২৫ বছরের বেশি সময় ধরে রোদ–বৃষ্টি-ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এমনকি করোনাকালে মহামারির ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁরা রোজ সকালে প্রথম আলো পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। আজ শনিবার সেই সংবাদপত্র এজেন্টদের নিয়ে রজতজয়ন্তীর উৎসব উদ্যাপন করল প্রথম আলো।
সকালে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে প্রথম আলোর আয়োজনে সারা দেশের সংবাদপত্র এজেন্টদের আনন্দঘন সম্মেলনে জানানো হলো অতীতের মতোই প্রথম আলো তার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নীতি–আদর্শ অনুসরণ করে সাংবাদিকতা করে যাবে। এজেন্টরা বললেন, তাঁরা হকারসহ সবাই মিলে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়াতে আরও জোরালো সমন্বিত চেষ্টা চালাবেন।
আলোচনা, মতবিনিময়, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, র্যাফল ড্র আর গানে গানে উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল এই আয়োজন।
সকালে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। তার আগেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংবাদপত্রের এজেন্টরা একে একে অনুষ্ঠানে আসতে থাকেন। তাঁদের জন্য প্রাতরাশের ব্যবস্থা ছিল। শীতের সকালে চায়ের পাত্র চুমুক দিতে দিতে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছিলেন। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এসে তাঁদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন। হাসিমুখে ছবি তুলেছেন আগ্রহী অনেকের সঙ্গে।
মঞ্চের অনুষ্ঠানে এজেন্টদের স্বাগত জানান সার্কুলেশন সেলস বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন রওনক। এরপর ছিল রজতজয়ন্তী উপলক্ষে নির্মিত প্রথম আলোর গত ২৫ বছরের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘সাহসের মহাসড়ক’–এর প্রদর্শনী।
প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, প্রথম আলোর যাত্রা শুরুর সময় থেকেই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় সাংবাদিকেরা যেমন ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি পাঠকের হাতে পত্রিকাটি তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন এজেন্টরা।
এরপর ছিল প্রথম আলোর রজতজয়ন্তীর কার্যক্রম নিয়ে তৈরি করা একটি প্রামাণ্যচিত্রের প্রদর্শনী।
এরপর মঞ্চে আসেন প্রথম আলো সম্পাদক। তিনি জানান, গত ২৫ বছরে অনেক এজেন্ট চিরতরে চলে গেছেন। তাঁরা ছিলেন প্রথম আলোর সুহৃদ। আলোচনার শুরুতেই তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তিনি অনুরোধ করেন এজেন্টদের মধ্যে থেকে আগ্রহীদের কিছু বলতে।
এই পর্যায়ে ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আবদুল মান্নান, সংবাদপত্র হকার্স কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মো. সাহাবুদ্দিন, চট্টগ্রামের হকার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, এজেন্টদের মধ্যে রাঙামাটির বাসনা দাস, গুরুদাসপুর নাটোরের আলী আক্কাস, সিলেটের সিকান্দার আলী, পঞ্চগড়ের আমিনুর রহমান, হবিগঞ্জের মহিদুল হক, খুলনার আবু তৈয়ব, বগুড়ার হামিদুর রহমান, রাজশাহীর শ্রাবন্তি আনোয়ার, ভোলার মোখলেসুর রহমানসহ অনেকই তাঁদের সমস্যা ও চাহিদার কথা বলেছেন। তাঁরা এজেন্ট ও হকারদের জন্য চিকিৎসা ও দুর্ঘটনার সুরক্ষা, প্রবীণ বয়সের আর্থিক প্রণোদনার জন্য তহবিল গঠন, পত্রিকার কমিশন বাড়ানো, হকার–সংকট—এ বিষয়গুলো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাঁরা বলেন, ২৫ বছর ধরেই প্রথম আলো পাঠকের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। প্রথম আলোকে তাঁরা আরও ব্যাপক পরিসরে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে জোরালো ভূমিকা রাখবেন।
অনুষ্ঠানে সম্পাদক মতিউর রহমানকে বাংলাদেশ সংবাদপত্র এজেন্ট কল্যাণ অ্যাসোসিয়েশন ক্রেস্ট, বাংলাদেশ সংবাদপত্র এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক ও বাংলাদেশ সংবাদপত্র সরবরাহ সংস্থার পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
মতিউর রহমান তাঁর বক্তব্যে এজেন্টদের রজতজয়ন্তীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, এজেন্ট ও হকারদের যেন আয় বৃদ্ধি পায়, সে জন্য প্রথম আলো অতীতে সব সময় চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতেও করবে। তবে এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আয় বৃদ্ধির জন্য বিকল্প উৎস ও প্রক্রিয়া খুঁজতে হবে। ছাপা কাগজের পাশাপাশি কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তার মতো সাময়িকীর গ্রাহক বাড়ানো, বই বিক্রির উদ্যোগ নিলে তাঁদের আয়ও বাড়বে। তিনি বলেন, ম্যাগাজিনের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব প্রথম আলোর এখতিয়ারে থাকায় এই বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে কল্যাণ তহবিল ও অন্যান্য বিষয় তিনি সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদকদের সংগঠনে তুলে ধরবেন। তিনি বলেন, বিগত ২৫ বছরে প্রথম আলো ও এজেন্ট—এই দুই পক্ষের বোঝাপড়া সুদৃঢ় ও সম্প্রীতিময় হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে তা আরও মজবুত হবে।
এরপর ছিল প্রথম আলোর যুব কর্মসূচির সমন্বয়ক মুনির হাসানের পরিচালনায় র্যাফল ড্র। রজতজয়ন্তী উপলক্ষে ২৫টি আকর্ষণীয় পুরস্কার ছিল বিজয়ীদের জন্য। আনন্দকে আরও পূর্ণতা দিতে শুরু হয় গানের পর্ব। পর্দায় দেখানো হয় রজতজয়ন্তীর স্লোগান নিয়ে ‘হারবে না বাংলাদেশ’ গানটি। পরে মঞ্চে এসে গান শোনান তরুণ প্রজন্মের শিল্পী সুমি শবনম ও পুলক অধিকারী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী কর্মসূচি ব্যবস্থাপক গোলাম রব্বানী। প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হকের ধন্যবাদ জানানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই আয়োজন।