বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীর সংখ্যা এক শ ছাড়িয়েছে

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির কয়েকজন সদস্য। সোমবার সকালে ঘুমধুম বিজিবি ক্যাম্পেছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্তে সেনা ও বিদ্রোহীদের লড়াইয়ে এবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটল বাংলাদেশে। গতকাল সোমবার মিয়ানমার থেকে ছোড়া গোলায় (মর্টার শেল) বাংলাদেশে দুজন নিহত হয়েছেন। সীমান্তের ওপারে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে গতকাল দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) আরও ৩৮ জন সদস্য অস্ত্রসহ পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। এ নিয়ে গত দুই দিনে ১০৬ জন সীমান্তরক্ষী বাংলাদেশে এসেছেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানান, গতকাল বেলা পৌনে তিনটার দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নে একটি বাড়িতে মর্টার শেল এসে পড়ে। এতে দুজন নিহত হন। তাঁদের একজন বাংলাদেশি নারী ও অন্যজন রোহিঙ্গা পুরুষ।

কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত–সংলগ্ন এলাকায় যুদ্ধ জোরালো করেছে আরাকান আর্মিসহ কয়েকটি গোষ্ঠী। তারা সম্মিলিতভাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। এর মধ্যে তারা কোনো কোনো সীমান্ত শহর দখল করে নিয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানাচ্ছেন, রোববার রাতভর সীমান্তের ওপার থেকে থেমে থেমে গুলি ও গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে। গতকাল সকালে কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকলেও ১১টার পর থেকে আবার গোলাগুলি শুরু হয়। মিয়ানমার থেকে এর আগেও বাংলাদেশে এসে পড়েছে মর্টার শেল ও গুলি। গুলিতে বাংলাদেশি আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ওপারে কয়েক দিন ধরে চলা সংঘাতের কারণে আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টার শেলের আঘাতে নিহত হন রোহিঙ্গা নবী হোসেন। কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী হাজেরা বেগম ও ছেলে ইমাম হোসেন। সোমবার বেলা তিনটায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী গ্রামে
ছবি: এস এম হানিফ

মিয়ানমার সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যে দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ধৈর্য ধারণ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের অনুপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে গতকাল জাতীয় সংসদকে এই তথ্য জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, মিয়ানমার থেকে যাঁরা পালিয়ে এসেছেন, তাঁদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।

আতঙ্কে বাড়িঘর ছাড়ছেন বাসিন্দারা

কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক থেকে পূর্ব দিকে এশিয়ান হাইওয়ে। এশিয়ান হাইওয়ের বেতবুনিয়া বাজার থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে ঘুমধুমের জলপাইতলী এলাকা। সেখানে বাদশা মিয়া নামের এক ব্যক্তির বাড়ির রান্নাঘরে এসে পড়ে গোলা। গোলার আঘাতে বাদশা মিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা (৫৫) ও বাড়ির পাশে ধানখেতে কাজ করা রোহিঙ্গা শ্রমিক নবী হোসেন (৬৫) নিহত হন। এতে আহত হয়ে বাদশা মিয়ার নাতনি নুসরাত মণি (৬) উখিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ ঘটনার পর সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছেন। নিহত হোসনে আরার প্রতিবেশী মোহাম্মদ শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, পরিবারের চার সদস্য নিয়ে উখিয়া সদরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, পাশের বাড়িতে না পড়ে সেই গোলা তাঁর বাড়িতেও পড়তে পারত। ভয়ে তাঁর পরিবারের কেউ বাড়িতে থাকতে চাচ্ছেন না।

বেতবুনিয়া সড়কে গতকাল বিকেল চারটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত এক ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা যায়, এ সময়ের মধ্যে জলপাইতলীসহ আশপাশের আরও দুটি গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবার কাপড়চোপড় নিয়ে অন্যত্র যাচ্ছেন।

নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে গাড়ির অপেক্ষায় এক নারী। আতঙ্কে গ্রাম ছাড়ছেন তিনি। সোমবার বিকেলে ঘুমধুমের পশ্চিমকুল এলাকায়
ছবি: এস এম হানিফ

ছালেহা বেগম নামের এক নারী বলেন, দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় সবাই আতঙ্কিত। এ কারণে বাড়ি ছেড়ে বোনের বাড়ি যাচ্ছেন। বেতবুনিয়া বাজারের ব্যবসায়ী শামশুল আলম বলেন, মিয়ানমার থেকে একের পর এক মর্টার শেল ও গুলি এসে পড়ছে বাড়িঘরে। এ জন্য পরিবার নিয়ে মেয়ের বাড়িতে যাচ্ছেন।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে কেউ কেউ অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে এলাকায় আছেন।

গতকাল ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু ক্যাম্পপাড়া, মাঝেরপাড়া, কোনারপাড়া এলাকার মানুষ আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সীমান্ত এলাকার সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শান্তনু কুমার দাশ।

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় পাঁচজনকে আটক করার খবর জানা গেছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং উলুবনিয়া সীমান্তে তাঁদের আটক করা হয়।

হোয়াইক্যং ইউপি সদস্য জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, ‘একটি রোহিঙ্গা পরিবার বাংলাদেশে ঢুকে পড়লে সীমান্তে বিজিবির সদস্যরা তাঁদের আটকে দেন বলে আমরা শুনেছি। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি।’

মিয়ানমার থেকে ছোড়া একটি মর্টার শেল এসে পড়ে সীমান্তের এপারে একটি রান্নাঘরে। নিহত হন বাংলাদেশি এক নারী ও এক রোহিঙ্গা। সোমবার বিকেলে ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী গ্রামে
ছবি: এস এম হানিফ

কক্সবাজারে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে জানান, ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছেন দেশটির চাকমা সম্প্রদায়ের প্রায় ৪০০ জন। পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গাও সীমান্তে জড়ো হচ্ছেন। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।

আরও এলেন ৩৮ সীমান্তরক্ষী

তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে গতকাল মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) আরও ৩৮ সদস্য বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন বলে জানা গেছে। বিজিবি সূত্র জানায়, গত দুই দিনে বিজিপির ১০৬ সদস্য সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা আহত তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ঘুমধুম সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়কে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন বিজিবির কক্সবাজার অঞ্চলের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোরশেদ আলম। তিনি বলেন, মিয়ানমারের ছোড়া মর্টার শেলে দুজন নিহতের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে সংঘাত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিজিবি। সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পালিয়ে আসা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের নিরস্ত্র করে বিজিবি হেফাজতে আনা হয়েছে।

ওপারে সংঘর্ষ চলছেই

বান্দরবান ও টেকনাফ সীমান্তের ওপারে থেমে থেমে গুলি ও গোলাবর্ষণের শব্দ শোনা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে রোববার রাত ১১টার দিকে মিয়ানমারের ঢেঁকিবনিয়া সীমান্তচৌকি ঘিরে গোলাগুলি শুরু হয়। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত গোলাগুলি চলে। এরপর গোলাগুলি বন্ধ হয়। তবে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে আবার ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ আসতে থাকে। এর মধ্যে পৌনে তিনটার দিকে মর্টার শেলের আঘাতে দুজন নিহত হন।

মিয়ানমারের ঢেঁকিবনিয়া সীমান্তচৌকিতে আরাকান আর্মির হামলার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির কয়েকজন সদস্য। তাঁদের পাহারা দিচ্ছেন বিজিবির সদস্যরা। সোমবার দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম বিজিবি ক্যাম্পে
ছবি: এস এম হানিফ

স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, টেকনাফের হোয়াইক্যং উলুবনিয়া সীমান্তের ওপার থেকে গতকাল সকালে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। হেলিকপ্টার থেকেও গুলি ছোড়া হচ্ছে। হোয়াইক্যং ইউপি সদস্য জালাল আহমেদ বলেন, ‘মিয়ানমারের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলি এবং বোমার শব্দ আমরা শুনতে পাচ্ছি। ভয়ে সীমান্ত থেকে লোকজন সরে যাচ্ছেন। অনেকে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।’