মারধরের শিকার নারী ভোক্তা অধিকারে অভিযোগকারী কিংবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নন

কোলাজ: প্রথম আলো গ্রাফিকস

একটি বাজারে পুলিশের উপস্থিতিতে এক নারীকে কয়েকজনের লাথি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী পুলিশ সদস্য গোলাপি সালোয়ার-কামিজ পরা এক নারীকে হাত ধরে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পেছনে রয়েছেন আরও দুই পুলিশ সদস্য। এ সময় এক যুবক ওই নারীকে লাথি দিলে পেছনে থাকা এক পুলিশ সদস্য তাঁকে সরিয়ে দেন। এরপর আরও দুজন ব্যক্তি ওই নারীকে লাথি দেন।

ভিডিওটির অন্য অংশে কয়েকজন ব্যক্তিকে ওই নারীকে শাসাতে দেখা যায়। শেষের দিকে ওই নারীকে ক্যামেরার সামনে ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ করতেও দেখা যায়।

২৭ সেকেন্ডের এই ভিডিও সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশ করে ভিন্ন ভিন্ন পোস্টে ভিন্ন পরিচয় ও ঘটনার প্রেক্ষাপট দাবি করা হয়েছে।

ভিন্ন পরিচয়ে ভিডিওটি ছড়াল

ভিডিওটি পোস্ট করে পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘একজন মহিলা একটা দোকান সম্পর্কে ভোক্তা অধিকারের কাছে অভিযোগ দিয়েছিল। পরবর্তীতে ভোক্তা অধিকার সেখানে গেলে মার্কেটের লোকেরা সেই মহিলার ওপর এভাবেই হামলা করে। পুলিশের সামনে একজন নারীর নিরাপত্তা নাই। কাঁদো নারীরা কাঁদো।’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

অন্য একটি ফেসবুক পেজ থেকে একই ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন যে একজন ম্যাজিস্ট্রেট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলে কিল, ঘুসি, লাথি মারে—ভয়ংকর অপরাধ কেমন চলছে বাংলাদেশ।’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও ভিডিওটি শেয়ার করা হয়েছে। ৩০ আগস্ট ‘বাংলাদেশ এক্সপোজ’ নামের একটি পেজে প্রকাশিত ভিডিওটি শেয়ার করে সেখানে দাবি করা হয়, ‘একজন নারী দোকানের পণ্য নিয়ে ভোক্তা অধিকারে কাছে অভিযোগ দিলেই পুলিশের সামনেই সেই নারীর ওপর বর্বরোচিত হামলা করে। চলছে বিএনপির শাসনামল…।’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত একটি ফেসবুক পেজেই প্রচারিত দাবিতে প্রকাশিত ভিডিওটি ৬ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘ডিউ ইনসাইডারস’ নামের একটি ফেসবুক পেজও ঘটনাটি নিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে। ৪ লাখ ৩০ হাজার অনুসারীর ওই পেজের ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘রাজবাড়ীতে ভোক্তা অধিকার অভিযান পরিচালনার সময় অভিযোগকারী নারীকে লাথি ও ঘুসি বিএনপি নেতাকর্মীদের। চুপ আছে নারীবাদী সমাজ।’

লিংক: এখানে

এ রকম দাবিতে ভিডিওটি ৭০টির বেশি ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল থেকে ছড়িয়ে পড়েছে।

শুধু রাজনৈতিক সমর্থক পেজগুলোই নয়, অনেক সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীও ভিডিওটি দেখে বিভ্রান্ত হয়ে তা শেয়ার করেছেন। কেউ কেউ ঘটনার সঙ্গে ভোক্তা অধিকার কিংবা রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার দাবিকে সত্য ধরে নিয়ে ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, তা জানতে চেয়েছেন।

ঘটনাটি কোথাকার

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পর্যালোচনা করা হয়। ভিডিওর পেছনে ‘উত্তরা ব্যাংক পিএলসি, রাজবাড়ী শাখা, রাজবাড়ী’ লেখা একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। এই সূত্র ধরে স্থানটির জিওলোকেশন যাচাই করা হলে ভিডিওতে দেখা স্থানের সঙ্গে রাজবাড়ীর ওই এলাকার মিল পাওয়া যায়।

এরপর প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধান করে জাতীয় পর্যায়ের একাধিক সংবাদমাধ্যমে একই ঘটনার প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদনে ‘রাজবাড়ীতে নারী উদ্যোক্তাকে মারধরের অভিযোগ’সহ বিভিন্ন শিরোনামে ঘটনাটি প্রকাশ করা হয়েছে জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে ।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯ আগস্ট দুপুরে রাজবাড়ীর কাপড় বাজারে পুলিশের উপস্থিতিতে নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানাকে লাথি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল হকও ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কেন হামলার ঘটনা

প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ীতে এক নারী ব্যবসায়ীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী ওই নারী ব্যবসায়ীর নাম জাকিয়া সুলতানা। তিনি শহরের কাদেরিয়া মার্কেটের তৃতীয় তলায় ‘আস্থা পোশাকশিল্প’ নামের প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী।

সম্প্রতি জাকিয়া সুলতানাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ৪০ থেকে ৫০ জন নারী বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। পরে জাকিয়া বাজারে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিলে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়।

একপর্যায়ে তাঁকে ধাওয়া করলে পুলিশ জাকিয়াকে হেফাজতে নেয়। পুলিশ তাঁকে সরিয়ে নেওয়ার সময়ই কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে লাথি দেন বলে স্থানীয়রা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ওই সময়েরই বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে জাকিয়ার সাবেক কর্মী শাহানা পারভীন বৃষ্টির সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক বিরোধের কথা জানা যায়। বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে বাজারে নিজে দোকান দেওয়ার পর তাঁদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বৃষ্টির দোকান বন্ধ করে দেওয়ার জন্য জাকিয়া বাজার কমিটিকে চাপ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে জাকিয়ার দাবি, বৃষ্টি তাঁর প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে না দিয়ে চাকরি ছেড়ে তাঁকে হুমকি দিয়েছেন।

ব্যবসায়ীরা জাকিয়ার বিরুদ্ধে কর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ তুললেও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বরং নিজের ওপর হয়রানি ও হামলার অভিযোগ করেছেন। ঘটনার পর ব্যবসায়ীরা তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন।

এ ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেননি জানিয়ে ওই নারী ব্যবসায়ী বলেন, তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

রাজবাড়ী বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক বেনজির আহমেদ বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি কাপড় বাজারে গিয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে উভয় পক্ষ বসে বিষয়টির সমাধান করেছে।

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো পক্ষ থানায় অভিযোগ করেনি বলে জানান রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ।

ভোক্তা অধিকারের অভিযান ছিল না

ভিডিওটির সঙ্গে জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান জড়িত—এমন দাবিরও কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

৩০ আগস্ট জাতীয় ভোক্তা–অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পোস্টে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। সেখানে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোক্তা অধিকারের সঙ্গে জড়িয়ে প্রচারিত ভিডিওটির ঘটনার সঙ্গে রাজবাড়ী জেলা কার্যালয় কিংবা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত কোনো অভিযানের সম্পর্ক নেই।

লিংক: এখানে

একই পোস্টে অধিদপ্তর জানায়, ভিডিওতে সংশ্লিষ্ট নারী জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগও দাখিল করেননি।

তিনি ম্যাজিস্ট্রেটও নন

ভিডিওটির আরেকটি ক্যাপশনে মারধরের শিকার নারীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে যাচাইয়ে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশিত একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে ওই নারীকে রাজবাড়ীর নারী উদ্যোক্তা ও কাপড় ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

সত্য ঘটনা, বদলে গেছে পরিচয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে নারীর ওপর হামলার ঘটনাটি সত্য। তবে ভিডিওটির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ভোক্তা অধিকার অভিযান, অভিযোগকারী নারী, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা বিএনপি নেতা–কর্মীদের হামলার দাবিগুলোর সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার মিল নেই।

প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওটি রাজবাড়ীর কাদেরিয়া মার্কেটের নারী উদ্যোক্তা জাকিয়া সুলতানাকে ঘিরে সৃষ্ট বিরোধ ও উত্তেজনার সময় পুলিশের উপস্থিতিতে তাঁকে মারধরের ঘটনার দৃশ্য।