পুলিশের পোশাক বদলে ব্যয় হয়েছিল ৭৬ কোটি টাকা, আবার নতুন চান

  • জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসে।

  • ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়।

  • গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।

নতুন পোশাকে দুই পুলিশ সদস্য। ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেফাইল ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশ পুলিশ যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের ইউনিফর্ম বা নির্ধারিত পোশাক বদলে নতুন পোশাক চায়। গত এক সপ্তাহে দুবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করে নতুন পোশাকের পাঁচ ধরনের রং উপস্থাপন করেছে পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ চায়, সরকার সেখান থেকে একটি ধরন বেছে নিক।

যদিও তাড়াহুড়া নয়, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষপাতী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বারবার পোশাক বদলের সুযোগ নেই। এ জন্য ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা খরচেরও বিষয়।

পুলিশের পোশাক একবার বদলাতে কত খরচ হয়, সে হিসাব নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তবে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশের পোশাক তৈরির জন্য কাপড় সরবরাহে দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, যার অর্থমূল্য ছিল ৭৬ কোটি টাকা।

অনেক পুলিশ সদস্য পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরাও পোশাকের রং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, এই রঙের পোশাক দেখতে ভালো লাগছে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল (ব্যঙ্গ) হওয়ায় তাঁরা অস্বস্তি বোধ করছেন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশে সংস্কারের দাবি ওঠে। কেউ কেউ পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের দাবিও করেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ২০ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। নির্ধারিত হয় আয়রন (লোহা) রঙের পোশাক। গত বছর ২৫ নভেম্বর নতুন পোশাকে মাঠে নামে পুলিশ। যদিও সবাই এখনো নতুন পোশাক পায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৭৬ কোটি টাকায় নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়।

পুলিশের পাশাপাশি র‍্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। র‍্যাবের জন্য জলপাই (অলিভ) রঙের এবং আনসারের জন্য সোনালি গমের (গোল্ডেন হুইট) রঙের পোশাক নির্ধারণ করা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে র‍্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তন হয়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি–মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন গত বছরের নভেম্বরে প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, দেশে পুলিশের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। পুলিশ সদস্যদের বছরে পাঁচ ‘সেট’ পোশাক দেওয়া হয় সরকারিভাবে।

কেন পোশাক পরিবর্তন

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এর আগে ২০০৪ সালে পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছিল। প্রায় ২১ বছর পর ২০২৫ সালে পুলিশের পোশাকে পরিবর্তন আনা হয়। যদিও সেই পোশাক নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। অনেক পুলিশ সদস্য পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরাও পোশাকের রং নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, এই রঙের পোশাক দেখতে ভালো লাগছে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল (ব্যঙ্গ) হওয়ায় তাঁরা অস্বস্তি বোধ করছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, পুলিশের পাঁচজন কনস্টেবল পাঁচ রঙের পোশাক পরে গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান। তাঁরা পাঁচটি পোশাকের রং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখান—খাকি শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট; খাকি শার্ট ও খাকি প্যান্ট; আগের গাঢ় নীল রঙের (নেভি ব্লু শার্ট-প্যান্ট) পোশাক; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদন পাওয়া লোহা (আয়রন) রঙের পোশাক এবং আকাশি শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট।

বিএনপি সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশের জন্য যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং, আবহাওয়া এবং সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো প্রকার জনমত যাচাই ছাড়াই নির্বাচিত এই পোশাকের সঙ্গে ইউনিফর্মধারী অন্যান্য সংস্থার পোশাকের হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। এ কারণে মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য তড়িঘড়ি করে নেওয়া এই পরিবর্তনের পক্ষে নন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২৮ মার্চ রাজশাহীর সারদায় অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, বর্তমান পোশাকে পুলিশ বাহিনী সন্তুষ্ট নয়। পুলিশ যেন আগের ঐতিহ্যমণ্ডিত কোনো একটি পোশাক ফিরে পায়, সে বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহলে আলোচনা করে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পাঁচ রং

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, পুলিশের পাঁচজন কনস্টেবল পাঁচ রঙের পোশাক পরে গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান। তাঁরা পাঁচটি পোশাকের রং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখান—খাকি শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট; খাকি শার্ট ও খাকি প্যান্ট; আগের গাঢ় নীল রঙের (নেভি ব্লু শার্ট-প্যান্ট) পোশাক; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদন পাওয়া লোহা (আয়রন) রঙের পোশাক এবং আকাশি শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট।

আগের পোশাকের কী হবে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পুলিশের নতুন পোশাকের কাপড় কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। ৫১ কোটি টাকার কাজ পায় নোমান গ্রুপ। আর ২৫ কোটি টাকার কাজ পায় প্যারামাউন্ট গ্রুপ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই দুই ঠিকাদার সরবরাহ শুরুর পর গত বছর ১৫ নভেম্বর থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশসহ (ডিএমপি) দেশের সব মহানগর পুলিশ ও বিশেষায়িত ইউনিটে নতুন পোশাক পরা শুরু করে। তবে জেলা পুলিশ নতুন পোশাক পায়নি।

এক বছর পার না হতে আবার পোশাক পরিবর্তন করা কতটা ঠিক, তা সরকারকে ভাবতে হবে। নতুন পোশাক দিতে রাষ্ট্রের অর্থ খরচ হয়। তার চেয়ে পুলিশের সেবার মান ও পেশাগত উৎকর্ষ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন

এখন পর্যন্ত কত সেট পোশাক পাওয়া গেছে এবং কত টাকা খরচ হয়েছে—সে বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে নোমান গ্রুপের পরিচালক শহীদুল্লাহ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের নতুন লোহার (আয়রন) রঙের মোট ১০ লাখ মিটার কাপড় সরবরাহ করার কথা। এখন পর্যন্ত ৩ লাখ মিটার কাপড় দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে আপাতত কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। নতুন রঙের নকশা দিলে সে আলোকে কাজ করতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কাপড় ঠিক থাকবে। তবে রং পরিবর্তন হবে। এতে অর্থের অপচয় হবে না।

পুলিশের অনেক সদস্যকে ইতিমধ্যে নতুন পোশাক দেওয়া হয়েছে। এখন রং বদলাতে সেগুলো ফেলে দিতে হবে এবং তাঁদের নতুন পোশাক পরতে হবে। এতে অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা আছে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থ সাশ্রয়ের ওপর জোর দেওয়া দরকার।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এক বছর পার না হতে আবার পোশাক পরিবর্তন করা কতটা ঠিক, তা সরকারকে ভাবতে হবে। নতুন পোশাক দিতে রাষ্ট্রের অর্থ খরচ হয়। তার চেয়ে পুলিশের সেবার মান ও পেশাগত উৎকর্ষ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত।