ভুয়া খবর রোধে আইনি ব্যবস্থার কথা ভাবছে সরকার: তথ্য উপদেষ্টা

গণমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য: কে শিকার? কে শিকারি?’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। পিআইবির সেমিনার কক্ষ, ঢাকা। ২ মেছবি: প্রথম আলো

ভুয়া খবর ছড়ানো রোধে সরকার আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

জাহেদ উর রহমান বলেন, ভুয়া খবর ছড়ানো অপরাধ। তবে এটি যে অপরাধ, তা অনেকে বোঝেন না। এটি প্রতিরোধ খুব বেশি কঠিন না হলেও কোনো না কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য সরকার একধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করছে।

রাজধানীর শান্তিনগর সংলগ্ন সার্কিট হাউস রোডে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) সেমিনার কক্ষে শনিবার বিকেলে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাহেদ উর রহমান এ কথা বলেন। ‘গণমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য: কে শিকার? কে শিকারি?’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে পিআইবি।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা বলেন, দেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। একই সঙ্গে ভুয়া খবরের বিরুদ্ধে এমনভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ নিশ্চিত হতে পারে—নির্দিষ্ট অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গুজবের সঙ্গে বৈশ্বিক ডানপন্থী রাজনীতির একটি সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এ অঞ্চলে সংকট আরও গভীর। কারণ, এখানে মানুষের গণমাধ্যম–সংক্রান্ত জ্ঞান ও ডিজিটাল জ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম।

গত ১৬ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—যার প্রভাব এখনো বিদ্যমান বলে উল্লেখ করেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা।

১৫ বছরে স্বৈরাচারী সরকারব্যবস্থার কারণে অনেক বিষয় সমাজে একধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, সে সময় নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথে চলেছেন। একই প্রবণতা গণমাধ্যমেও দেখা যায়। বিগত সময়ে নিয়োগ পাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরা কারও না কারও উদ্দেশ্য সাধনে কাজ করেছেন। ভুয়া খবর ছড়ানোর প্রবণতার সঙ্গে এ ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কার্যক্রমের সম্পর্ক রয়েছে। সরকার, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের যেমন জবাবদিহি দরকার আছে, তেমনি গণমাধ্যমেরও জবাবদিহি থাকা দরকার।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তিন ধাপ অবনতি হওয়া প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকারের দোষে এমনটা হয়নি। এটি গত বছরের ঘটনা। ২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এতে বিএনপি সরকারের দোষ ছিল না, আগের সরকারের দোষ ছিল। পরবর্তী চার বছরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে উন্নতি করেছিল বাংলাদেশ। ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশ উন্নতি করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুসান ভাইজ বলেন, ভুয়া তথ্য ছড়ানো রোধে তথ্য যাচাই কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। সাংবাদিকদের তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

সুসান ভাইজ বলেন, সাংবাদিকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সংবাদ–সংক্রান্ত তথ্য বোঝার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এসব বিষয়ে নাগরিক সমাজের সোচ্চার থাকা এবং সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, আমেরিকায় ডানপন্থীরা সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়াচ্ছে। ভারতে গোদি মিডিয়ার সঙ্গে ডানপন্থীদের একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশে গত দুই বছরের বাস্তবতা পাঠ করলে দেখা যায়, এখানে ডানপন্থীদের সঙ্গে গুজবের ইতিবাচক সম্পর্ক আছে। গুজব শুধু ছড়ানো হচ্ছে এমন নয়, এর সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে।

প্রসঙ্গত, গোদি মিডিয়া শব্দগুচ্ছটি মূলত ভারতীয় সাংবাদিকতা ও রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি নেতিবাচক বা ব্যঙ্গাত্মক শব্দ। এর দ্বারা এমন এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যমকে বোঝানো হয়, যারা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখায়।

সেমিনারে সাংবাদিক ও শিক্ষক নাজিয়া আফরিন মনামী বলেন, ভুয়া তথ্য ছড়ানো একটি কাঠামোগত সমস্যা। এর পেছনে বড় অর্থনৈতিক শক্তি কাজ করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাও থাকতে পারে।

সেমিনারে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভাষা-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মামুন অর রশীদ।

এতে বলা হয়, গুজব ছড়ানোর সঙ্গে মনিটাইজেশন (ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে থেকে আয় করার প্রক্রিয়া) আর রাজনৈতিক এজেন্ডার যোগ থাকতে পারে। নির্বাচন বা ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সামনে এলে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বাড়ে। অনলাইন মিডিয়া এই তথ্য বেশি ছড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছড়ায় ফেসবুকে। সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু থাকে সরকার বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে পিআইবি মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, অনেক সময় মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে অলিগার্ক (ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি), বড় গণমাধ্যম, করপোরেট মিডিয়াগুলো টাকা আয় করে। সরকার ও জনগণের কাছে তাঁদের জবাবদিহি জরুরি।

সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন ঢাকা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল ইসলাম, ফ্যাক্ট চেকার কদরুদ্দিন শিশির, দৈনিক সমকালের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাজিব আহাম্মদ প্রমুখ।