মাদক শুধু একটা জীবনকে ধ্বংস করে না, একই সঙ্গে একটি পরিবারকেও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। মাদকের পরিণতি হয় ভয়াবহ। ধীরে ধীরে একটা জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তাই মাদককে না বলতে হবে। নিজের জীবন, বাবা-মায়ের জীবন ও পরিবারকে তছনছ করব না—কিশোর ও তরুণদের এই প্রতিজ্ঞা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবসে আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে বিশিষ্টজনদের বক্তব্যে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
‘মাদকের ভয়াবহতা থেকে সমাজকে মুক্ত করে তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে’ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলায় গতকাল মানববন্ধন করেছে প্রথম আলো ট্রাস্ট। এই আয়োজনের সহযোগী ছিল বন্ধুসভা।
ঢাকার মানববন্ধনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক গোলাম আযম বলেন, মাদক বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না, মাদক আসে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে। মাদক সন্তানদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। পরিবারের সবাই যেন মাদককে না বলে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিটি পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
মাদকবিরোধী এই মানববন্ধন আয়োজনের জন্য প্রথম আলো ট্রাস্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে গোলাম আযম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক ভূমিকা পালন করতে হবে সব গণমাধ্যমকে।
কিশোর–তরুণেরা খেলাধুলা, ছবি দেখা কিংবা বই পড়ার অভ্যাসের মধ্যে থাকলে মাদক থেকে দূরে থাকতে পারবে বলে মনে করেন সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পারভীন হাসান।
মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মানববন্ধনে বলেন, অনেক সময় মাদক গ্রহণটাকে ‘ফ্যাশন’ বলে মনে করা হয়; কিন্তু এটা আসলে ‘ফ্যাশন’ নয়। মাদক ব্যক্তিকে তো ধ্বংস করেই, এমনকিও পরিবারসহ আশপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। মাদক আসলে কোনো স্বস্তি বা সমাধান আনতে পারে না। তাই মাদককে না বলতে হবে।
মাদকের পরিণতি হয় ভয়াবহ
মাদক যেকোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর ও হিংস্র বানিয়ে দেয় এবং অপরাধী হতে বাধ্য করে বলে উল্লেখ করেন কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগবিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধুরা সতর্ক হও, সচেতন হও। প্রতিজ্ঞা করো যে নিজের শরীরের ভেতরে আমি এই দুষ্ট ও বিষাক্ত জিনিস ঢোকাব না। নিজের জীবন, বাবা–মায়ের জীবন ও পরিবারকে তছনছ করব না—এটাই হোক আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রতিজ্ঞা।’
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন বলেন, মাদকবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সব সময় আছেন, থাকবেন। কারণ, মাদক শুধু একটা জীবনকে ধ্বংস করে না, তার আশপাশে যারা আছে, তাদের সবাইকে ধ্বংস করে দেয়। মাদক একটা পরিবার, জাতি ধ্বংস করে দেয়।
জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন বলেন, সুস্থ–স্বাভাবিক চোখে পৃথিবীটা যত সুন্দর, মাদকসেবীর চোখে কখনোই অতটা সুন্দর হয় না। মাদকের পরিণতি হয় ভয়াবহ। মাদক জীবন, জাতি, সংসার নষ্ট করে। তাই এ ব্যাপারে সবার সচেতন হওয়া উচিত।
মাদককে রুখে দিতে হবে
লেখক ও উন্নয়নকর্মী নিশাত সুলতানা বলেন, প্রতিটি শিশু পৃথিবীতে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে আসে। প্রতিটি শিশুর বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি স্বকীয় গল্প থাকে। প্রত্যেকের গল্পটি ইতিবাচক গল্প হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু মাদকের কারণে অনেক সময় সেই গল্পগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে, যেন সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো সুন্দর ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মাদকের কারণে কারও স্বপ্ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়। সবাই মিলে মাদককে রুখে দিতে হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহ আল ইমরান বলেন, মাদক গ্রহণ, পরিবহন থেকে শুরু করে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে সাজার ব্যবস্থা করা—এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজের অংশ। কিন্তু শুধু সাজা দিয়ে সবকিছু শেষ করা যায় না। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কাজ করলেই মাদক নিয়ন্ত্রণে সফলতা আসবে, বিষয়টি এমন নয়। মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।
প্রথম আলো ট্রাস্ট থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া স্নাতকের (সম্মান) শিক্ষার্থী ঐশী মঞ্জুর মানববন্ধনে বলেন, নিজের পরিবারের কেউ মাদক গ্রহণ করলে তা নিয়ে আগে কথা বলতে হবে। আগে নিজেদের সচেতন হতে হবে। তারপরই প্রতিকার সম্ভব।
তরুণদের সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত করা
মানববন্ধন সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। তিনি বলেন, মাদকের উৎসমুখ বন্ধ করতে হবে, যাতে বাইরে থেকে দেশে মাদক ঢুকতে না পারে। তরুণসমাজকে বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত করতে পারলে মাদক থেকে দূরে রাখা সম্ভব।
এই মানববন্ধনে গীতিকার কবির বকুল তাঁর লেখা মাদকবিরোধী গান ‘বন্ধু সময় হলো, মাদককে না বলো’ এই মানববন্ধনে গেয়ে শোনান। এই গানে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু।
এ ছাড়া মানববন্ধনে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গান গেয়ে শোনান শিল্পী অনিক। প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানার কণ্ঠে ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানের মধ্য দিয়ে মানববন্ধন শেষ হয়।
‘মাদককে না বলুন’, ‘যে মাদক নিতে বলে সে বন্ধু নয়’, ‘স্মার্ট তরুণেরা কখনো মাদক নেয় না’—মাদকবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান ও লেখা–সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে মানববন্ধনে অংশ নেন অনেক তরুণ-তরুণী।
বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের পাশাপাশি এই মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক রাজিব আহসান, উপপরিচালক শামীম আহম্মেদ, রাজিউর রহমান ও মেহেদী হাসান; সহকারী পরিচালক নজরুল ইসলাম প্রমুখ।