“চীনের রূপকথা’ নামে একটি বই পড়েছি। সাত ভাইয়ের একটি গল্প ছিল। সাত ভাইয়ের সাত ধরনের বিশেষ ক্ষমতার গল্প বলা হয়েছে। নিজেদের রক্ষা করতে তারা কীভাবে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে, তা পড়ে আমার মনে হয়েছে, আমারও যদি এমন ক্ষমতা থাকত, তাহলে কতই না ভালো হতো!’—বই পড়ে নিজের ভাবনার কথা এভাবেই শুনিয়েছে রাজশাহী শহরের অদূরে অবস্থিত চারঘাট পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রোখসানা মিমি।
বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের এমন সব ভালো বই পড়ে কখনো গল্পের চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখে, কখনো অচেনা দেশ ও মানুষের জীবন সম্পর্কে জানতে পারে মিমির মতো লাখো শিক্ষার্থী। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডির বাইরে তাদের সামনে সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও কল্পজগতের সমৃদ্ধ ভান্ডার খুলে দিতে চার যুগের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে বইপড়া কর্মসূচি পরিচালনা করছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
শিক্ষার মাধ্যমে একটি মননশীল ও আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলার এই লক্ষ্যকে নিজেদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে টানা ১২ বছর ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিকাশ। আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হয়েও বিকাশ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বই পড়ানোর এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। এ প্রয়াস দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও আলোকিত ও সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখছে।
১২ বছরে উপকৃত ৩২ লাখ শিক্ষার্থী
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কার্যক্রমে অংশীদারত্বের মাধ্যমে গত ১২ বছরে ৪ লাখের বেশি বই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতরণ করেছে বিকাশ। বিকাশের সহায়তায় বিতরণ করা বইগুলো প্রায় তিন হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে ৩২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ও পাঠক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
পুরোনো স্কুলগুলোর পাশাপাশি প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০০টি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ কর্মসূচির আওতায় যুক্ত হচ্ছে। কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় দেশের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে, যেখানে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মনে করেন, স্কুলের শিক্ষার্থীরাই এ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য। এই বয়সে তাদের গ্রহণক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ বইগুলোর সঙ্গে যদি তারা এই সময়েই পরিচিত হতে পারে, তাহলে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব তাদের ব্যক্তিজীবন ও ভবিষ্যতের চিন্তায় প্রতিফলিত হবে।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘এই ১২ বছরে আমরা বিকাশের কাছ থেকে ৪ লাখ বই পেয়েছি, যা দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে। এই ৪ লাখ বই অন্তত ৩২ লাখ ছেলে–মেয়ে পড়েছে। বিকাশ যদি এই অর্থটা অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করত, তাহলে হয়তো একটু বেশি লাভবান হতো। কিন্তু তা না করে এখানে বিনিয়োগ করেছে। এতে বিকাশ লাভবান হয়েছে কি না, জানি না, কিন্তু জাতি লাভবান হয়েছে।’
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ্যের সঙ্গে দায়িত্বশীল করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছে বিকাশ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর বলেন, ‘যাত্রার শুরু থেকেই বিকাশের লক্ষ্য দেশের মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। সেই সঙ্গে একটি দায়িত্বশীল করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা। এই বিশ্বাস থেকেই ১২ বছর ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিকাশ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগের সঙ্গে আমাদের যুক্ত করার জন্য তাদের ধন্যবাদ। আমরা সব সময়ই এমন উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়েছি, যা তরুণ প্রজন্মকে পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার জগতে নিয়ে যায়।’
‘ফেলুদা’ থেকে ‘লা মিজারেবল’
১১ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের বয়স ও মানসিক বিকাশের উপযোগী সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন ও জ্ঞানভিত্তিক বই নির্বাচন করা হয়।
সেন্ট যোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হোসেন কহন (কাব্য) সব ধরনের বই পড়তে আগ্রহী। তার সবচেয়ে প্রিয় ‘ফেলুদা সমগ্র’। কাব্য বলে, ‘ফেলুদা পড়তে পড়তে আমার মনে হচ্ছিল, আমিই যেন তোপসে। বই পড়ার পর অনেক নতুন কিছু করার ইচ্ছা হয়।’
রংপুরের রিফাত পড়েছে ‘লা মিজারেবল’। সে বলে, ‘বইটি পড়ে আমার এত দুঃখ লেগেছিল, মনে হচ্ছিল, চরিত্রটির কষ্ট দেখতে পাচ্ছি। লাইব্রেরিতে অনেক ধরনের বই থাকায় বাড়িতে নিয়ে পড়া সহজ হয়।’
তেমনই একজন চারঘাট পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক সুফিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে পাঠানো বইয়ের মধ্যে “লাল নীল দীপাবলি” বইটি ছিল। বাংলা ভাষার ইতিহাস অনেক বাচ্চাই সহজে পড়তে আগ্রহী হয় না। এখানে গল্পের মতো করে যেভাবে লেখা হয়েছে, তাতে আমার নিজেরও অনেক ধারণা স্পষ্ট হয়েছে। ভালো বইগুলো আমাদের লাইব্রেরিতে থাকায় বাচ্চাদের সঙ্গে সেগুলোর পরিচয় করানো আমাদের জন্য সহজ হয়।’
কাব্য, রিফাত ও মিমির মতো লাখো শিক্ষার্থীকে পাঠ্যক্রমের বাইরের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এই কার্যক্রম। এতে তাদের কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকশিত হচ্ছে। তবে বই পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বুঝে বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে শিক্ষক ও গ্রন্থাগারিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।