বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বাংলাদেশিদের ওপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফের) গুলির ঘটনা পুরোনো। কিন্তু সম্প্রতি বিএসএফের পাশাপাশি ভারতীয় খাসিয়াদের গুলিতেও বাংলাদেশি হত্যার ঘটনা ঘটছে।
এমন তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম সকল প্রাণের নিরাপত্তা (সপ্রান)। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনে একটি প্যানেল আলোচনার আয়োজন করে সপ্রান। সেখানে ‘কাঁটাতারের এপাড়ওপাড়: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সহিংসতা, পুশ-ইন ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা’ শীর্ষক একটি খসড়া গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়।
এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিএসএফের গুলিতে ৩২ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বিএসএফের গুলি ছাড়াও ১২ বাংলাদেশিকে গুলি করে, পিটিয়ে ও বিভিন্নভাবে হত্যা করে ভারতীয় খাসিয়ারা। সপ্রান এ তথ্য জানায় মানবাধিকার সংস্থা অধিকার, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বরাত দিয়ে।
খসড়া গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন সপ্রানের গবেষক নুসরাত জাহান। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফ হত্যা করেছে ৬২৫ জনকে। আর বিএসএফের অত্যাচারে আহত হয়েছেন ৮০৮ বাংলাদেশি। গত বছর ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ ইনের শিকার হয়েছেন অন্তত ২ হাজার ৪৩৬ জন।
নুসরাত জাহান জাহান জানান, সপ্রান সীমান্তে নির্যাতনের শিকার মানুষ এবং নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তাঁরা কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। মানুষের এ অনীহার পেছনে রয়েছে পরবর্তী সময়ে আরও বেশি নির্যাতনের ভয়।
সীমান্তে যাঁরা ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ ইনের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের বেশির ভাগ মুসলিম ও বাংলাভাষী বলে উল্লেখ করেন নুসরাত জাহান। তিনি বলেন, যেসব মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হচ্ছে, পরবর্তী সময়ে বিএসএফ এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারকে কোনো তথ্যও দিচ্ছে না। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করা হয়।
সপ্রানের পক্ষ থেকে সীমান্তের মানুষের এই দুর্ভোগ লাঘবে সাউথ এশিয়ান সিভিল সোসাইটি গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে সীমান্তবর্তী মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়। এ ছাড়া সার্ক ও সাফটার সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার যাতে সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়, সেই তাগিদ দেওয়া হয়।
সীমান্তে চোরাচালান ও যাতায়াত ঠেকানো জটিল বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ওপেন ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস। তিনি বলেন, রাষ্ট্র যে চোরাচালান ও অবৈধ যাতায়াতের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সীমান্ত এলাকার মানুষেরা তার ওপর নির্ভর করেই জীবন নির্বাহ করে। কারণ, সরকার তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই এই মানুষগুলোর চোরাচালানে জড়িত না হলে জীবিকা নির্বাহ করা কষ্ট হয়ে যায়।
অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস আরও বলেন, হাজারো মানুষের অন্ন, বস্ত্র নির্ভর করছে বর্ডারে চোরাচালানের ওপর। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে যে মানুষের আর কোনো উপায় নেই এটা করা ছাড়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা যখন সীমান্তের সমস্যা নিয়ে কথা বলছি, তখন ভারত আমাদের দেশ থেকে আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যাওয়া এবং লম্বা সময় অনির্বাচিত হয়েও প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা একজনকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। আর তাদের সীমান্ত বাহিনী আমাদের দেশের অসহায় মানুষদের গুলি করে হত্যা করছে।’
দৃকের ফটোগ্রাফি ও আর্কাইভ বিভাগের টিম লিডার পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখি, গরু পাচারের কিংবা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়। কিন্তু সীমান্তের ওই পারে এই গরু কারা বিক্রি করেছে বা মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে বিএসএফ কিছু করেছে বলে দেখা যায় না।’
পারভেজ আহমেদ জানান, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশিদের হত্যা ও নির্যাতন নিয়ে ছবি তোলেন এবং তদন্ত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো বাংলাদেশি হত্যার পর বিএসএফ কখনোই নিহত ব্যক্তির লাশ যথাসময়ে দেয় না। লাশের সঙ্গে যথাযথ নথিও সরবরাহ করতে চায় না। আর লাশ হস্তান্তর করার জন্য এমন স্থান নির্ধারণ করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য যাতায়াত দুর্গম হয়।
পারভেজ আহমেদ বলেন, সীমান্তের সমস্যা সমাধানে সরকারের শক্ত পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি, যাতে সীমান্তের সমস্যা সমাধানে শক্তভাবে দর–কষাকষি করা যায়।
সপ্রানের গবেষক অপসরা ইসলামের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের ডকুমেন্টেশন অফিসার জারিন ইতু। অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও আলোচনায় উপস্থিত হননি যুক্তরাষ্ট্রে কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাভিন মুরশিদ। তবে তিনি একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান। সেই বক্তব্য পড়ে শোনান সপ্রানের গবেষক নুসরাত জাহান। সমাপনী বক্তব্য দেন সপ্রানের গবেষণা পরিচালক জারিফ রহমান।