বজ্রপাতে মারা যান গরিবেরা, তাঁদের কথা কেউ ভাবে না

বজ্রপাতপ্রতীকী ছবি

একসঙ্গে অনেক মৃত্যু আমাদের বিচলিত করে। সবাই নড়েচড়ে বসেন। টক শোর বিষয়বস্তুর একঘেয়েমি কাটে। ১৮ এপ্রিল (৫ বৈশাখ) এক দিনে বজ্রপাতে সর্বাধিক ১৩ জনের মৃত্যু হয়। বৈশাখের আগেও বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছিল কমপক্ষে ৩০ জনের। এই ৪৩ জনের মধ্যে শ্রমদানে সক্ষম পুরুষের সংখ্যাই বেশি—৩৮ জন; নারী দুজন আর তিন শিশুও মারা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জনই কৃষক।

এবার বজ্রপাতে সর্বাধিক মৃত্যু হয়েছে সিলেট বিভাগে—১১ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ৭, রাজশাহী বিভাগে ৬ এবং অন্যান্য বিভাগে ৫ জন। জেলা হিসেবে এককভাবে সুনামগঞ্জে সর্বাধিক—৬ জন। গত বছর বজ্রপাতে ২৬৩ জন নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮টি শিশু, ৩১ জন নারী এবং ১৯৪ জন পুরুষ। আহত হয়েছিলেন প্রায় ৭৬ জন।

গত কয়েক বছরের গড় হিসাবে প্রতিবছর ৩০০ জনের মতো মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান। কাছাকাছি সময়ের মধ্যে সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয় ২০২০ সালে। তখন ৩৮১ জন মারা যান। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৬২।

বজ্রপাতের বিপজ্জনক মৌসুম

বাংলাদেশে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ওপর গবেষণা চালিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়। তারা বলছে, এ দেশে প্রতিবছর গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়, যার ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুনে হয়। এটা বর্ষা শুরুর মৌসুম। বর্ষা শেষে অর্থাৎ মৌসুমি বায়ু ফেরত যাওয়ার সময় সেপ্টেম্বর–অক্টোবরেও বজ্রপাত বাড়ে। তবে তথ্য–উপাত্ত থেকে জানা যায়, বর্ষা শুরুর মৌসুমে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটে। গত বছর বা তার আগের বছরগুলোর হিসাব ঘাঁটলে মোটামুটি একই ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

বাংলাদেশে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা

কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আশরাফ দেওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং ফিনিশ কোম্পানি ভাইসলার উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, প্রাক্‌–বর্ষা সময়ে (মার্চ-এপ্রিল-মে) সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় হাওর অঞ্চলের জেলাসমূহে (হবিগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার)। বর্ষা চলাকালে বজ্রপাত বেশি হয় সুনামগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, বরিশাল এবং উত্তরবঙ্গের রংপুর, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রামে। আর বর্ষা বিদায়পর্বে অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বেশি বজ্রপাত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কক্সবাজারে। শীতের সময়েও বজ্রপাতের রেকর্ড আছে। এটা প্রধানত সুন্দরবন লাগোয়া এলাকা সাতক্ষীরা, খুলনা, পটুয়াখালী অঞ্চলে ঘটে থাকে।

বেশিমাত্রায় বজ্রপাত হচ্ছে কেন

অনেকেই বলে থাকেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগের চেয়ে এখন বেশি বেশি বজ্রপাত হচ্ছে এবং এতে মানুষ মরছে বেশি। তবে এই ধারণাকে তথ্য–উপাত্ত দিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁদের হিসাবে বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়েনি। তাঁরা বলছেন, মানুষ বেড়েছে, বৈরী আবহাওয়ায় মানুষের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। ১৯৭১ সালে যেখানে সাত কোটি মানুষ বসবাস করত, এখন সেখানে প্রায় তিন গুণ বেশি মানুষ বসবাস করছে। অধিক হতাহতের এটাই মূল কারণ।

আহতদের দীর্ঘ চিকিৎসা প্রয়োজন

বজ্রপাতের মাত্রা এবং মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনা করে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার এটিকে বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাবিধি বা চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি হয়নি। ঢাকার বার্ন হাসপাতালে অনেককে পাঠানো হয়। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন আমাকে জানিয়েছিলেন, আগুনে পোড়া আর বজ্রপাতে ঝলসে যাওয়া মানুষের চিকিৎসা এক রকম হয় না। এটা নিয়ে নবীন চিকিৎসকদের জন্য একটা প্রটোকল তৈরি এবং সেটা নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি।

হাসপাতালের রেকর্ড এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বজ্রপাতে আহত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন কমপক্ষে ৭১৪ জন। তাঁদের অনেকেই এখনো প্রাণে বেঁচে থাকলেও দু–একজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা শ্রবণের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। আহত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাত নিয়ে নানা ধরনের সতর্কবার্তা প্রচার করে থাকে। তাতে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক শকে আহত ব্যক্তিদের যেভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদেরও সেভাবে চিকিৎসা করতে হবে।

বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির শ্বাসপ্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে পারলে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। বেশি দেরি হলে আহত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে।

বজ্রপাতে আহত হলেও কিছু কিছু মানুষের হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবেই মারা যায়। আবার কারও কারও হার্ট একটু বন্ধ হয়ে আবার চালু হয়। তাদের হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসকেরা বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, যদি আহত ব্যক্তির হৃৎপিণ্ড সচল থাকে, তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে সিপিআর (বুকে চাপ দিয়ে হৃৎস্পন্দন সচল রাখা) দিতে হবে। সে জন্য সিপিআর সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি।

সিপিআর দিয়ে হৃৎপিণ্ড সচল রেখে দ্রুত আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে পারলে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। অনেকে বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে ধরতে চান না। এটা নিতান্তই একটি কুসংস্কার। আহত কিংবা মৃত ব্যক্তির শরীরে বিদ্যুৎ থাকে না।

বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী

অনেক খরচাপাতির পর আমরা বুঝতে পেরেছি, তালগাছ প্রকল্প কোনো ফলদায়ক ছিল না। প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। আমরা বুঝতে পেরেছি, তালগাছের রক্ষণাবেক্ষণ লাগে। তা ছাড়া এগুলো বড় হয়ে মানুষের চেয়ে উঁচু হতে ২০-৩০ বছর সময় লেগে যায়। তালগাছ লাগানোর কথা বললেও আমরা তালগাছ কাটা বন্ধের কথা বলিনি। তালের ডুঙ্গার হাট এখনো অবাধে চলছে নড়াইলসহ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে। আগামী বর্ষার আগেই হাজার দশেক তালগাছ কুড়ালের আঘাতে শুয়ে পড়বে। তালগাছের গল্প শেষ হলে গল্প হয়েছিল লাইটিনিং অ্যারেস্টারসহ লাইটিনিং শেল্টার এবং আর্লি ওয়ার্নিং ফর লাইটিনিং, সাইক্লোন অ্যান্ড ফ্লাড শেল্টারের। এই প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

কৃষকদের বজ্রপাত থেকে রক্ষা করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ও নানা স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল। তবে আমরা যা কিছু করি, তালগাছের মতো তাড়াহুড়া না করে মানুষকে আর বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিলাসিতা আমাদের জন্য নয়।

বজ্রপাতে মারা যান সবচেয়ে গরিব মানুষগুলো। বৃষ্টি–ঝড় উপেক্ষা করে তাঁদের খেতখামারে থাকতে হয় বলে। তাঁরা কেউই আমাদের নিকটাত্মীয়ের তালিকায় নেই। তাই বলে কি তাঁদের নিরাপত্তার কথা কেউ ভাববে না। আমরা চাই বা না চাই, দেশের প্রয়োজনে তাঁরাই সবার আগে এগিয়ে আসেন। তাঁদের রক্ষা করতে না পারলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার কী হবে?

  • গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

  • [email protected]