মলঙ্গী বাড়ি: এক বিস্মৃত গণহত্যার কথা

গাছের ফাঁকে সুরেন মজুমদার, মিলন মজুমদার আর শশীভূষন মজুমদারের সমাধিছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবে এসেছিল আপনাদের গ্রামে? এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ তারিখ বলতে পারে না। তা না পারলেও অনেকে জানাতে পারেন যে পিরোজপুর শহরে প্রবেশ করার পর দিনই তারা গ্রামে এসেছিল। পিরোজপুর শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রবেশ করেছিল ১৯৭১ সালের ৪ মে। সেই হিসাবে পিরোজপুর সদর থানার, সিকদার-মল্লিক ইউনিয়নের চালিতাখালি গ্রাম আক্রান্ত হয় ৫ মে ১৯৭১, মঙ্গলবার। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় সে দিন আক্রান্ত হয়েছিল চালিতাখালির মলঙ্গীবাড়ি।

নাম মলঙ্গী বাড়ি, কিন্তু ওটা কোনো বাড়ি নয়, ওটা আসলে একটা পাড়া। ওই সময়ে পাড়াটিতে বাস করত আনুমানিক ৩৫০ জন মানুষ। শিক্ষাদীক্ষা আর পেশার কারণে তাঁদের একাংশ বাস করতেন কাছাকাছি নানা অঞ্চলে। বসবাসকারীরা সচ্ছল, সচেতন ও শিক্ষিত হওয়ার কারণে বৃহত্তর বরিশাল-খুলনা অঞ্চলে মলঙ্গীবাড়ির পরিচিতি ছিল। এই পাড়ার অধিকাংশ মানুষের পদবী মজুমদার।

চরের নারকেল–সুপারির ছায়ায় শায়িত নীতিশ মন্ডল, সুরেন মন্ডল ও শচীন দাস
ছবি: সংগৃহীত

এলাকাটির আরেকটা বিশেষত্ব ছিল। জায়গাটার তিনদিক বলেশ্বর নদী দিয়ে ঘেরা। পশ্চিম, উত্তর আর পূর্বদিকে বলেশ্বর নদী এলাকাটিকে অশ্বক্ষুরের আকৃতি দিয়েছে। এর পর আবার পূর্বদিকে বয়ে গিয়ে মিশেছে কালীগঙ্গা নদীর সঙ্গে।

সেনাবাহিনী এসেছিল পশ্চিম দিকের নদীপথে। ওই পথ দিয়ে পিরোজপুর কাছে। ওরা ওই দিক দিয়েই লঞ্চে করে আসে। সৈন্য নামিয়ে তিনটা দিক ওরা ঘিরে ফেলে।

এলাকাবাসীকে প্রশ্ন করি, এখানে ওদের এত দ্রুত আসার কারণ কী? উত্তরে তাঁরা বলেন, পাকবাহিনী খবর পেয়েছিল মেজর জিয়াউদ্দিন মুক্তিযোদ্ধা আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মলঙ্গী বাড়িতে অবস্থান করছেন। আগাম অনুমান করে বা খবর পেয়ে মেজর জিয়াউদ্দিন ভোর রাতেই তাঁর বাহিনী নিয়ে এলাকাটি ছেড়ে চলে যান।

সেনারা পূবদিকে লঞ্চ থেকে নামে। ওই দিকটায় চাষের জমি। তাই বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। তারা এগিয়ে আসে গুলি করতে করতে। বিপদের আঁচ পেয়ে গ্রামের লোকজন পালাতে শুরু করেছিল। স্বপন মজুমদার সে সময়ে পড়তেন সপ্তম শ্রেণিতে। নলবনের ভেতরে বসে দেখা একটি দৃশ্য তাঁর এখনো স্পষ্ট মনে আছে। একজন সৈন্য বন্দুকের মতো দেখতে কিছু একটা থেকে ঘরের চালে কিছু ছুঁড়ে মারছে। চালে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেনায় ভরে যাচ্ছে সব। তখন আরেকজন সৈন্য গুলি করছে সেদিকে। সঙ্গে সঙ্গে দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে আগুন।

পাড়ার মাঝখানের পুকুরটা এখন মজে গেছে। পুকুরের ঘাটে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে খুলনার প্রবীণ আইনজীবী রসিক বিশ্বাসকে। গুলি করার আগে ইংরেজিতে বেশ খানিকক্ষণ কথা হয়েছিল তাঁর, পাকিস্তানি সেনা–কর্মকর্তার সঙ্গে। প্রশ্ন করি, ‘সবাই তো পালাচ্ছিল। কে শুনল যে কথা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে?’ জবাবে গ্রামবাসী বলেন, তাঁর স্ত্রী আর তিনি একসঙ্গেই ছিলেন। স্ত্রীর সামনেই হত্যা করা হয় রসিক বিশ্বাসকে।

নীতা মজুমদারের বাবা সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার পালিয়ে ছিলেন নলবনে। তাঁর কোলে ছিল নীতার তিন বছরের ছোট বোন পরাগ। সে হঠাৎ কেঁদে উঠলে বাবা ধরা পড়ে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নীতা মজুমদার পরাগকে নিয়ে বছর কয়েক ছিলেন বাগেরহাটে, আমাদের পাশে  এক ভাড়া বাসায়। টেলিফোনে সেসব কথা আলোচনা করতে গেলে ফোনের ওপাশে তাঁকে এখনো ফুঁপিয়ে উঠতে শুনি।

বুদ্ধদেব মজুমদারের জন্ম ১৯৬৯ সালে। তিনি তাঁর বাবার কাছে বহুবার শুনেছেন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক ঠাকুরদা নকুলেশ্বর মজুমদারের কথা, মিলন মজুমদারের কথা। তাঁদেরসহ আরও পাঁচজনকে সেদিন পাকিস্তনি সৈন্যরা হত্যা করে। বাগেরহাটের ব্যবসায়ী শচীন দাস, মোংলার ব্যবসায়ী নিতাই মণ্ডল, পাশের এলাকার নীতিশ মণ্ডল আর সুরেন মণ্ডল আশ্রয় নিতে এসেছিলেন এই মলঙ্গী বাড়িতে। তাঁদের নদীর কাছে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। পরে সেখানে চর জেগেছে। চরের মাটি ফুঁড়ে গাছ উঠেছে আকাশের দিকে। পঞ্চান্ন বছরের বড় বড় গাছ।

পারিবারিক জায়গায় নকুলেশ্বর মজুমদারের শেষ শয্যা
ছবি: সংগৃহীত

কী হলো ওই নয়টি মানুষের মরদেহের? বিকাশ মজুমদার তখন চিতলমারীতে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। খবর পেয়ে সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে রাতের বেলা বাড়িতে এসে পৌঁছান। তিনি বলেন, সন্ধ্যা হয়ে এলে কিছু কিছু মানুষ ফিরেও এসেছিলেন এই দগ্ধ পাড়ায়। সেই রাতেই মাটির গভীরে শুইয়ে দেয়া হয় ওই নয়জনকে। গ্রামবাসী বলেন, সমাধি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই। তবে গ্রামের মানুষ শুনে শুনে মনে রেখেছেন, মাটির গভীরে কে কোথায় শুয়ে আছেন। প্রবীণ যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তিনটি জায়গা দেখিয়ে গেছেন। তবে গ্রামে সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মানুষ আর নেই বললে চলে। অনেকে মারা গেছেন, অনেকে অন্য শহরে বা দেশে চলে গেছেন। সেদিনের ঘটনার গভীরে পৌঁছাতে তাই আরও সময় আর অভিনিবেশ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে হলো।

অঁদ্রে মালরো ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। অসংখ্য বধ্যভূমির কথা মনে রেখে তিনি বলেছিলেন, আপনারা এসব স্থানে স্মৃতিফলক স্থাপন করুন, আর লিখে রাখুন এই বাক্য, ‘যে তুমি এ পথ দিয়ে যাবে, পরবর্তীকালে আমাদের স্বজনদের গিয়ে বোলো: ওরা সেখানে মৃত্যুর শিকার হয়ে পড়ে আছে। কেননা নয় মাসের সেই দুর্দশার দিনে ওরা খালি হাতে লড়াই করার প্রতিজ্ঞা করেছিল।’

মলঙ্গী বাড়ির সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে, সাহস দিয়ে অঁদ্রে মালরোর ভাষায় ‘খালি হাতে লড়াই’ করেছিল। কিন্তু অঁদ্রে মালরোর উপদেশ মনে রেখে বাংলাদেশের আরও অসংখ্য বধ্যভূমির মতো এখানেও কোনো স্মৃতিফলক আমরা লিখতে পারিনি।

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসতে আসতে ভাবি, দেশের জন্য মূল্য দেওয়ার এই কথা শুধুই মুখে মুখে আর কতদিন অনুপুঙ্খ টিকে থাকবে?