জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াদি-সংক্রান্ত জনসংখ্যা বিভাগের ‘বিশ্বজনসংখ্যা সম্ভাবনা ২০২২’ অনুযায়ী, বিশ্বজনসংখ্যা এখন থেকে ১৫ বছর পর ২০৩৭ সালে হবে ৯ বিলিয়ন, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসের প্রবণতা লক্ষ করা যাবে। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন (১৪২ দশমিক ৬ কোটি), ভারত (১৪১ দশমিক ২ কোটি), যুক্তরাষ্ট্র (৩৩ দশমিক ৭ কোটি), ইন্দোনেশিয়া (২৭ দশমিক ৫ কোটি), পাকিস্তান (২৩ দশমিক ৪ কোটি), নাইজেরিয়া (২১ দশমিক ৬ কোটি), ব্রাজিল (২১ দশমিক ৫ কোটি), বাংলাদেশ (১৭ দশমিক ১ কোটি)।

জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ বলছে, ২০৫০ সালে শীর্ষস্থানীয় জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে থাকবে ভারত (১৬৮ দশমিক ৮ কোটি), চীন (১৩১ দশমিক ৭ কোটি ) ও যুক্তরাষ্ট্র (৩৭ দশমিক ৫ কোটি), নাইজেরিয়া (৩৭ দশমিক ৫ কোটি), পাকিস্তান (৩৬ দশমিক ৬ কোটি), ইন্দোনেশিয়া (৩১ দশমিক ৭ কোটি), ব্রাজিল (২৩ দশমিক ১ কোটি), ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (২১ দশমিক ৫ কোটি), ইথিওপিয়া (২১ দশমিক ৩ কোটি) এবং বাংলাদেশ (২০ দশমিক ৪ কোটি)। আফ্রিকার দেশগুলোয় জনসংখ্যার আকার বাড়বে মূলত উচ্চ প্রজননহারের কারণে।

বাংলাদেশের অবস্থান

বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হলেও ২০৫০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান হবে দশম, বিশ্বের জনসংখ্যার বিচারে যা প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ। জনসংখ্যার আকার মোটেও কম নয়। দেশের জনঘনত্বের বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক জনঘনত্বের একটি দেশ। বর্তমানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ১ হাজার ৩১৫ জনেরও বেশি, যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এটি ২০৫০ সালে হবে ১ হাজার ৫৬৬ জন। জনঘনত্বের সঙ্গে গুণগত জীবনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে যেকোনো পরিকল্পনায় উচ্চ জনঘনত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।

সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের লক্ষ্য হলো সব মানুষের জীবনের গুণগত মানের উন্নয়ন। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৯৪ সালে মিসরের কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলন (আইসিপিডি) ছিল জনসংখ্যা ও উন্নয়ন ভাবনায় এক ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা পরিবর্তন। এখানে জনসংখ্যার পরিমাণগত দিক থেকে গুণগত দিকেই অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে, যেখানে ব্যক্তির অধিকার ও পছন্দই হচ্ছে মুখ্য। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যা বাড়ানো বা কমানো নয় বরং সবার সুযোগ গ্রহণে ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। জনমিতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করতে সবার মানবাধিকার, প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার ও পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে।

জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক যুগান্তকারী এ সম্মেলনের ২৫ বছর পূর্তিতে ২০১৯ সালের নভেম্বরে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসব প্রতিশ্রুতি ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনকালের মধ্যেই তিন শূন্য লক্ষ্যমাত্রা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে। এগুলো হলো: শূন্য মাতৃমৃত্যুহার, পরিবার-পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপূর্ণ চাহিদা শূন্যতে আনা এবং যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক নির্যাতন দূরীকরণ ও বাল্যবিবাহ শূন্যতে নিয়ে আসা।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও প্রজননস্বাস্থ্য ও অধিকার উন্নয়নে রয়েছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। করোনা মহামারির আগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার হ্রাস, অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার, মোট প্রজননহার হ্রাস, জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহারের হার বৃদ্ধি ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পেলেও এসব অগ্রগতির পাশাপাশি মহামারি-উত্তর নতুন ও উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ কিংবা অসম উন্নয়নও লক্ষণীয়। সর্বাধিক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগের সময় অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। যুবগোষ্ঠী ও দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে।

এখানে বেকারত্বের হারে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি, বরং বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। নগরজীবনে উদ্ভূত হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। জলবায়ুর পরিবর্তন বা পরিবেশগত (প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, বন্যাসহ) বিভিন্ন কারণে শহরে স্থানান্তরিত হচ্ছে মানুষ।

অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান বাস্তবতায় ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় ৮ বিলিয়ন জনসংখ্যার বর্তমান বিশ্বে ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশের জন্য ৯টি দিক উল্লেখ করা যায়:

১. বাংলাদেশের জনসংখ্যার আকার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে।

২. নীতিকৌশল বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত পরিবার-পরিকল্পনার কর্মসূচির কারণে মোট প্রজননহার হ্রাস পাওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত পরিবার-পরিকল্পনা কর্মসূচির সাফল্য থাকলেও বর্তমানে মোট প্রজননহার ও জন্মনিরোধকের ব্যবহারের হার একপ্রকার ২০১১ সাল থেকে স্থিতাবস্থায় রয়েছে, যা বাংলাদেশ জনমিতিক ও স্বাস্থ্য জরিপের ফলাফলে লক্ষণীয়।

৩. দেশের মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়েছে। বর্তমানে জন্মকালে মেয়েদের আয়ুষ্কাল ৪ দশমিক ৫ বছর বেশি।

৪. কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক বৃদ্ধির হার বাড়ছে, যা মাথাপিছু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হতে পারে। প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য ২০৩৬-২০৩৭ পর্যন্ত অনুকূলে থাকবে।

৫. বাংলাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও আনুপাতিক আকার বাড়ছে। ২০৩০ সালে ৬৫ বছর ও তার ঊর্ধ্বে বয়স্ক জনগোষ্ঠী হবে প্রায় ৮ শতাংশ এবং ২০৪১ সালে তা পৌঁছে যাবে সাড়ে ১১ শতাংশের বেশি।

৬. জনসংখ্যার গতিধারায় আন্তর্জাতিক স্থানান্তরের একটি প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১০ থেকে ২০২১ সময়ে বিশ্বব্যাপী ১০ লক্ষাধিক আন্তর্জাতিক অভিবাসী, যারা মূলত কাজের জন্য বাইরের গেছে, সে দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়।

৭. কোভিড-১৯ মহামারি জনসংখ্যা পরিবর্তনের উপাদানের (জন্ম-মৃত্যু-স্থানান্তর) কোনো না কোনো প্রভাব রেখেছে বা রাখছে, যার তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান দরকার।

৮. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বেশ সুরক্ষাহীন, যার প্রভাব জনমিতিক গতিশীলতায় লক্ষণীয়। প্রাকৃতিক কারণে বাস্তুচ্যুত দেশীয় জনগোষ্ঠীর বাইরে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে জোর করে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে, বাংলাদেশে যাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া নিয়ে নেই কোনো সঠিক রোডম্যাপ। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্মনিরোধক পদ্ধতির ব্যবহার কম ও প্রজননহার বেশি। এদিকে সতর্ক দৃষ্টির প্রয়োজন।

৯. উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনসংখ্যার সঠিক ও হালনাগাদ উপাত্তের প্রয়োজনীয়তা। ২০১১ সালের পর এ বছর জনশুমারি ও গৃহগণনা সম্পাদন করা হলেও এখনো শুমারি-উত্তর যাচাই শেষে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আসেনি। জাতীয়-আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের উপাত্তের বিশ্লেষণে জনসংখ্যার বয়স, লিঙ্গ ও ভৌগোলিক অবস্থানগত তথ্য নীতিনির্ধারণে ও টেকসই উন্নয়নপথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে।

নিঃসন্দেহে ৮০০ কোটি জনসংখ্যায় পৌঁছানো একটি মাইলফলক। তবে সংখ্যার চেয়ে ব্যক্তির অধিকার ও পছন্দই মুখ্য। বাংলাদেশের ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যাকে ১৭ কোটির বেশি সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে হলে আমাদের দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও তার বাস্তবায়ন।

জনসংখ্যার সঙ্গে অধিকতর সম্পর্কিত জাতীয় অনেক নীতিরই (যেমন জাতীয় জনসংখ্যানীতি ২০১২, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, জাতীয় শ্রমনীতি ২০১২, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১, জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩) হালনাগাদ করা দরকার। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য সামনে রেখে এসব কাজ করতে হবে।

লেখক: ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ই-মেইল: [email protected]