জোয়ার-ভাটার হিসাব করে মানুষ ‘গলফ’ করতেন জিয়াউল: জবানবন্দিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাব্বির
পানির গভীরতা ও জোয়ার-ভাটার হিসাব করে নৌকায় অবস্থানরত র্যাব সদস্যদের খোলের ভেতর থেকে হাত বাঁধা লোককে বের করে আনতে বলতেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। তাঁর নির্দেশে র্যাব সদস্যরা সেই ব্যক্তিকে হত্যার পর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে পানিতে ফেলে দিতেন। জিয়াউল আহসান এভাবেই মানুষ গলফ (হত্যার পর পানিতে ফেলে দিয়ে লাশ গুম) করতেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ বৃহস্পতিবার জবানবন্দিতে মেজর (অব.) মো. সাব্বির রহমান ওসমানী এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ সাব্বির রহমান ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনাতে ডেপুটি এক্সাম কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত আছেন।
জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান বলেন, তিনি ১৯৯৩ সালের ১৮ জুন ২৮তম বিএমএ লংকোর্সের সঙ্গে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে র্যাবে বদলি করা হয়। তখন তিনি মেজর ছিলেন। ২০০৯ সালের অক্টোবরে তিনি র্যাব-৮-এ বরিশালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। তখন র্যাবের ডিজি ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার। এডিজি (অপস) ছিলেন কর্নেল মতিউর রহমান। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান।
জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান বলেন, তাঁর রুটিন দায়িত্ব পালনকালে ২০১০ সালের জানুয়ারির দিকে একদিন রাত্রে অফিস চলাকালে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান তাঁর সরকারি গাড়ি ও মাইক্রোবাস নিয়ে ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। তিনি সরাসরি অধিনায়কের অফিসে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর অধিনায়ক তাঁকে ডেকে পাঠান। অধিনায়কের অফিসে উপস্থিত হলে জিয়াউল কুশল বিনিময় করে তাঁকে জানান, তিনি একটি কাজে বের হবেন। তাঁর অধিনায়ক ও তাঁকে জিয়াউলের সঙ্গে যেতে হবে। তখন কোনো অপারেশন দল প্রস্তুত করতে হবে কি না, জানতে চাইলে জিয়াউল বলেন প্রয়োজন নেই। এরপর তাঁরা জিয়াউলের গাড়িতে উঠে বসেন। জিয়াউলের গাড়ির পেছেন ঢাকা র্যাবের গোয়েন্দা শাখা থেকে আসা মাইক্রোবাসটিও অনুসরণ করতে থাকে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা গাড়ি চলার পর তাঁরা পাথরঘাটা চরদুয়ানী ঘাটে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকেই র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা একটি ট্রলার প্রস্তুত করে রেখেছিলেন।
সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, প্রথমে ঢাকা থেকে আসা গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা ট্রলারে ওঠেন। এ সময় একজন ব্যক্তিকে হাত বাঁধা এবং মাথায় কালো টুপি পরা অবস্থায় ট্রলারে ওঠানো হয়। তাঁকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হয়। এরপর জিয়াউল, তাঁর অধিনায়ক ও তিনি ট্রলারের সুকানি যেখানে বসেন, সেখানে উঠে বসেন। জিয়াউল সুকানিকে চরদুয়ানী খাল থেকে বের হয়ে মোহনার দিকে যেতে বলেন। আনুমানিক তিন ঘণ্টা চলার পর জিয়াউল তাঁকে (সাব্বির) ট্রলারের গতি কমিয়ে পানির গভীরতা মাপতে বলেন। পানির গভীরতা ও জোয়ার-ভাটার হিসাব করে জিয়াউল নৌকায় থাকা র্যাব গোয়েন্দা শাখার সদস্যদের খোলের ভেতর থেকে হাত বাঁধা লোকটিকে বের করে আনতে বলেন। লোকটিকে নৌকার বাইরে আনার সঙ্গে সঙ্গে র্যাবের গোয়েন্দা শাখার চারজন সদস্য তাঁকে ঘিরে ফেলেন। এরপর ওই ব্যক্তির গলা ও পা বরাবর দুটি সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বাঁধা হয়। পরে তাঁকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয় এবং পেট কাটা হয়। এরপর সবকিছু ঠিক আছে বলে সিগন্যাল দিলে জিয়াউল সুকানিকে ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ বৃদ্ধির জন্য আরপিএম বাড়িয়ে গতি কমিয়ে দিতে বলেন।
এ সময় জিয়াউল পুনরায় তাঁকে পানির গভীরতা মেপে বলতে বলেন উল্লেখ করে সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, এই পুরো ঘটনাটি ট্রলারের ডান পাশে সংঘটিত হচ্ছিল এবং তিনি ট্রলারের বাঁ পাশে অবস্থান করে জিয়াউলের নির্দেশে পানি মাপছিলেন। সর্বশেষ পানির গভীরতা মেপে জানানো হলে জিয়াউল ট্রলারের গতি কমিয়ে দিতে বলেন। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার ওই চারজন সদস্যকে গুলিবিদ্ধ দেহটি সিমেন্টভর্তি বস্তাসহ পানিতে ফেলে দিতে বলেন। র্যাব সদস্যরা জিয়াউলের আদেশ পালন করেন। এরপর তাঁরা ট্রলারের মুখ ঘুরিয়ে চরদুয়ানীর উদ্দেশে রওনা হন।
চরদুয়ানীতে এসে একইভাবে একটি জিপ ও একটি মাইক্রোবাসে করে বরিশালের উদ্দেশে রওনা করেন বলে উল্লেখ করেন সাব্বির রহমান ওসমানী। তিনি বলেন, ‘পথিমধ্যে পরিবেশটা অস্বাভাবিক রকমের নীরব ছিল। জিয়া স্যার পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য নিজে থেকেই বলে ওঠেন এরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এদের না থাকাই ভালো। এভাবেই এদের গলফ করতে হবে। এই প্রথম আমি এই ধরনের অভিযানকে গলফ অভিযান বলে জানলাম। এরপরও পরিবেশটা স্বাভাবিক না হওয়ায় জিয়া স্যার বলেন, “এত মন খারাপ কিংবা দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় এই বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত আছেন”।’
সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, বরিশালে পৌঁছানোর পর অধিনায়ক ও তাঁকে ব্যাটালিয়ন সদরে নামিয়ে দিয়ে জিয়াউল তাঁর গন্তব্যে চলে যান। ব্যাটালিয়নে অধিনায়ককে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করে তিনি জানতে চান, ‘স্যার এটা কী হলো, কেন হলো, আমরা কেন এর সঙ্গী হলাম?’ উত্তরে অধিনায়ক তাঁকে বলেন, ‘জিয়ার মুখ থেকে সবকিছুই শুনেছ, আমার এখানে কী করার ছিল। তবে আমি বিষয়টি নিয়ে সাধ্যমতো র্যাব হেডকোয়ার্টারে কথা বলব।’'
র্যাবে অবস্থানকালে তাঁর চাকরির ১৮ বছর পূর্ণ হলে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের জন্য দরখাস্ত করেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ২০১৪ সালে তিনি এলপিআরে (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটি) যান। র্যাবের দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর জানামতে, জিয়াউল ১৫ থেকে ২০ বার বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে গলফ অপারেশন পরিচালনা করেছেন।
এই মামলার আসামি জিয়াউল আহসান কারাগারে আছেন। আজ জবানবন্দির সময় তিনি ট্রাইব্যুনালের এজলাসের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।