মানবাধিকার সুরক্ষা ও গুম প্রতিরোধে নতুন আইন করতে গিয়ে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে, রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে এমন অভিযোগ উঠেছে। বক্তারা বলছেন, খসড়া আইনে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা কমানো হয়েছে। পাশাপাশি গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়ায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে এবং দায়মুক্তির পুরোনো সংস্কৃতি আবারও ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে।
আজ মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকটির আয়োজক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি।
অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সরকার আরও ভালো আইন করার কথা বলে আগের মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের অধ্যাদেশ বাতিল করেছে; কিন্তু নতুন খসড়ায় কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের অভিযোগের তদন্ত এমন বাহিনীর হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধেই গুমের অভিযোগ থাকতে পারে। মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধানও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখাতে পারে।
আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নতুন সরকারকে তা কাজে প্রমাণ করতে হবে। মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা ও কমিশনার নিয়োগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বন্ধ করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তোলার ওপর জোর দেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো সংস্কৃতি বদলাতে হবে। শুধু দল বা নেতৃত্ব পরিবর্তন করলে হবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। পুলিশ কমিশনসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি।
এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপপ্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, গুম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া ঠিক নয়। কারণ, অভিযোগের সঙ্গে তাদেরই সম্পৃক্ততার প্রশ্ন থাকতে পারে। মিথ্যা অভিযোগের জন্য পাঁচ বছরের শাস্তির বিধানও ভুক্তভোগী পরিবারকে চাপে ফেলবে। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মানবাধিকার কমিশনের সদস্য বাছাইয়ে সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রাধান্য থাকলে কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মনে করেন গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। আইন পাসের আগে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে চাপ তৈরি করাও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ বলেন, মানবাধিকার নিশ্চিত না হলে ন্যায়বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। জুলাইয়ের পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। শুধু আইন করে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জনগণকে সচেতন ও সোচ্চার রাখতে হবে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। তিনি বলেন, নতুন আইনি কাঠামোয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ কমানো হচ্ছে। তদন্তের স্বাধীনতা খর্ব না করে সংবেদনশীল অভিযানের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা করা উচিত।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হুসাইনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য তানিম হোসেন শাওন, সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য শরীফ ভূঁইয়া। বক্তারা মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনে স্বাধীন তদন্ত, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।