জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি মাসে ১৬ থেকে ১৭টি আমদানি ঋণপত্র খুলতে হয়। ঋণপত্রগুলো সাধারণত সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ইস্টার্ণ ব্যাংকে খোলা হয়ে থাকে। অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র খুলতে প্রায়ই অপারগতা প্রকাশ করছে। বিপিসি এটি একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। এ ছাড়া ঋণপত্র খুললেও তেল সরবরাহকারীর মূল্য পরিশোধে দেরি হচ্ছে। একাধিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে করে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও ক্রমে বাড়ছে।

বিপিসি সূত্র বলছে, গত এপ্রিলের শুরু থেকেই ঋণপত্র খোলা ও তেলের দাম পরিশোধ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হলে কিছু ডলার ছাড় করা হয়। এরপর আবার ব্যাংকগুলো অস্বীকৃতি জানাতে থাকলে গত ১৭ মে ও ২৩ জুন দুই দফায় জ্বালানি বিভাগে চিঠি পাঠায় বিপিসি।

দেশে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত করতে পারে বিপিসি। ঋণপত্র খোলা না গেলে নতুন করে জ্বালানি তেলের ক্রয়াদেশ দেওয়া যাবে না। এতে করে তেল আমদানি কমে যাবে। আর তাহলে সামনে সরবরাহ–সংকট তৈরি হতে পারে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৩৪ শতাংশ জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর করে। আর পরিবহন খাতের ৯০ শতাংশের বেশি নির্ভর করে জ্বালানি তেলের ওপর।

জ্বালানির উচ্চ মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার–সংকট। আমদানি কমলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, পরিবহন খাতও চাপে পড়বে। বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে হলে তেলের দাম পরিশোধে ডলার দিতেই হবে।
ম. তামিম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখার জন্য তারা এটি করছে। দেরি করার মানে হলো জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

আমদানি খরচ বেড়েছে ১১১ শতাংশ

ব্যাংক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি খরচ অনেক বেশি বেড়ে গেছে। অন্যদিকে রপ্তানি আয় বাড়লেও কমেছে প্রবাসী আয়। এতেই দেখা দিয়েছে মার্কিন ডলারের সংকট। ফলে ডলারের দাম বেড়ে হয়েছে ৯৩ টাকা ৯৫ পয়সা। ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ব্যাংকগুলোও ঋণপত্র খোলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এতেই জ্বালানিসহ বিভিন্ন অতি গুরুত্বপূর্ণ আমদানি নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

default-image

জ্বালানি খাতে শুধু তেল নয়; তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি) আমদানি করে সরকার। আর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি করে বেসরকারি খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০–২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ের চেয়ে ২০২১–২২ অর্থবছরের একই সময়ে পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১১১ শতাংশ। জ্বালানি পণ্যের জন্য আগে ৩৯৬ কোটি ডলারের ঋণপত্র খোলা হলেও তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮৩৭ কোটি ডলারে। একই সময়ে আগে পরিশোধ করা হয়েছে ৩৭৬ কোটি ডলার আর সর্বশেষ পাঁচ মাসে পরিশোধ করা হয়েছে ৭৭৭ কোটি ডলার। দুই মাস ধরে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ছে বিশ্ববাজারে। প্রতি মাসে ৭৩ থেকে ৭৫ কোটি ডলারের ঋণপত্র খোলা দরকার বলে জানিয়েছে বিপিসি।

চাপে পড়েছে রিজার্ভ

বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এখন ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে (এসিইউ) আমদানির অর্থ পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় প্রতিদিনই জ্বালানি, খাদ্য, কীটনাশকসহ সরকারি বিভিন্ন আমদানির জন্য ডলার বিক্রি করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো ডলার না দিয়ে আংশিক দিচ্ছে; ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহে তাড়না থাকা প্রয়োজন। আমদানি দায় শোধ করতে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ে ব্যাংকগুলোর নজর দেওয়া প্রয়োজন। তাদের সহায়তা করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা হচ্ছে। বুধবারও ৭ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে।

ডলার–সংকটে ব্যাংক

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি পণ্য, কীটনাশক ও খাদ্য আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করে থাকে। তবে ১০ কোটি ডলারের চাহিদা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিক্রি করে ৫ কোটি ডলার। বাকি ডলার অন্য ব্যাংক থেকে কিনতে হয়, যাতে দামও বেশি পড়ে। বেশি দামে ডলার কিনে কম দামে বিপিসিকে সরবরাহ করতে হবে ব্যাংকের। এ কারণে অনেক ব্যাংক এখন ঋণপত্র খুলতে চাইছে না।

ঋণপত্র না খোলার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুল মওলা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক সব ব্যবসায় মুনাফা করবে, এমন নয়। বিপিসির ঋণপত্র খুলতে অপারগতা প্রকাশ করেনি তাঁর ব্যাংক। ডলার–সংকটের কারণে কোনো কোনো ব্যাংক সেটা করতে পারে।

তবে প্রতি মাসে ৯০ কোটি ডলারের ঘাটতিতে পড়েছে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি, রপ্তানি বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়ে শীর্ষ তালিকায় থাকা অগ্রণী ব্যাংক। এ নিয়ে ব্যাংকটি সব শাখা ব্যবস্থাপকদের চিঠি দিয়েছে তারা। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ডলার খরচ ১৭০ শতাংশ বেড়েছে। বিদেশি মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো না গেলে বৈদেশিক বাণিজ্যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। সামনে বিদেশি মুদ্রার সংকট আরও বাড়বে। এ জন্য শাখা ব্যবস্থাপকদের নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও বিদেশে ডলার পাঠানোর অঙ্গীকার না করার পরামর্শ দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডলারের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, বুঝতে পারছি না। আমরা সাধ্যমতো সরকারি আমদানির ঋণপত্র খোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ আর জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুছ ছালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বিপিসি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক। তাদের দু–একটি আমদানি বিল পরিশোধে এক দিন বিলম্ব হয়েছে। কারণ, ডলার–সংকট ছিল। এখন তাদের ঋণপত্র খুলতে অপারগতা প্রকাশ করা হচ্ছে না।

সতর্ক করেছে তেল সরবরাহকারীরা

বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। সৌদি আরবের সৌদি অ্যারাবিয়ান অয়েল কোম্পানি (সৌদি আরামকো) ও আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (অ্যাডনক) থেকে এ তেল কেনা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় পরিশোধিত জ্বালানি তেল। বছরে ৪০ লাখ টন শুধু ডিজেল আমদানি করে বিপিসি। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েল, পেট্রলসহ আরও কিছু তেল আমদানি করতে হয়। এসব তেল সরবরাহ করে কুয়েতের কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (কেপিসি), মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড (পিটিএলসিএল), আরব আমিরাতের এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (ইনক), চীনের পেট্রোচায়না (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড ও ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি), থাইল্যান্ডের পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং পিটিই লিমিটেড, ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল)। এর বাইরে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেও জ্বালানি তেল কেনে বিপিসি।

তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বিপিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় কিস্তিতে টাকা পরিশোধের বিষয়টিও মেনে নিয়েছে সরবরাহকারীরা। এটিও করা যাচ্ছে না বলে তারা সতর্ক করে বলেছে, এমন হলে আর তেল সরবরাহ করা যাবে না। অথচ দফায় দফায় সরকারকে অবহিত করেও কোনো সমাধান মিলছে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম প্রথম আলোকে বলেন, বিপিসির কাছে টাকা থাকলেও লাভ হচ্ছে না। জ্বালানির উচ্চ মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার–সংকট। এখনই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সব চালানো যাচ্ছে না। আমদানি কমলে সামনে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, পরিবহন খাতও চাপে পড়বে। বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে হলে তেলের দাম পরিশোধে ডলার দিতেই হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন