রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননা পেলেন চার নারী
অদম্য সংগ্রাম ও সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ‘রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননা’ পেলেন চার নারী। নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখা এই কীর্তিময়ী নারীরা হলেন নুর নাহার, কাওসার সোহেলী, মোছা. সুরাইয়া ফারহানা রেশমা ও ঋতুপর্ণা চাকমা।
আজ শনিবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ‘রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননা ২০২৫’ অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের ব্র্যান্ড ‘রাঁধুনী’ এই সম্মাননার আয়োজন করে। সমাজকল্যাণ, সাংবাদিকতা, ব্যবসায় উদ্যোগ ও ক্রীড়া—এই চার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য দেওয়া এই সম্মাননা অনুষ্ঠানটি এবার ২০ বছরে পদার্পণ করল।
যৌনকর্মীদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য ‘বঞ্চিতা’ নামের সংগঠন প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে কীর্তিমতী হিতৈষী সম্মাননা পান নুর নাহার। তাঁর হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক এবং চেক তুলে দেন স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. পারভেজ সাইফুল ইসলাম। পুরস্কার হাতে নুর নাহার বলেন, ‘যৌনকর্মীরা সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। তাঁদের সন্তানদের অবস্থা আরও করুণ। তারা সামাজিক মর্যাদা ও সব রকমের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাদের সুবিধা নিশ্চিত করতে আমি আজীবন কাজ করে যেতে চাই।’
অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরার স্বীকৃতি হিসেবে কীর্তিমতী সাংবাদিক সম্মাননা পান মাছরাঙা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি কাওসার সোহেলী। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। কাওসার সোহেলী তাঁর এই অর্জনের কৃতিত্ব পরিবারকে দিয়ে বলেন, ‘মায়ের চোখে দেখা স্বপ্নে আজ এখানে দাঁড়িয়েছি। সৎ থেকে পথ চলার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম বাবার কাছ থেকে। আর গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের অপার সুযোগ পেয়েছি আমার স্বামীর সহযোগিতায়।’
বহুমাত্রিক কৃষি ও খামার উদ্যোগের মাধ্যমে দেশজুড়ে অসংখ্য নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় কীর্তিমতী উদ্যোক্তা সম্মাননা পান মোছা. সুরাইয়া ফারহানা রেশমা। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। রেশমা বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারীদের কখনো বাবা, কখনো স্বামীর পরিচয়ে বেঁচে থাকতে হয়; কিন্তু যাঁদের এ দুটির কোনোটিই নেই, তাদের বেঁচে থাকা ও পরিচয় দেওয়া কষ্টকর হয়ে থাকে। আমি এই বাধা মোকাবিলা করে নিজের পরিচয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম।’
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে টানা দুবার জয়ী দলের সদস্য এবং টুর্নামেন্ট–সেরা খেলোয়াড় হিসেবে কীর্তিমতী ক্রীড়াবিদ সম্মাননা লাভ করেন ঋতুপর্ণা চাকমা। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারায় তাঁর পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন তাঁর ভগ্নিপতি সুদীপ চাকমা। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন বিসিবির নারী বিভাগের প্রধান রুবাবা দৌলা। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের নারীরা কীর্তিমতীদের দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলেও এমন অনেক সদস্য আছেন, যাঁরা অদম্য। বাধা পেরিয়ে তাঁরা নিজেদের প্রমাণ করে যাচ্ছেন। রুবাবা দৌলা এই নারী ফুটবলারদের ‘প্রকৃত যোদ্ধা’ বলে আখ্যায়িত করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের সিইও মো. পারভেজ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে “গিভ টু গেইন” থিমটি আমাদের কাছে একটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের প্রতিফলন। একজন নারী এগিয়ে গেলে তার সঙ্গে এগিয়ে যায় পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও পুরো দেশ। রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননার মাধ্যমে আমরা সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশ হতে চাই।’
মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক বলেন, ‘আমরা এখন যে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এ সময়ে স্বীকৃতি এবং উৎসব দুটিরই প্রয়োজন আছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক সময় আমরা কথা না বলে চুপ হয়ে যাই; কিন্তু যারা চুপ না থেকে কিছু করতে চায়, তারাই প্রকৃত যোদ্ধা।’
এবারের সম্মাননার নির্বাচক প্যানেলে ছিলেন এখন টিভির সম্পাদকীয় প্রধান তুষার আবদুল্লাহ, ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘গুটিপা’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসলিমা মিজি, সাংবাদিক মোস্তফা মামুন এবং প্রযুক্তিসেবা প্রতিষ্ঠান ডিক্যাস্টালিয়ার পরিচালক সাবিলা ইনুন। অনুষ্ঠানে তুষার আবদুল্লাহ বলেন, প্রতিযোগী হিসেবে সাংবাদিক কাওসার সোহেলী তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ নম্বর তুলে নিয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন অ্যাডকম লিমিটেডের চেয়ারপারসন গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী, বিপণন বিভাগের প্রধান ইমতিয়াজ ফিরোজসহ স্কয়ার গ্রুপের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও দেশের বরেণ্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে বালুচিত্রের (স্যান্ড আর্ট) মাধ্যমে কীর্তিমতী নারীদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প উপস্থাপন করেন বালুচিত্রশিল্পী জীবন রায়।