন বিদ্যালয় হবে, কোথায় স্বাস্থ্যসেবা বেশি প্রয়োজন, কত টিকা সংগ্রহ করতে হবে কিংবা জনগোষ্ঠীর জন্য কতটা সামাজিক সুরক্ষা দরকার—এসব পরিকল্পনার মূল ভিত্তিই হলো নির্ভুল জন্মনিবন্ধন। তাই প্রতিটি পরিবারের জন্য জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সহজ, সাশ্রয়ী ও সময়োপযোগী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে নির্ভুল জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং সনদ সংশোধনের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য দেশের ১৩টি নিবন্ধন কার্যালয় ও চারজন কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়।