একটি ড্রেসিং টেবিলের বাজারদর ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু সরকারি প্রকল্পের নথিতে সেই টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বাজারদরের তুলনায় প্রায় ১৮ গুণ বেশি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে আলোচিত বালিশ–কাণ্ডের পরে ড্রেসিং টেবিল কেনার এমন অবিশ্বাস্য হিসাব সামনে এসেছে।
মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, রূপপুর প্রকল্পের আবাসন ভবন ‘গ্রিন সিটি’তে আসবাব কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। শুধু ড্রেসিং টেবিল কেনাতেই ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়েছে।
নথিপত্রে দেখা যায়, প্রকল্পে মোট ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছিল। এর মধ্যে ২১টি ড্রেসিং টেবিল কেনা হয় প্রতিটি ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দরে। ১৫টি কেনা হয় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা করে। ২৯৪টি ড্রেসিং টেবিলের দাম ধরা হয় ৫৫ হাজার টাকা করে। বাকি ড্রেসিং টেবিলগুলোর বেশির ভাগের দামও ছিল ৪০ হাজার টাকার বেশি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একই প্রকল্পে একই ধরনের পণ্যের দামে এমন অস্বাভাবিক পার্থক্য স্বাভাবিক নয়। এই কেনাকাটায় প্রচলিত নিয়মনীতি মানা হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আবাসন ভবন গ্রিন সিটিতে কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পেশ করা সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ৩৮টি প্রতিবেদনের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্নীতির প্রতিবেদনও রয়েছে।
প্রকৃত দাম ৪ কোটি, বিল ৭ কোটি
সিএজির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৩৪২টি ড্রেসিং টেবিলের প্রকৃত মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯ লাখ টাকা। কিন্তু এসব কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু ড্রেসিং টেবিল কিনতেই অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। রূপপুর প্রকল্পের ২০টি ভবন তৈরিতে নানা অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২৯৫ কোটি টাকা লুটপাটের তথ্যও সিএজির তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রেসিং টেবিল, ড্রেসিং সিটার এবং বিভিন্ন ফ্লোরে মালামাল ওঠানো-নামানো ও পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিটির ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ প্রকৃত বাজারমূল্য ও আনুষঙ্গিক খরচ ছিল ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রাথমিক হিসাবেই প্রতিটি ড্রেসিং টেবিলে তিন হাজার টাকা বেশি ধরা হয়েছিল। কিন্তু কেনাকাটার সময় সেই দাম আরও বাড়িয়ে কোথাও কোথাও সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়।
তদন্তে বলা হয়েছে, ঠিকাদারকে সুবিধা দিতেই বাজারদরের চেয়ে সর্বোচ্চ ১৮ গুণ বেশি দামে ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছে। নিরীক্ষার সময় এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা কোনো জবাব দেননি।
সূত্র বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এসব কেনাকাটা করা হয়। তখন প্রকল্পটির পরিচালক ছিলেন মো. শওকত আকবর। ২০১৯ সালেই এ প্রকল্পে কেনাকাটায় অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সে সময় বালিশ, ড্রেসিং টেবিল, বিছানার চাদরসহ বিভিন্ন আসবাব কেনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে বালিশ কেনা এবং তা ভবনের ওপরে তোলার খরচ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই রূপপুর প্রকল্পের কেনাকাটা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির উদাহরণ হিসেবে আলোচিত। সিএজির তদন্তে দেখা গেছে, এই প্রকল্পে একটি বালিশ কিনতে সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি
সিএজির তদন্ত প্রতিবেদনে সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের কথা এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দুটি প্রতিষ্ঠান ড্রেসিং টেবিল বাবদ অতিরিক্ত দাম নিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
রূপপুর প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও তদন্ত হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত উপসহকারী প্রকৌশলী সুমন কুমার নন্দীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, রূপপুর প্রকল্পের নানা অনিয়ম যেহেতু সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছে, তাই এর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যাঁদের যোগসাজশে এই প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়ম হয়েছে, তাঁদের বিচারের আওতায় আনা উচিত।