সাক্ষাৎকার: রকিবুল হাসান

ভুক্তভোগী আমি, সেই পাকিস্তান দলে আমিসহ দুজন ওপেনার, আমি বাদ!

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে এবারের অতিথি রকিবুল হাসান। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের ক্রিকেটার হওয়ার গল্প, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের ক্রিকেটসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।

আনিসুল হক:

 প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা এসেছি একজন ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের কাছে। আমি বলব, আমাদের এ অঞ্চলের—এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ারও আগে—যিনি প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, তিনি রকিবুল হাসান। রকিবুল হাসান ভাই, আপনাকে আমাদের এই বিশেষ ভিডিও সাক্ষাৎকারে স্বাগত জানাই।

 রকিবুল হাসান: ধন্যবাদ আপনাকে।

আনিসুল হক:

 আমরা একটু আগেই বলছিলাম, আপনি আমাদের ক্রিকেটের প্রথম আন্তর্জাতিক তারকা। সেই গল্পে আমরা অবশ্যই পরে ফিরব। তবে তার আগে জানতে চাই, ১৯৬৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অল পাকিস্তান টেস্ট দলে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন আপনি। এত অল্প বয়সে এমন অর্জন তো সত্যিই বিস্ময়কর! সেই অভিজ্ঞতার গল্পটা যদি আমাদের শোনাতেন।

 রকিবুল হাসান: অ্যাবসলিউটলি। কারণ, ওই সময়টা ছিল সত্যিই ব্যতিক্রমী। আমার মনে হয়, অনেকেই বিষয়টি জানেন না। আমি যখন প্রথম ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলি—পাকিস্তানে যেটি ‘কায়েদে আজম ট্রফি’ নামে পরিচিত—তখন আমি সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুলে ক্লাস টেনে পড়ি।

আনিসুল হক:

 সেন্ট গ্রেগরীতে।

রকিবুল হাসান:  হ্যাঁ, সেন্ট গ্রেগরীতেই। ওই সময় আমি ইস্ট পাকিস্তান টিমে চান্স পাই। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান। এই আজকের বাংলাদেশ। ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে সুযোগ পেলেও আমি নিজেই শিওর ছিলাম না যে দলে থাকতে পারব। কারণ, ওপেনারের জায়গার জন্য আমরা চারজন ট্রায়াল দিচ্ছিলাম। শামিম ভাই ছিলেন, জুয়েল ছিল, বকুল ভাই ছিলেন—আর চতুর্থ ওপেনার হিসেবে ছিলাম আমি। এখানে একটা মজার ঘটনা আছে। তখন মরহুম রইস ভাই, যিনি ইস্ট পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের (ইপিএসএফ) সেক্রেটারি ছিলেন, আমাকে খবর পাঠালেন, ‘তুই প্র্যাকটিসে আয়, থাকবি।’ মাঝখানে কী হয়েছে, আমি জানি না। কীভাবে বা কোন বিবেচনায় সেই সুযোগটা এল, সেটা আজও আমি জানি না। আর ছাত্র হিসেবেও আমি ভালো ছিলাম। সেন্ট গ্রেগরীতে পড়াশোনার চাপ ছিল অনেক। প্রতি সপ্তাহেই নিয়মিত…

আনিসুল হক:

 আপনাদের ইংরেজি হাতের লেখাও ছিল অসাধারণ সুন্দর। শুনেছি, এ বিষয়ে আপনাদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।…ওই লেখাটা আমি দেখেছি কারণ শহীদ আজাদ, শহীদ জুয়েল এদের হাতের লেখা আমি দেখেছি।

 রকিবুল হাসান: আমাদের ‘পেনম্যানশিপ’ নামে একটি আলাদা বিষয় ছিল। সেখানে বিশেষভাবে সুন্দর হাতের লেখা শেখানো হতো।

আনিসুল হক:

  রাইট রাইট। এসব গল্পে আমরা পরে আসছি। যেহেতু আমরা এই অভিজ্ঞতার আলোকে অনুষ্ঠানে সব শৈশব থেকে শুরু করি। যেহেতু আমরা বলছি যে ১৯৬৯ সালে ১৬ বছর বয়সে আপনি প্রথম অল পাকিস্তান টিমে চান্স পেলেন; তার মানে আপনার জন্ম ১৯৫৩ সালে। ঠিক কি না?

 রকিবুল হাসান: এক্সাক্টলি।

আনিসুল হক:

 এবং সেটা হলো ফরাশগঞ্জে।

রকিবুল হাসান: ফরাশগঞ্জ। শ্যামবাজার বলত আরকি।

আনিসুল হক:

  শ্যামবাজারে। আপনার আব্বার নামটা একটু জানতে পারি?

 রকিবুল হাসান: সালেহ উদ্দিন আহমেদ।

আনিসুল হক:

  সালেহ উদ্দিন আহমেদ তো পুলিশ সুপার ছিলেন।

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ, পুলিশ সুপার ছিলেন। তাঁর বদলি চাকরি ছিল। কিন্তু তিনি কোনো দিনই তার ফ্যামিলিকে ডিস্টার্ব করেন নাই।

আনিসুল হক:

  আপনারা ঢাকাতেই থাকতেন?

 রকিবুল হাসান: আমাদের চার ভাইয়ের লেখাপড়ার স্বার্থে বাবা অনেক স্যাক্রিফাইস করেছিলেন। চাকরিতে বদলি হলেও তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, আমরা যেন সবাই সেন্ট গ্রেগরী স্কুলেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।

আনিসুল হক:

 চার ভাই।

 রকিবুল হাসান: আমরা ছিলাম চার ভাই। বড় ভাই রবিউল হাসান, ডাকনাম কচি। এরপর রফিকুল হাসান, যিনি নিজেও ক্রিকেটার ছিলেন। তারপর রওফুল হাসান। তিনি আবু জাব্বার স্পোর্টসের কর্ণধার ছিলেন, পাশাপাশি বিবিসির লোকাল করেসপনডেন্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় রয়েছে।

আনিসুল হক:

  আপনার একদম শৈশবের প্রথম স্কুল কোনটা?

 রকিবুল হাসান: আমার প্রথম স্কুল সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল।

আনিসুল হক:

 তারপরে আপনি এই যে ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে পড়লেন এই সুযোগ–সুবিধা ওই সময় সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে ছিল।

 রকিবুল হাসান: আপনাকে একটা কথা বলি, আর দর্শকদেরও বলি। সেন্ট গ্রেগরী স্কুল ছিল একেবারেই অন্য রকম একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে পাদরিরা পড়াতেন। তাঁদের একটি দর্শন ছিল—‘দে মেক আ ম্যান আউট অব আ বয়’ অর্থাৎ, একটি শিশুকে শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁরা আমাদের এমনভাবে গড়ে তুলতেন, যাতে আমরা অলরাউন্ড হিসেবে বিকশিত হই।

আনিসুল হক:

 হ্যাঁ।

 রকিবুল হাসান: শুধু পড়া না। বাস্কেটবল, এমনকি আজ বাংলাদেশে যে রাগবি খেলা হয়, সেসব ওই স্কুল থেকে আসছে। পরে সেন্ট যোসেফ এল। নারিন্দাতে ছিল। আলটিমেটলি এখন তো সেন্ট যোসেফ তো মোহাম্মদপুরে। ওখানে চলে গেছে। সেন্ট গ্রেগরীতে অ্যাথলেটিকস, টেবিল টেনিসসহ বিভিন্ন ইনডোর ও আউটডোর খেলাধুলার সুযোগ ছিল। ফলে আমরা ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের খেলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।

আনিসুল হক:

 লেখাপড়ায় ভালো আবার এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ এবং খেলাধুলা। তো আমি যে একটা মা নামে একটা বই লিখেছি আপনারা জানেন যেখানে শহীদ আজাদের কথা আছে, যিনি সেন্ট গ্রেগরীতে পড়তেন। এই শহীদ আজাদ আমাদের আজাদ ভাই। আজাদ ভাইয়ের বন্ধু ছিল কাজী কামাল, শহীদ রুমি। এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আগরতলা থেকে ট্রেনিং নিয়ে ঢাকায় এসে গেরিলা অপারেশন করছিল। তো আজাদের বাবার যেহেতু বন্দুক ছিল, সে বন্দুক চালাতে পারত। ওকে বলেছিল আমাদের সাথে চলো। তো আজাদের বাসায় সব মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিলেও আজাদ দুইটা অপারেশনে অংশগ্রহণ করে বলে আমরা জানি। তো ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্টে অনেকগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনারা হামলা চালাল। আজাদের বাড়িতে গোলাগুলি হলো তখন এই আপনার সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের কাজী কামালও ওখানে ছিলেন। তো অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে গেল। রুমিকে ধরে নিয়ে গেল।

 রকিবুল হাসান: বদি ভাই ছিলেন।

আনিসুল হক:

 বদি ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আজাদের মা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গেলে আজাদ তাঁকে বলেন, ‘মা, ভাত খাইনি। ভাত আনো।’ মা ভাত নিয়ে ফিরে এলেও দেখেন, আজাদ আর সেখানে নেই। সেই যে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর কোনো দিনই তিনি ফিরে আসেননি। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, আজাদের মা ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, কিন্তু ছেলের সেই শেষ কথার স্মৃতিতে আর কোনো দিন ভাত খাননি। এই ঘটনাটি আমার মা বইয়েও উঠে এসেছে। সেখানেই কাজী কামালের প্রসঙ্গ আসে। কাজী কামাল সেদিন গোলাগুলির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তিনি সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের ছাত্র এবং বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন। অন্যদিকে শহীদ জুয়েলকে আজাদের বাসা থেকেই পাকবাহিনী ধরে নিয়ে যায়।

 রকিবুল হাসান: শহীদ জুয়েল কিন্তু সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে পড়েনি।

আনিসুল হক:

আপনাদের স্কুলে না?

 রকিবুল হাসান: না। বাট শহীদ জুয়েল কিন্তু তাদের সঙ্গে চলাফেরা করত।

আনিসুল হক:

 আপনি বলছিলেন যে আপনি যখন ইস্ট পাকিস্তান টিমে চান্স পাচ্ছেন ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে তখন আপনার সঙ্গে আরেকজন একই জায়গায় একই পোস্টের জন্য লড়াই করছেন বা খেলছেন তিনি হচ্ছেন জুয়েল।

 রকিবুল হাসান: জুয়েল ছিলেন।

আনিসুল হক:

  যে আজাদের বাড়িতে ধরা পড়ল এবং ওই সময় তাঁর হাতের আঙুলে গুলি লেগেছিল।

রকিবুল হাসান: আমি জানি না, আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন, বাট আমরা তো তখন মোটামুটিভাবে নেমে গেছি স্বাধীনতাযুদ্ধে।

আনিসুল হক:

 নারায়ণগঞ্জে মনে হয় একটা সিদ্ধিরগঞ্জে পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দিতে গিয়েছিল।

রকিবুল হাসান: ওইখানে রাজাকাররা ওদের সামনে পড়ে যায়। ওই গোলাগুলিতে তখন গুলিটা লাগে। হাতে লাগে।

আনিসুল হক:

 ওই ব্যান্ডেজ নিয়েই ধরা পড়ে।

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ, ধরা পড়ে।

আনিসুল হক:

 এটা খুবই মর্মস্পর্শী কথা।

 রকিবুল হাসান: আর তাঁদের বাসাটা ছিল দিলু রোডে, তাই না? আপনার লেখাতেও তো সেটির উল্লেখ আছে।

আনিসুল হক:

  হ্যাঁ, তাঁদের বাসা ছিল দিলু রোডে। তার আগে অবশ্য তাঁরা ফরাশগঞ্জে থাকতেন, আপনাদের বাড়ির পাশেই। পরে সেখান থেকে দিলু রোডে চলে আসেন। আচ্ছা, আপনার কি শহীদ আজাদ ভাইয়ের কথা মনে আছে? তাঁকে তো আপনি কাছ থেকে দেখেছেন?

 রকিবুল হাসান: একদম। আমাদের বড় ভাই আমাদের বাসায় যেহেতু আড্ডা হইত। রওফুল, আজাদ ক্লাসমেট। প্রায়ই আসত। ওখানে আমার মা রান্নাটান্না করত, খাওয়া হইত। আবার আমার ভাইয়েরাও আজাদ ভাইয়ের বাসায় যাইত ফরাশগঞ্জে।

আনিসুল হক:

  কাজী কামাল বীর বিক্রম, যিনি বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন, অনেক লম্বা। কিছুদিন আগেও তো বেঁচে ছিলেন আসতেন আমার কাছে খুব। কাজী কামাল ভাই কি মারা গেছেন?

 রকিবুল হাসান: মারা গেছেন। … তিনি দুবার ধরা পড়েছিলেন আপনি নিশ্চয়ই জানেন। একবার তো মিরাকেলি বেঁচে গেলেন। তিনি আবার আর্মি টিমের ছিলেন। এটা আবার ’৭৫–এ… যখন নাকি বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলল, তারপরেই। তিনি পালিয়ে গেলেন নদীর ওপারে। ওখান থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে মজার ঘটনা।  কাজী ভাই তখন আর্মি বাস্কেটবল দলের কোচ ছিলেন। তাঁকে যখন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেখানে আর্মি বাস্কেটবল দলের একজন জওয়ান, যিনি কাজী ভাইয়ের কাছেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, তাঁকে চিনে ফেলেন। তিনি অবাক হয়ে বলেন, ‘আরে স্যার, আপনাকে এভাবে ধরে নিয়ে এসেছে!’ ওই জওয়ান তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আমরা আছি।’ শেষ পর্যন্ত সেই জওয়ানই কাজী ভাইকে সেখান থেকে বের করে আনতে সাহায্য করেছিলেন।

আনিসুল হক:

  আপনার জুয়েলের স্মৃতি আছে মনে কিছু?

 রকিবুল হাসান: অনেক স্মৃতি। জুয়েল ছিল এমন একজন ব্যক্তিত্ব একদম বাঙালি চেতনা যদি কিছু বলি আমরা। ও পাকিস্তানি নামই শুনতে পারত না। আমার থেকে সিনিয়র ছিল খেলোয়াড়।

আনিসুল হক:

  তিনি নাকি খুব ভালো মারকুটে ব্যাটসম্যান ছিলেন।

 রকিবুল হাসান: জুয়েল ছিলেন অত্যন্ত মারকুটে, আক্রমণাত্মক একজন ব্যাটসম্যান। তাঁকে নিয়ে একটা মজার কথা বলি। ওই সময়কার খেলোয়াড়দের মানসিকতা আর দলীয় চেতনা কেমন ছিল, সেটা এই ঘটনাতেই বোঝা যায়। এখনকার সবার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, তখন স্পিরিট অব দ্য গেম আর সতীর্থের প্রতি ভালোবাসার বিষয়টি ছিল সত্যিই অসাধারণ। তখন আমি মাত্র দশম শ্রেণিতে পড়ি। জীবনে কোনো দিন বিমানে উঠিনি। হঠাৎ করেই করাচি যাওয়ার সুযোগ এল। সেটাও এক আলাদা গল্প। আসলে আমার তো যাওয়ারই কথা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কীভাবে দলে জায়গা হলো? পরে জানতে পারি, আমাদের চারজন ওপেনারের একজন বকুল ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এরপর একদিন রওফুল এসে খবর দিল। তখন সে স্পোর্টসে রিপোর্টিং করত। আর আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত।

 রওফুল আমার রুমে এসে বলল, ‘কংগ্র্যাচুলেশনস! ইউ আর গোয়িং টু করাচি।’ তখন আমাদের বাসায় ইংরেজিতে কথা বলার একটা পরিবেশ ছিল। আব্বা-আম্মা আমাদের ইংরেজিতে কথা বলতে উৎসাহ দিতেন। তাই আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হাউ ইজ ইট পসিবল? আমি কীভাবে যাব?’

 রওফুল বলল, ‘বকুল ভাইয়ের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তুমি তো আগে তৃতীয় বা চতুর্থ ওপেনার ছিলে। এখন তুমিই করাচি যাচ্ছ।’

 কিন্তু তখন আমার মাথায় অন্য চিন্তা। পড়াশোনার ব্যাপারে বাবা কখনোই কোনো আপস করতেন না। সামনে দেড় মাস পরই ম্যাট্রিক পরীক্ষা। আমি বললাম, ‘এখন কী হবে? আমি কীভাবে যাব?’

 রওফুল বলল, ‘ওটা আমরা দেখছি, তুমি তোমার রুমেই থাকো।’

 এরপর তারা ওপরে চলে গেল। তখনকার দিনের ডুপ্লেক্স ধরনের বাড়ি ছিল আমাদের। আমি মাঝের তলায় আমার ঘরে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমাকে ডাকা হলো। বলা হলো, ‘আব্বা ডাকছেন, ওপরে যাও।’

 আমি তখন ভেবেই রেখেছিলাম, জীবনের এত বড় সুযোগ পেলেও হয়তো যেতে পারব না। আসলে এখন আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই আমি একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছি। কারণ, আমার আব্বা ছিলেন একজন ক্রিকেট–অন্তঃপ্রাণ লোক।

 রাতে আমরা যখন ঘুমাতে যেতাম, পাশের ঘর থেকে রেডিওর শব্দ ভেসে আসত। আমি মাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘মা, তোমরা রেডিও চালিয়ে ঘুমাও নাকি? বন্ধ করে ঘুমাও না কেন?’ মা হেসে বলতেন, ‘না বাবা, ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলা হচ্ছে। পাকিস্তান দলও খেলছে। ওখানে তো সময়ের পার্থক্য প্রায় ১২ ঘণ্টা। তোমার আব্বা সারা রাত জেগে কমেন্ট্রি শোনেন।’

 আব্বা ছিলেন ক্রিকেটের একনিষ্ঠ ভক্ত। ঢাকায় খেলা হলেই তিনি বন্ধুদের নিয়ে মাঠে যেতেন। ফরাশগঞ্জের বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. সুফিয়ানও তাঁদের সঙ্গী ছিলেন।

 যা–ই হোক, আমাকে যখন আব্বার কাছে ডাকা হলো, তখন মনে মনে ভাবছিলাম—হয়তো পড়াশোনার কথা বলে তিনি আমাকে যেতে দেবেন না। কিন্তু আব্বা উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। সেই মুহূর্তটা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। তিনি বললেন, ‘আই এম সো প্রাউড অব ইউ আব্বু।’

 আমি কিছুক্ষণ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এরপর তিনি শুধু একটি প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার পড়াশোনার প্রস্তুতি কেমন?’ আমি বললাম, ‘আব্বু, প্রস্তুতি ভালো। এখন শুধু রিভিশন করছি।’

 তারপর তিনি আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। সেই সময় আমাদের সংসারের অবস্থা খুব সচ্ছল ছিল না। তখন দশ আনাতেও বাজার করা যেত। ফরাশগঞ্জে আমাদের আট ভাই–বোনের দুই বেলার খাবারের জন্য আব্বা তিন টাকা দিতেন।

আনিসুল হক:

  আপনার আরও চারটা বোন ছিল।

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ আরও। বিয়ে হয়ে গেছিল তখন এক বোন। তখন ৩০০ রুপি দিয়েছিলেন আব্বা। ৩০০ রুপি আমার হাতে।

আনিসুল হক:

 করাচি নিয়ে যাওয়ার জন্য।

 রকিবুল হাসান:  (বাবা বললেন) তুমি যাও বাবা তুমি এটা তোমাকে দিলাম তুমি ভালো খেলবে। ইনশা আল্লাহ। আর তুমি তোমার ব্যাটট্যাট— তখন তো ব্যাট ভাড়া করে নিয়ে খেলতাম। এমনও গেছে আমার একদিন আমার কোনো প্যান্ট ছিল না, একটা প্যান্ট। আমি পায়জামা পরেও প্র্যাকটিস করেছি।

আনিসুল হক:

 এই অভিজ্ঞতাটা আমাদের প্রজন্মেরও কিছুটা আছে, যদিও আপনার সময়ের চেয়ে বেশ পরে। ছোটবেলায় আমারও একটিমাত্র প্যান্ট ছিল। সেটি ধোয়ার জন্য দিলে লুঙ্গি পরে থাকতে হতো। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও অবাক করার মতো। আপনার বাবা তো এসপি ছিলেন।

রকিবুল হাসান: এসপি।

আনিসুল হক:

মানে তখনকার বিচারে এখনকার বিচারেও।

 রকিবুল হাসান: তিনি তখন ডিএসপি থেকে এসপি হয়ে যাবেন।

আনিসুল হক:

  তাই না? আপনার বাবা তো পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার ছিলেন। সে হিসেবে আপনাদের পরিবারকে সচ্ছলই বলা যায়। কিন্তু তখনকার সমাজব্যবস্থাই ছিল অন্য রকম। বাহুল্য বা অযথা আড়ম্বরের চল ছিল না। মানুষের জীবনযাপন ছিল অনেক বেশি সংযত ও সাদামাটা। ঠিক কি না?

 রকিবুল হাসান: একদম ঠিক।

আনিসুল হক:

  আচ্ছা এখন আমরা প্রথম আপনি যে টেস্ট টিমে চান্স পাওয়ার খবরটা শোনেন…

রকিবুল হাসান: …যখন আমি টিমে চান্স পেলাম, করাচিতে মাঠে আমরা করাচি সদর হোটেলে থাকি ওখানে। ওইখানে খাওয়াদাওয়ার জন্য আমাদের ২৩ টাকা দেওয়া হতো। এখনো মনে আছে, ১০ টাকা রাতের খাবার, ১০ টাকা দুপুরের খাবার আর ৫ টাকা নাশতা এগুলো। তো মাঠে খেলা থাকলে তো লাঞ্চটান্স …। যখন ওখানে আমরা গেলাম, তখন লতিফ ভাই ছিলেন ক্যাপ্টেন। তখন ইস্ট পাকিস্তান টিমটা কিন্তু অনেক স্ট্রং টিম ছিল। অনেক স্ট্রং টিম। তখন ওখানে আনোয়ার ফজি হীরা ভাই ছিলেন ওই টিমের উইকেটকিপার। শামিম ভাই তো ছিলেনই। তখন আমি দেখলাম যে আমি তো ১২তম ম্যান হবই। সবচেয়ে বেবি অব দ্য সাইড। আমি সবাইকে নেট বোলিং করলাম। … টস হয়ে গেল আধা ঘণ্টা আগে। টসে আমরা জিতলাম। লতিফ ভাই ক্যাপ্টেন ছিলেন। হি ডিসাইডেড ফার্স্ট আমরা ব্যাটিং করব। আমরা ফিরে এলাম ড্রেসিংরুমে। তখন কিন্তু আগেকার দিনে মানে এখনকার মতো আগে টিম অ্যানাউন্স করে দিত না। একটা নিয়ম ছিল যে টিমটা ড্রেসিংরুমে একটা কাগজে লেখা হতো। লেখা হওয়ার পরে ওই সিলেকশনটা সেই পড়ে দেবে। ক্যাপ্টেন পড়ত না। যার কাছে দিত ধরেই নেওয়া হতো হি ইজ দ্য টুয়েলভম্যান। আমি তো রেডি। কাগজটা আমার কাছেই আসবে। আমি কি বোঝাতে পারছি আপনাকে? উনি দেখলাম যে কাগজটা আমার কাছে এল না। কাগজটা জুয়েলের কাছে গেল। আমরা তিনটা ওপেনার। জুয়েল ওপেনার। আমার সিনিয়র। আমি বেবি অব দ্য সাইড। আমার কাছে আসেনি। জুয়েলের কাছে গেছে।

আনিসুল হক:

  তার মানে জুয়েল ১২তম ম্যান হলেন।

রকিবুল হাসান: বোঝাই গেল। আমারও বুঝতে দেরি হলো না। জুয়েল পড়ে দিল নামগুলো। শামিম কবির, রকিবুল হাসান সব পড়া শেষ। দেখেন স্পিরিটটা কাকে বলে। জুয়েল ওটা পড়ার শেষ করে আমাকে বলল রকিবুল তুই ব্যাট নে। তুই তো নক করিস না। তুই তো নক করাইছিস। ইউ হ্যাভ টু গো অ্যান্ড ওপেন নাউ। তোমাকে তো ব্যাটিং ওপেন করতে হবে। আর ২৫ মিনিট টাইম আছে। একটু নক করে নে। আমি বল করতেছি। আমি কিন্তু জুয়েলকে সরিয়ে দিলাম। আমার জন্য জুয়েল টিমের বাইরে। … এটা হলো জুয়েলের, দিস ইজ জুয়েল। এ রকম মনমানসিকতা আমাদের সবার ছিল। তারপরে আমার দুঃখ লাগে, আমি ওই লাশটা পাই নাই। …মুশতাকের লাশ পেয়েছিলাম, শহীদ মুশতাক। তো এখানে আবার অনেকে একটা ভুল করে। এই তথ্যগুলো আমি আজকের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্ট্রেট বলতে চাই। মুশতাক ওয়াজ নেভার আ ক্রিকেটার। মুশতাক ওয়াজ অ্যান অর্গানাইজার।

আনিসুল হক:

 জি।

 রকিবুল হাসান: উনি পঞ্চাশের দশকে আপনি বোধ হয় জানেন, আনিস ভাই, উনি ৫০–এর দশকে মুয়াজ্জিন হিসেবে চলে আসছেন।

আনিসুল হক:

  হ্যাঁ, হ্যাঁ, উর্দু স্পিকিং হ্যাঁ।

 রকিবুল হাসান: পয়লা টাইপের উর্দু স্পিকিং। বাংলা বলতে পারত সব। সেই মুশতাক, এই আজাদ বয়েজ ক্লাবের ফাউন্ডার।

আনিসুল হক:

 জি।

 রকিবুল হাসান: সেটারও একটা কাহিনি আছে। মুশতাক ইজ অ্যা ম্যাসাজম্যান। বা সাজম্যান। পাকিস্তান টিম যতবার খেলতে আসছে, মুশতাক ওটার একটা টিম তৈরি করছিল। ম্যাসাজম্যানের টিম। সে তাদেরকে নিয়ে তখন শাহবাগ হোটেলে টিম থাকত। পরবর্তী সময়ে পূর্বাণীতে ইন্টারকন্টিনেন্টাল তখন হলো। মুশতাক ওই টিমগুলোকে দিত প্লেয়ারদের ম্যাসাজ করার জন্য বা খেলার সময় ড্রেসিংরুমে থাকত। …  প্রত্যেকে পায়জামা–পাঞ্জাবি গায়ে। তো এই মুশতাক তখন আজাদ বয়েজ ক্লাবের। এটা একটা বিশাল স্যাক্রিফাইস, মানুষের কত হতে পারে। মানে মানুষের যদি প্যাশন থাকে, তখন মাদানী সাহেব হলো ডিআইটি। আজকে যেটা রাজউক বলি। ডিআইটির চেয়ারম্যান ছিলেন মাদানী সাহেব। মাদানী সাহেব তো সিএসপি ছিলেন ওই সময়টায়। …তো উনি কাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে দেখ আমার তো গায়ে ব্যথা হয়। অফিসে বসে কেউ আছে যে আমাকে একটু গায়ে টিপতে পারবে। তারা খুঁজতে খুঁজতে এই মুশতাককে পেল। …এই মুশতাককে অ্যাপয়েন্ট করা হলো, তুমি ফাঁকে ফাঁকে যাবা ওনার বাসায়।

আনিসুল হক:

  মাদানী সাহেবের।

 রকিবুল হাসান: মাদানী সাহেবের। মুশতাক ম্যানিপুলেটেড মাদানী সাহেব। তো বলে, তুমি কী কী করো? মুশতাক কাহিনি আবার বলছে আমাদের। বলল আমারে একটা জিনিস আপনি দেবেন। আমার টাকাটোকা নেই, কিছু দরকার নেই। আমারে একটা জায়গা দেবেন। বলে কী করবি তুই জায়গা দিয়ে। তখন হলো ঢাকা প্ল্যান হচ্ছে। …ওই যে সলিমাবাদ রেস্টুরেন্টটা, আপনি দেখবেন…ওই রাস্তাটা ওখানে ঘুরিয়ে দিছিল হলো মুশতাক, যাতে ওই রেস্টুরেন্টটা বেঁচে যায়। এ জন্য মুশতাক কোনো টাকাও নেয়নি। সবাই জানত যে মুশতাকের সঙ্গে তো ভালো খাতির আছে মাদানী সাহেবের। আর মুশতাক চাইছিলেন আমাকে একটা জায়গা দেবে। আমি একটা ক্রিকেট ক্লাব বানাব।

আনিসুল হক:

  আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব হলো?

রকিবুল হাসান: আজাদ বয়েজ ক্লাব।

আনিসুল হক:

  আজাদ বয়েজ ক্লাব।

 রকিবুল হাসান: যেটা ওই কামানটা ছিল উনিশ সালে মোড়ে। ওই কামানটার ঠিক উত্তর দিকে। ওইখানে ওই ক্লাবটার কোনায় ছিল। অনেক দিন ছিল। পরে শিফট হয়েছে। তো ওই মুশতাক পরে ওই সলিমাবাদ যে রেস্টুরেন্টটা ছিল, ওরা বলছে তুমি কী চাও? আমি কি আমারে না, আমার ক্লাব বানাইতেছি। তখন ক্লাব হইছে। কোনো প্যাভিলিয়ন নাই। স্কুল বয়েজ। আজাদ বয়েজ ক্লাব ওয়াজ অলওয়েজ ফর্মড উইথ স্কুল টিম, স্কুল বয়েজ। তার মধ্যে সিনিয়র কয়েকজন ছিলেন, শাহিন ভাই ছিলেন। আসাদ ভাই একজন ছিলেন। … তখন ওই মুশতাক আজাদ বয়েজ ক্লাবের এই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল। এবং আস্তে আস্তে সব।

আনিসুল হক:

 তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, ২৫ মার্চ রাতে শহীদ হন। আচ্ছা, এখন আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি ওটা যে ১৯৬৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন আপনি পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটে ১২তম হন; কিন্তু ডাক তো পেলেন। আপনি তো মেম্বার। তখন আপনার অনুভূতিটা কী হলো?

 রকিবুল হাসান: … আগে আমার কষ্টটা বলি।

আনিসুল হক:

  বলেন।

রকিবুল হাসান: আজকে আমরা যে স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছি কিসের জন্য? যেহেতু আমাদেরকে আমাদের বিমাতাসুলভ ব্যবহার করা হতো। আমাদের রাইটস দেওয়া হয়নি। না ইকোনমিক সেক্টরে, না খেলাধুলা, না চাকরি ক্ষেত্রে; কোনো জায়গায় না। তার একটা জ্বলন্ত সাফারার আমি। টিম যখন অ্যানাউন্স করল ওখানে, পাকিস্তান টিম তখন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে খেলছে। করাচি টেস্ট নিউজিল্যান্ড জিতে গেছে। লাহোর টেস্টের পরে রাওয়ালপিন্ডিতে একটা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হবে। ঢাকা থেকে মেসেজ এল। রাইস ভাই বলল তখন।

আনিসুল হক:

 কী ভাই?

 রকিবুল হাসান: রাইসুদ্দিন ভাই। তিনি বললেন তোর টিকিট কালেক্ট করে ফেলতেছি আমরা। ইউ হ্যাভ টু ফ্লাই টু পিন্ডি। ইউ আর প্লেয়িং ইন আ পিন্ডি ম্যাচ। এটা হলো সাইড ম্যাচ। আমি বললাম ঠিক আছে। আর তারপরে পাকিস্তান টিম অ্যানাউন্স করবে টিমটা। ঢাকার টেস্ট ম্যাচ। লাহোরের সেকেন্ড টেস্ট হচ্ছে। আমি যখন ফ্লাই করতেছি, … মানে আমার একটা এক্সাইটমেন্ট। একটা আমি বাচ্চা ছেলে। … তো ম্যানিফেস্টোটা তো পাইলটের কাছে থাকে। ওই ক্যাপ্টেনের কাছে থাকে। ওরা দেখে কারা কারা আছে। …আমাকে ডেকে নিল ককপিটে। আড়াই ঘণ্টার ফ্লাইট।

আনিসুল হক:

  হ্যাঁ।

 রকিবুল হাসান: আমাকে বলল তুমি কমেন্ট্রি শুনবা? তখন লাহোর টেস্টটা চলছে। … রেডিওতে কমেন্ট্রি শোনাচ্ছে আমাদের। শুনতে শুনতে গিয়ে নামলাম করাচিতে। ওখান থেকে লাহোরে গেলাম। পিন্ডির ম্যাচের পরেই কারদার, আব্দুল হাফিজ কারদার; উনি তখন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্টও ছিলেন। হি ওয়াজ চিফ সিলেক্টরও ছিলেন ওই সময়টায়। টিম অ্যানাউন্স হয়ে গেল। পাকিস্তান লস্ট করাচি টেস্ট। লাহোর টেস্ট পাকিস্তান স্ট্রাগলিং। ওপেনার নাই। আমি কিন্তু ওপেনার। তো দে আর লুকিং ফর অ্যান ওপেনার। কাকে দিয়ে ওপেন করানো যায়। খেলা কিন্তু ঢাকায়। ঢাকায় টেস্ট ম্যাচ হবে থার্ড টেস্ট ম্যাচ। কার সঙ্গে? নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। … যে কথাটা বলতেছিলাম, টিম অ্যানাউন্স হয়ে গেল। ১২ জন অ্যানাউন্স করে দিল। আমি জানি ওপেনার আমি। আফতাব গুল আর আমি। আর কেউ নেই। তো আমরা দুজন তো ওপেন করবই। আমারে কনগ্রাচুলেটও করল আফতাব গুল। সবাই যারা কি কনগ্রাচুলেশন ইউ আর ডেফিনেটলি প্লেয়িং বিকজ ইউ ডোন্ট হ্যাভ অ্যান ওপেনার। পিন্ডিতে খেলার ওই ম্যাচে রেজাল্ট হয়নি। জাস্ট আ ম্যাচ। আমরা ওইখান থেকে পিন্ডি টু লাহোর একই ফ্লাইটে লাহোর টু ঢাকা। দেখেন, আমি কিন্তু প্রস্তুতি নিচ্ছি যে আমি খেলাটা খেলব। আমার স্বপ্ন আমার এই সুযোগ, এই একটা সুযোগ আসছে। ১১–এর মধ্যে আমি। ১২ নম্বর পর্যন্ত আরেকজন কে আছে? … ওই ম্যাচে … ঢাকায় যখন এলাম, টিম অ্যানাউন্স করল। আমি তো নামটা শোনার জন্য অপেক্ষায় আছি। আমার নাম আর আসছে না। ১২ নম্বরে আমাকে বসানো হলো। বিইং দ্যাট নেই, সেকেন্ড ওপেনার আই ওয়াজ টেকেন আউট। সামবডি এলস ডিড ওপেন।

আনিসুল হক:

 সেটা আমি সব সময়ই বলি যে পাকিস্তান টিমে…

 রকিবুল হাসান: কষ্ট লাগছিল ওই সময়।

আনিসুল হক:

 বাংলাদেশের একজন খেলোয়াড়ও ছিল না। একজন খেলোয়াড় ছিলেন দ্বাদশ খেলোয়াড়। সেই পাকিস্তানকে এখন বাংলাদেশ সেদিনও টেস্ট ম্যাচে হারাল।

 রকিবুল হাসান: এ জন্যই তো আমরা স্বাধীন হয়েছি।

আনিসুল হক:

  ১৯৭১ সালে কমনওয়েলথ টিমের সঙ্গে আপনি যখন পাকিস্তান টিমের হয়ে নামেন।…ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা হচ্ছে। পয়লা মার্চ খেলা হবে। আপনি তখন একটা জয় বাংলা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে নামলেন। তাই তো?

 রকিবুল হাসান: ইয়েস। ওই সময়টা তো আপনি জানেন। হয়তো আপনি খুব ছোট ছিলেন।

আনিসুল হক:

আমি অনেক ছোট ছিলাম।

 রকিবুল হাসান: … তো তখন নির্বাচন হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ একচ্ছত্রভাবে জয় করে ফেলছে। তখন তো ওয়ানম্যান ওয়ান ভোট ছিল। ওইটুকু বুঝতাম তখন। তো এখন সরকারে তো যাবে আওয়ামী লীগ। ইয়াহিয়া–ভুট্টো টালবাহানা করতেছিল। তখন আমাদের ছাত্ররা… তোফায়েল ভাই (তোফায়েল আহমেদ) মারা গেছেন। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক। রব ভাই, শাজাহান সিরাজ। তারপরে রাজ্জাক ভাই। এরাই তো সবাই ছাত্রনেতা মিলে ছিল। তখন তাঁরাই পুরো আন্দোলনটাকে লিড দিতেছিলেন। তখন যারা নাকি আমাদের বাপ চাচারা আছেন এবং আমরাও দেখেছি, পুরো এই চেতনাটা মুক্তিযুদ্ধ যে তখন টালবাহানাটাকে অনেকে তারা বুঝতে পারছিল যে বাংলা, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে বা বাঙালিদেরকে ক্ষমতায় যেতে না দেওয়ার একটা পাঁয়তারা চলতেছিল এ রকম একটি। অনেক রকম তখন বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন, যেটা আমরা জানিও না কিছু। কিন্তু আমরা তো তখন তো ওই সময়টা আন্দোলনও চলছে অনেক। তখন তিনকোনা স্টিকার বের হয়েছিল। তিনকোনা স্টিকার। এগুলো আমরাও লাগাতাম। … গাড়ির গাড়ির উইন্ডশিল্ডে লাগায় দিতাম।

আনিসুল হক:

 আচ্ছা ওই স্টিকারটা আপনি ব্যাটে লাগালেন।

 রকিবুল হাসান: ওটাই লাগালাম ব্যাটের মধ্যে। …আমি ভাবি নাই যে আমার কী হইতে পারে। এবং আমি তখন ওই ছোট ছোট প্রোসেশন, স্কুলে থেকে ও যাইতাম। এবং ওই ভেতরে ওই চেতনা আমার ভেতরে কাজ করত। আর আমি তো আদারওয়াইজ আ সাফারার।

আনিসুল হক:

 জি।

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ। এই ২৬ ফেব্রুয়ারি খেলাটা শুরু হয়েছিল। এই খেলাটা ঢাকার স্টেডিয়ামে।

আনিসুল হক:

 ২৬ ফেব্রুয়ারি খেলাটা শুরু হলো।

রকিবুল হাসান: তার আগের দিন।

আনিসুল হক:

  আপনি নেমেছিলেন এবং এক রান করেছেন না শূন্য রান করেছেন?

 রকিবুল হাসান: এক রান। এক রান। তখন খেলার দিকে তেমন মন নেই।

আনিসুল হক:

 রাইট।

 রাকিবুল হাসান: তখন যেটা হইছে না আউট ইজ অ্যান আউট। ইট ওয়াজ আ গুড বল বাট ইট টাচ মাই ব্যাট। বাট এখন এটা বললে কেউ বলবে যে কি বলতেছ। বাট আলটিমেটলি আমি এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরে আসছি। আগের দিন কিন্তু আমাদের কিটব্যাগ দেওয়া হয়। সবাইকে ব্যাট ট্যাট দিয়ে দেওয়া হয়। আমি দেখি কি, তখন আমার কিটব্যাগের মধ্যে আমার ব্যাটটা তো গ্রেনিক্যালস না। সবার গ্রেনিক্যালস ব্যাট। আর গ্রেনিক্যালস ব্যাটের স্টিকারটা হলো সোর্ড। একটা লাল সোর্ড। এটা হলো ওদের স্টিকার। এখানে আছে কি না জানি না আমার ঘরে। তখন আমি যখন এই একটা সুযোগ। তখন আমার মাথায় এল ওই অলিম্পিক যেটা হয়েছিল যে ব্ল্যাক পাওয়ার। হাতে কালো ইয়ে নিয়ে অলিম্পিক গোল্ড মেডালিস্ট …। আমি বললাম, একটা কিছু এটা করতে হবে আমার। এই আমার মাথায় ঢুকল। আমি ডাক্তার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন … ছাত্রনেতা ছিল, আমরা আবার ক্লাসমেট ছিলাম সেন্ট গ্রেগরিতে। ওরে বললাম যে স্টিকার আন। আমি পূর্বাণী হোটেলে থাকি। ৭০০ কত নম্বর আমার রুম। তখন তো আমার রুমে সবাই আসতেছে। …তখন আমি বললাম আমার একটা স্টিকার চাই। আমি বলিনি কাউকে কী করব। ব্যাট আমাকে যেটা দেওয়া হয়েছিল, ওটা গ্রেনিক্যালস ছিল না। ওটা ছিল গান অ্যান্ড মুর। গান অ্যান্ড মুরের ব্যাটের স্টিকারটা হলো হরাইজন্টাল। নট লাইক দ্য ভার্টিক্যাল না। তো আমি ওই জায়গায় স্টিকারটা…

আনিসুল হক:

  আমার মনে হয় লালের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্রটা ছিল হলুদ।

 রকিবুল হাসান: মানচিত্রটা ছিল। তো আর ওখানে রিভার্সে সবুজের ওপরে জয় বাংলা লেখা। আমি ওই স্টিকার এনে বললাম যে এটা আমি লাগাব। আমি একটা ধামাকা তৈরি করব এখানে। আর মাথার মধ্যেও খেলতেছে। ওই অলিম্পিকের ওইটা…। … এত বিশাল বড় ইম্প্যাক্ট ফেলে দেবে এবং আমাকে যে এত বড় মূল্য দিতে হবে। আমি বেঁচে আছি আজকে আপনাদের দোয়ায় বা আমাদের মুরুব্বিদের দোয়ায়। আমাকে দেখামাত্র গুলি করার মতো ওয়ারেন্ট ছিল। কবে? ২৫ মার্চের পরে। এটাও আমি জানছি কার থেকে? আমি জেনেছি টারজান ইউনুস নামে পাকিস্তান টিমের একটা ফুটবলার ছিল। ও আর্মিতে ছিল। ও ক্যাপ্টেন ইউনুস। আর্মির ক্যাপ্টেন ছিল। ও তার ব্যাটালিয়ন নিয়ে মুভ করতেছে। দিপু ভাই নামের একজন ফুটবলার ছিলেন আমাদের। মারা গেছেন। শান্তিনগরে থাকতেন। তাঁরা ফুটবল খেলতেন। আর ওই সময়টা কিন্তু আমাদের ফুটবল খেলা, যখন মোহামেডান, ভিক্টোরিয়া, ওয়ারী— এরা খেলছে। পাকিস্তান টিমের মাকরানি প্লেয়াররা এসে খেলছে। আমরা সবাই খেলা দেখতে যেতাম। ঢাকা স্টেডিয়ামটাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল সিজন ওয়াইজ। তখন আমরাও খেলা দেখতে যেতাম, ক্রিকেটাররা বসে খেলা দেখত। আবার আমাদের ক্রিকেট খেলা হচ্ছে, হয়তো ফুটবলাররা আসত। তো ক্যাপ্টেন ইউনুস আমাকে চিনত। ওর সঙ্গে কথা হতো। ধপধবে। ওকে টারজান কেন বলা হতো? একদম টকটকে রং ছিল গায়ের। বেলুচ ছিল। হি ওয়াজ আ পাঠান। ও কী করেছে, যেহেতু চিনত, ওর কাছে ইনফরমেশন ছিল। বললাম তো আল্লাহ ওকে ফেরেশতা করে পাঠায় দিছিল। ও দিপুর ফোন নম্বর, তখন তো ল্যান্ডফোন সব। অল ল্যান্ডফোন। মোবাইল নেই। দিপুকে উর্দুতে বলছিল, রাকিব কো বলো ও ঢাকা ছোড় দে (ওকে বলে দাও ও ঢাকা থেকে যেন পালিয়ে যায়)। যদি ঢাকায় থাকে। যেমনে পারে। ওকে মেরে ফেলবে। আমি মারব না। আমার ব্যাটালিয়ন মারবে না। ও ব্যাটালিয়ন তখন ঢাকায় আসছে। ট্রান্সফার হইছে। এই ইয়ে তখন আমাকে দেখেন যদি আল্লাহ বাঁচায়। … তখন কারফিউটা উইথড্রো করল। ২৫ তারিখের রাতে ক্র্যাকডাউন। ২৬, ২৭ তারিখে কারফিউ। দুই ঘণ্টার জন্য উইথড্রো করল। বাই দ্যাট টাইম আমার বাসায় খবর এল পুরো ঢাকায়… আমি আমার মা–বাবা মারা গেছেন, আমি কান্না করি নাই। কিন্তু আমি মুশতাক মারা যাওয়ার পরে আমি ওই কান্না রাখতে পারি নাই। হি ওয়াজ মাই গডফাদার …ক্রিকেটের। মানে এ রকমভাবে সে আমাদেরকে হাতে তৈরি করেছে। অসুখ হইছে, জ্বর হইছে। কোত্থেকে খবর পাইছে, খাবার নিয়ে, ফল নিয়ে বাসায় চলে যাইত। ওকে মেরে ফেলছে।

আনিসুল হক:

  আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন ’৭১ সালে, ওইটা বলেন।

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

  ২৭ মার্চে কারফিউ হলো।

রকিবুল হাসান: তখন আমি যখন শুনলাম যে কোথায় মারা গেছে? ওই ক্র্যাকডাউনের সময় জুয়েল মুশতাক আজাদ বয়েজ ক্লাবটা ওই কামানের উল্টো দিকে। ওখান ও তো একা থাকত। ও হেঁটে হেঁটে ডিডিএসএ ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনে ওখানেও আরেকজন কেয়ারটেকার ছিল। ওরা দুজনে থাকত। শুনলাম যে ওখানেই তাকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। এই খবরটা এল। তখন আমি ওর লাশটা দেখলাম। এভাবে পড়ে ছিল। দুই দিন হয়ে গেছে।

 রক্ত কালো হয়ে গেছে। এখানে বুলেট ওকে স্ট্যাফিং করছে ব্যানেট দিয়ে কি না। আমি তো আমার মধ্যে নেই। ওটা দেখে আমি ওখান থেকে বের হয়ে আসাদ পার্ক যেটা আমরা বলি, ওখান থেকে আমি হাঁটতে হাঁটতে আসতেছি। যখন আমি আস্তে আস্তে কামান পর্যন্ত আসলাম, ওখান থেকে উল্টো দিক দিয়ে পার হয়ে এবং আমি তো পুরান ঢাকায় থাকি। বাসে উঠে আসছি, গুলিস্তানে নামছি, ওখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে এখানে আসছি। তো দলের মধ্যে আমি কালো কালো দাগ দেখতেছি। কিসের দাগ বুঝতে পারতেছি না। কিউরিসিটি হলো যে এটা কিসের দাগ? … আনিসুল, আপনি বিশ্বাস করবেন না, আজকাল আমার অনেক বিয়েবাড়িতে আমরা বিয়ে খেতে গেলে কাচ্চি বিরিয়ানি দেয়, কিন্তু অনেক মোরগ পোলাও দেয়। অনেক মোরগ পোলাওয়ের ডিশ অফার করে। ঠিক মোরগ পোলাও যখন দেয়, ওই ডিশের মধ্যে থেকে মোরগের পা বের হয়ে থাকে, কারও মোরগের মাথাটা বের হয়ে থাকে। আই হ্যাভ সিন দ্যাট সিনারিও। প্রত্যেকটা মানুষের হাত বেরিয়ে আছে, কারও পা বেরিয়ে আছে, কারণ মাটিচাপা দিয়েছে। লাইন দিয়ে কবর। এই যে মারছে বাঙালিকে। ওই ২৫ রাতের ক্র্যাকডাউন। ওইটা দেখার পর তো আমি আমার মধ্যে নাই। তখনো তো আমি মানে আই ওয়াজ নট ইউজড টু দিস সর্ট অব থিং। ওই সময় আমি হাঁটতে হাঁটতে যখন গুলিস্তানের কাছে আসছি, একজন আমারে চিল্লায় চিল্লায় বলতেছে, ‘এই রকিবুল, এই রকিবুল।’ কে ডাকে আমারে? এই দিপু, আমার দিপু ভাই। দিপু ভাই বলে, ‘তুমি এখানে কী করতেছ? তুমি এক্ষুনি বাসায় যাও। বাসায় যাও, ঢাকা ছাড়ো।’ আমি কি বাসায় যাব, ঢাকা ছাড়ব? কী হইছে? কেন? আর আমি তারে বলতেছি, ‘দিপু ভাই, ইয়ে নাই, মুশতাক নাই। দাফনের ব্যবস্থা করেন।’ আর আমার প্ল্যান ছিল, ওখান থেকে আমি আজকে যেটা নাকি হসপিটাল আমাদের, যে শাহবাগে। ওইটা হচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ওই পূবালী ব্যাংকের মাহবুব ভাই আজাদ বয়েজ ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। উনি ম্যানেজার। উনাকে খবরটা দিয়ে যাব। আমাকে আর যেতে দেয় নাই দিপু ভাই। উনি বলল, ‘তুমি এক্ষুনি চলে যাবা বাসায়। আর ইউ উইল লিভ ঢাকা। তুমি ঢাকা থাকবা না।’ আমি বলি, ‘আপনি এটা কোত্থেকে শুনলেন? কেন এটা আমাকে মারবে কেন?’ ‘তুমি কি করছ জানো না ২৬ তারিখ? হ্যাঁ? ফেব্রুয়ারির? ওইটা নোট করছি আর্মি ইন্টেলিজেন্স। তোমার বিরুদ্ধে শুটেড সাইড।’ এটা আমি বললাম, ‘আপনি জানলেন কোত্থেকে?’ দিপু ভাই, এই এই মানে আমি জিজ্ঞেস করতেছি, আবার শঙ্কায় বুঝি যে কি সত্য না মিথ্যা কি? মানে আমি অন্য রকম। বলল, ‘টারজান ইউনুস আছে না?’ আর ইউনুসকে আমি চিনি। ও আমারে বলছে, ‘রকিবুলকে খবর দাও।’ এই আমি মনে করলাম যে বাসায় গিয়ে তো মারে খবর দিলাম। এ অবস্থা আমার মা বলল, ‘আমি আজকেই চলে যাব’। আমরা একটু রেডি হয়ে ৪ তারিখে, একদিন পরে নদী পার হইলাম। যেদিন পার হইলাম, ওই দিন ওখানে গোলাগুলি বোম্বিং করতেছে, ওখানে নদীর ওপারে আর্মিরা। এভাবে তো দেশের বাড়ি চলে গেলাম। তখন তো আমার কাজিন ছিলেন ক্যাপ্টেন নুরুজ্জামান। উনার আন্ডারে আমাদের আমবাগানে ট্রেনিং প্রোগ্রাম চলতেছিল। ওখান থেকে তো মুক্তিযুদ্ধে ঢুকে গেলাম আস্তে আস্তে। তারপরে তো আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল তখন অলরেডি ফর্ম। খেলে বেড়াচ্ছে ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। তখন আমার কাছে নোট এল শেখ শহীদুল ইসলাম বলল, উনি আমার গ্রামের ছেলে। আমার ওখানে। তো উনি বলল , ‘আমি চলে যাচ্ছি। যে নোটটা তুই আমার পাবি, কারণ আমার কাছে মেসেজ আসছে রকিবুলকে পাঠাও। স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট দল ফর্ম করতে হবে। কারণ, যুদ্ধ কত দিন চলবে আমরা কেউ জানি না। নোবডি নোজ। কত বছর কি। বাট আমাদের ফুটবল টিম যে রকম একটা অ্যাওয়ারনেস ক্রিয়েট করেছে, চেতনা তৈরি করেছে, সল ওভারি ফান্ড রেজ করেছে, আমাদের স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট দল। ওর নেতৃত্বে আমরা এটা করেছি।’

 আমি চলে গেলাম, শহীদ ভাই চলে গেলেন। আমি ওখানেই আছি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ইনস্ট্রাকশনটা ছিল,…যে তোমরা কনফ্রন্টেশনে যাবা না। ভাটিয়াপাড়ার নাম শুনেছেন বোধ হয় আপনারা। … ১৬ তারিখেও সারেন্ডার করে নাই। ওটা আমার বাসা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ছিল।

আনিসুল হক:

পরে কি স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট টিম হয়েছিল?

 রকিবুল হাসান: হয়েছিল। কিন্তু আমাদের আর খেলা লাগে নাই। তখন আমি গেলাম। যাওয়ার পরে আমি ওই ফুটবল টিমের সঙ্গেই থাকলাম। ওখানে আমরা রেডি পাঁচ ছয়জন প্লেয়ার পেয়ে গেলাম। সালাউদ্দিন ফুটবলার, ও ক্রিকেটার ছিল। মোবাশ্বের মারা গেছে বেচারা। ও ক্রিকেটার ছিল। আব্বু আমার ওপেনিং ব্যাটসম্যান ছিল। জাস্টিস বি এস সিদ্দিকীর ছেলে, ও ছিল। আমাদের তো প্রতীকী খেলব। আমরা খেলা হারব–জিতব বড় কথা না। আর আমি তখন বাইসাইকেল থেকে গেছি ওখান থেকে। এই প্লেয়ারগুলো জোগাড় করলাম আস্তে আস্তে। কিছু প্লেয়ার শর্টেজ ছিল যে এক্সট্রা প্লেয়ার নেব। তখন আমরা এই থিয়েটার রোডে তখন কামাল, ও কামাল ওখানে। কামালকে বলা হলো, ‘কামাল তুমি কি খেলো?’ কামাল আমারে খবর দিছে। আমি চলে আসব।

 তখন আরও বলল, ‘আমাদের গাইড আছে। লিস্ট কর। পাঠা। আমরা গাইডের মাধ্যমে পাঠাব। কারে কারে আনতে হবে আস্তে আস্তে ওরা নিয়ে আসবে।’ এরপরে তো ১৬ ডিসেম্বর চলে এল। ওই ডিসেম্বরে আর ওখানে আমি যে কয় মাস ছিলাম, চার মাস। ওখানেও একটা বহুত একটা একটা কষ্টের দিন গেছে আমার। ভেতরে আমাদের মধ্যে ওই জিদটা কাজ করেছে। যে একটা দিন আমি কষ্ট পেয়েছি। আমার জীবনে আমরা যতগুলো ঈদ পালন করেছিলাম, আমার বাপ সব সময় এই সময় আসতেন, ভাইয়েরা এবং প্রথম কোলাকুলিটা করতাম বাবার সঙ্গে। আব্বাই কোলাকুলিটা করতেন। এই দিন যখন ঈদের পড়লাম, তার কিছুদিন আগে ঈদ গেল। ধর্মতলা। আমরা থাকলাম এল মল্লিক বিল্ডিংয়ের পাশেই আমাদের ফুটবল টিম ক্যাম্প। ওখানে আমি থাকতাম। তো আমার মনে পড়ে এখনো যে ওই সময় আমি কানছিলাম। কারণ, আমি কোলাকুলি করার কোনো লোক পাই নাই ওখানে। আর আমি জানিও না যে আমার আব্বা বা আমার ভাইব্রাদার বেঁচে আছে।

আনিসুল হক:

  কোথায় আছে, কেমন আছে?

 রকিবুল হাসান: কোথায় আছে, কেমন আছে। এরপরে তো ১৬ ডিসেম্বর মানে এটা তো…।

আনিসুল হক:

  তারপরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কবে এলেন? বিজয়ের পরে?

 রকিবুল হাসান: বিজয়ের পরে আমি ওখান থেকে যশোর দিয়ে …

আনিসুল হক:

  তারপরে বাংলাদেশ খুলনা হয়ে চলে আসলেন। আপনি কি এরপরে এসে পড়াশোনা করলেন?

রকিবুল হাসান: আমার পড়াশোনা।

আনিসুল হক:

  কোথা থেকে পড়াশোনা শেষ করলেন?

 রকিবুল হাসান: আমার তো আমি ঢাকা কলেজ থেকে শেষ করলাম। ৭১-এ তো তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে গেছি। এখানে ঢাকা কলেজ থেকে। ঢাকা কলেজ থেকে পাস করে তখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হব। অ্যাপ্লিকেশন দিলাম ওখানে পলিটিক্যাল সায়েন্স। রাষ্ট্রবিজ্ঞান। এই পলিটিক্যাল সায়েন্স আশরাফুল ও ছিল পলিটিক্যাল। ওর জন্য এবং পলিটিক্যাল সায়েন্স পড়ত। এত ভালো রেজাল্ট করার পরেও আমি পড়ব ইকোনমিকস। ওটা ভালো সাবজেক্ট। ওকে না, আমাদের ক্রিকেট টিম অনেক ভালো। তুমি জানো না। আমারে খুব পটকাইছে। রকিবুল, ছেলেমেয়েরা সব খেলা দেখতে আসে। বোঝে না? ক্রিকেটের একটা ফ্লেভার আছে অন্য রকম। এখানে এই করে করে টিম স্ট্রং করা। হি ওয়াজ ক্যাপ্টেন ডিপার্টমেন্টের। তো আলটিমেটলি পলিটিক্যাল সায়েন্সই।

আনিসুল হক:

  পড়াশোনা করলেন। আর বলছিলেন যে মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দুই বছরের মতো ক্রিকেট বন্ধ ছিল।

 রকিবুল হাসান: ইয়েস।

আনিসুল হক:

  তারপরে আবার ক্লাব ক্রিকেট শুরু হলে আপনি কোন ক্লাবে গেলেন?

 রকিবুল হাসান: আমি আজাদ বয়েজ ক্লাবেই রয়ে গেলাম।

আনিসুল হক:

তারপরে ওই সময় কি খেলা হতো? ক্লাব খেলা?

 রকিবুল হাসান: ক্লাব ক্রিকেট যখন আবার শুরু হলো, তখন আজাদ বয়েজ ক্লাব আবার সংগঠিত হলো। মুশতাক তো নাই। কিন্তু তখন আলমগীর ফারুক চৌধুরী, উনি সিএসপি অফিসার। উনি কিন্তু আজাদ বয়েজ ক্লাবের প্লেয়ারও ছিলেন। উনারা, শামীম ভাই—এরাই আজাদ বয়েজ ক্লাব; ওয়াজ আ স্টুডেন্টস ক্লাব সত্যিকার অর্থে। মানে এখানে বড় বড় এ রকম কেউ আসে না। আর তখন তো পয়সার কোনো ঝনঝনানি ছিল না। লাভ অব দ্য গেম সবাই খেলত। যখন আমরা আসলাম ক্রিকেট, দেশ স্বাধীন হলো, ফিরে আসলাম, ক্রিকেট খেলব।

আনিসুল হক:

  তারপরে কি এমসিসি আসত? ওই সময় জাতীয় টিমে আপনি খেলেছিলেন?

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ, আমি প্রথম ক্যাপ্টেন ছিলাম।

আনিসুল হক:

 সেটা কত সালে?

 রকিবুল হাসান: সেটা ১৯৭৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর।

আনিসুল হক:

  আচ্ছা।

 রকিবুল হাসান: ৩১ ডিসেম্বর অ্যান্ড ফার্স্ট জানুয়ারি। ফার্স্ট জানুয়ারি ছিল আমার জন্মদিন।

আনিসুল হক:

 ৭৮।

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ। তো এর আগেরটুকু আপনি শুনেন।

আনিসুল হক:

 বলেন।

রকিবুল হাসান: কত রকমের দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, কত রকম স্বাধীন হওয়ার পরে যখন আমরা স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম, আমরা ওরকমভাবে টেস্ট প্লেইং কান্ট্রি হব, কী হব। খেলা হয় না, খেলা হয় না। বঙ্গবন্ধু তখন ছিলেন। উনি কি বললেন? উনি আসলেন। উনার কাছে তো এটা বিশাল সমস্যা। আমরা বুঝতেছি। ছাত্ররা তো বুঝতাম। কিন্তু খেলা কেন নাই? খেলাটা তো হোক। যেই ছেলেটা মাত্র ৯ মাস বা এক বছরও হয় নাই ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ লিখে এত বড় একটা আন্দোলন করল, সেই ছেলেটা রকিবুল হাসান ক্রিকেট খেলতে পারবে না? তখন একটা ধোঁয়া তোলা হয়েছিল… কারা করছিল জানি না আমরা; যে ক্রিকেটটা একটা ব্যয়বহুল খেলা।

আনিসুল হক:

 ও বড়লোকদের খেলা। এটা একটা সমাজতান্ত্রিক দেশে প্রচলিত ছিল।

রকিবুল হাসান: সমাজতান্ত্রিক ছিল না?

আনিসুল হক:

 হ্যাঁ। এটা পুঁজিবাদী খেলা।

 রকিবুল হাসান: পুঁজিবাদী খেলা, বড় পুঁজিবাদী খেলা, বড়লোকদের খেলা, ব্যয়বহুল খেলা। এই খেলাটা আমাদের যায় না। আমাদের সমাজতান্ত্রিক বিষয়ের কাঠামোর মধ্যে এগুলো যায় না। … আর ক্রিকেট তখন আমরা খেলব। এই আন্দোলন নামল। কোথা থেকে? আজকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যেটা, ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিল ছিল ওখানে। ওখান থেকে। তখন তো আর ব্যানার ছিল না এ রকম ডিজিটাল। লালসালু কাপড়ের মধ্যে লিখেটেখে নিয়ে আমরা রওনা দিলাম। … শেখ কামাল তো ক্রিকেট খেলত। ও চলে আসছে। আমরা কার কাছে যাব? বঙ্গবন্ধুর কাছে। আমরা প্রতিবাদ নিয়ে যাচ্ছি প্রেসক্লাবের… আমাদের তো যাওয়া লাগে নাই। তার আগেই প্রশাসন থামাইল। … সব আমাদের থামায় আইসা। বুঝলাম যে সিভিল ড্রেসে কেউ হয়তো ইনফরমেশন নিয়ে আসছে। তা ইন্টেলিজেন্সের কেউ। তো বলল, কামাল এল। বলে, আব্বা বলেছেন ক্রিকেট খেলা হবে।… তো তখন আন্দোলন করা লাগবে না। যাও রেডি হও।

 একদিন পরেই উনি… তখন ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন আমাদের…

আনিসুল হক:

 ইউসুফ সাহেব?

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ। ইউসুফ সাহেব। ইউসুফ সাহেব শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। তাঁকে প্রধান ই করা হলো, প্রেসিডেন্ট করা হলো। বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড তৈরি করা হলো। এবং পল্টু ভাই হলেন জেনারেল সেক্রেটারি। দামাল, ডাক্তার দামাল হলেন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। বাহাউদ্দিন ভাই, উনি হলেন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। …এই আবার ক্রিকেট শুরু হলো … ট্রান্সফার লিগ হলো। জাতীয় ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা হলো। বাই দ্যাট টাইম আশরাফুল তখন ইংল্যান্ডে।

আনিসুল হক:

  সৈয়দ আশরাফ?

 রকিবুল হাসান: সৈয়দ আশরাফুল হক। ওখান থেকে তখন ফুল ইংল্যান্ড টিম আবার ইন্ডিয়াতে আসছিল ট্যুরে। … হি ওয়াজ প্রমোটিং দ্য কজ অব বাংলাদেশ। ও বোঝে, জানে যে বাংলাদেশে স্কুল ক্রিকেট হয়। বাংলাদেশে ক্রিকেটের সম্ভাবনা আছে অনেক। … তখন অ্যাপ্লাই করে রাখা হয়েছিল আইসিসির কাছে, যে আমাদের মেম্বারশিপ দাও। এই মেম্বারশিপের মিটিং হবে। সেই মিটিং আমরা কেমন খেলি, কী খেলি, এগুলো জানার জন্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কনফারেন্স  একটা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম পাঠায়। এরপর এমসিসি স্ট্রং একটা টিম পাঠাল যে তোমরা ওখানে একটা সিরিজ খেলে এসো। এই সিরিজ খেলতে এল। প্রথম ম্যাচ রাজশাহী।

আনিসুল হক:

  ছিয়াত্তরে?

রকিবুল হাসান: হ্যাঁ, ছিয়াত্তরে। … ’৭৭-এ আসছি। আমি তখন বিশ্ব একাদশ খেলে ব্যাক করলাম।

আনিসুল হক:

  আচ্ছা।

রকিবুল হাসান: আমি আবার ব্যাক করলাম তখন।

আনিসুল হক:

 ও, বিশ্ব একাদশ খেলতে গিয়েছিলেন?

 রকিবুল হাসান: খেলতে। তখন এর মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। তখন ওই রাজশাহীতে প্রথম ম্যাচ হবে। নর্থ জোন। ওখানে খেলা হবে। রাজশাহী স্টেডিয়াম মানে একদম পুরা প্যাকড।

আনিসুল হক:

 লোকে লোকারণ্য।

রকিবুল হাসান: লোকে লোকারণ্য। … প্রথম খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অ্যান্ড ইট ওয়াজ আ ভেরি ইন্টারেস্টিং ম্যাচ। ম্যাচটা দুই দিনের ছিল। খেলা ড্র হলো। এই যাত্রা শুরু হলো আমাদের। তারপরে মিটিং এল। ওই আইসিসির মিটিং। ওই মিটিংয়ে রবিন বার্লার আবার চলে আসছিল ওখান থেকে, ইন্ডিয়া থেকে। এসে সেগুলো দেখল। দেখে দেখে ওর রিপোর্টটা ছাপল ওর ওখানে। এবং ওরাও যে রিপোর্ট দিল, খুব ভালো রিপোর্ট দিল। এবং আমাদের যেহেতু এই, ওই যে পাবলিক জনশ্রুতিটা দেখল, ওইটা দেখে বলল, না, ক্রিকেটের মার্কেট এখানে আছে। দেওয়া যেতে পারে। এবং ওই সময় আমাদের মেম্বারশিপটা দিয়ে দিল। অ্যাসোসিয়েট মেম্বারশিপ। তারপর তো আমরা আরও ম্যাচ খেললাম। ঢাকায় তিন দিনের ম্যাচ ছিল। ইউসুফ বাবু চমৎকার খেলল। তিন দিনের ম্যাচ ড্র হলো। আমি খেললাম। আমি এবং একটা মজার ঘটনাও আছে। আমার স্ত্রী, আমার স্ত্রী কিন্তু, আমরা কিন্তু পলিটিক্যাল সায়েন্সের ডিপার্টমেন্টাল কাপল।

আনিসুল হক:

 ’৭৩ সালে বিয়ে করলেন নাকি?

 রকিবুল হাসান: তেয়াত্তরে।

আনিসুল হক:

  ’৭৩। হ্যাঁ, ২০ বছর বয়স। ঠিক আছে।

 রকিবুল হাসান: বিয়ে হয়ে গেল। বিয়েটিয়ে করে তখন সব ঠিকঠাক আছি।

আনিসুল হক:

 সেলিব্রিটি। তারকা।

 রকিবুল হাসান: মানে ওই রকম আরকি।

আনিসুল হক:

আচ্ছা, আপনার শেষ ম্যাচ কোনটা ছিল?

 রকিবুল হাসান: আমার শেষ ম্যাচ হলো, রিটায়ার করলাম আমি শ্রীলঙ্কাতে। ওই এশিয়া কাপ।

আনিসুল হক:

 কত সালে এটা?

 রকিবুল হাসান: এইটি সিক্স।

আনিসুল হক:

এইটি সিক্স।

রকিবুল হাসান: এইটি সিক্স। যখন এশিয়া কাপ হলো।

আনিসুল হক:

 আচ্ছা এখন বলেন, বাংলাদেশ তো অনেক দূর এগোল। সেই যে আমরা আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হলাম, আকরাম খান ভালো রান করল। তারপর আস্তে আস্তে টেস্ট মর্যাদা, ওডিআই মর্যাদা, টি-টোয়েন্টি মর্যাদা, এখন বাংলাদেশ ভালো খেলে, খারাপ খেলে। তো সেই দিনগুলো আর এই দিনগুলোর প্রধান পার্থক্য কী দেখেন?

রকিবুল হাসান: দেখেন, এখন ক্রিকেট অনেক এগিয়ে গেছে। এখন ক্রিকেট প্রফেশনালিজম হয়ে গেছে। তখন আমাদের সময় তো প্রফেশনালিজম ছিল না। কোয়ালিটি প্লেয়ার ছিল আমাদের। বাট, সবাই স্টুডেন্ট ছিলাম। আমাদের ফিউচার ছিল যে আমরা একটা পড়াশোনা করব, বিসিএস দেব। বিসিএস দেব। তো ওদিকেই ছিলাম। টাকাপয়সার দিকে ও রকম সব প্লেয়ার ছিল। বাট, কোয়ালিটি ছিল সব খেলোয়াড়ের। বাট, স্বপ্ন দেখছি এবং আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম যে দিস ইজ দ্য গেম। এই খেলাটাই বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে দাঁড় করাবে। কারণ, এটা শরীরের খেলা না। ইটস আ গেম অব মাইন্ড। ইটস আ স্কিল। স্কিলের খেলা। এটা আমরা যারা আলাপ করতাম, নিজেরা বলতাম।

আনিসুল হক:

  … স্কুল ক্রিকেট তখন খুব ভালো ছিল। এখন তো স্কুল ক্রিকেট হয় না।

 রকিবুল হাসান: স্কুল ক্রিকেট হচ্ছে।

আনিসুল হক:

 হচ্ছে?

 রকিবুল হাসান: হচ্ছে। ক্রিকেট বোর্ড সারা বাংলাদেশে করে। এক হাজার স্কুল খেলে।

আনিসুল হক:

  খেলে?

 রকিবুল হাসান: হ্যাঁ। এই রিপোর্টগুলো ঠিকমতো আসে না। কারণ, এই খেলার রিপোর্টগুলোকে ছাপিয়ে গেছে একই সঙ্গে যখন আরও আন্ডার জুনিয়র ক্রিকেট হচ্ছে। অন্য…

আনিসুল হক:

  বয়সভিত্তিক ক্রিকেট হচ্ছে।

 রকিবুল হাসান: বয়সভিত্তিক ক্রিকেটগুলো হচ্ছে এগুলো। বাট, খেলাগুলো হচ্ছে। বাট, আরও গোছানোভাবে হওয়া উচিত, আমি মনে করি। মাঠের অভাব। মাঠের অভাব। ট্রেনিং করতে হবে। এই ট্রেনিং শব্দটা বলতে বলতে আমি টায়ার্ড হয়ে গেছি ক্রিকেট বোর্ডে।

 … সবাই খালি মাঠ মাঠ চিন্তা করে। স্টেডিয়াম চিন্তা করে। বাট দেন হ্যাভিং সেড দ্যাট আমি বিশ্বাস করি এবং আজকে আমার গর্ব লাগে যখন সাকিব আল হাসান তৈরি হয়ে গেছে এই দেশে। মনমতো খেলোয়াড়। তামিম ইকবালের মতো খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে। বড় বড় সব বল ক্লাস প্লেয়ার তৈরি হয়ে গেছে। তামিম লর্ডসে এক শ করেছে।

আনিসুল হক:

আচ্ছা, আমরা শেষ করব। আপনি দর্শকদের উদ্দেশে শেষ কথা বলবেন। শেষ কথা বলে কিছু নেই। আপনি দর্শকদের উদ্দেশে কিছু বলেন।

 রকিবুল হাসান: আমি দর্শকদের বলব, আপনাদের আমরা স্যালুট করি। যে আজকে শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেট না, সব খেলাগুলোকে আপনারা পৃষ্ঠপোষকতা করেন। সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষকতা কিন্তু আপনাদের সমর্থন। এই ক্রিকেটের সঙ্গে থাকবেন। ক্রিকেটকে ফলো করবেন। সবচেয়ে বড় কথা আপনাদের অর্থ লাগবে না। আপনারা খালি ক্রিকেটটাকে সাপোর্ট করে যাবেন। মাঠে আসবেন। আপনার সন্তানকে ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেবেন। মোবাইল কিনে দেবেন না। দেখবেন এই বাংলাদেশ খুব বেশি দেরি নেই, আমরা তো এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছি। আমরা বিশ্বকাপের ফাইনালে যাব এবং একদিন বিশ্বকাপ জিতব।

আনিসুল হক:

  অনেক ধন্যবাদ রকিবুল হাসান ভাই। সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছি যে বাংলাদেশ একদিন ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জয় করবে। সেই দিন বেশি দূরে নয়। আমাদের ক্রিকেটকে ভালোবাসতে হবে। আপনার সন্তানকে ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিন। আর বড় বড় গ্যালারি দরকার নেই। বড় বড় স্টেডিয়াম দরকার নেই। ক্রিকেটের একটা বেসিক মাঠ দরকার। এবং স্কুল পর্যায় থেকে আমাদের ক্রিকেট শুরু হবে। জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নানা স্তরে খেলা হবে। অনেক খেলোয়াড় পাব এবং একটা স্পোর্টিং নেশন চাই শুধু জয়ের জন্য নয়। একটা সুন্দর সুস্থ সমাজ এবং বাংলাদেশ গড়ার জন্য খেলা হতে পারে খুব বড় হাতিয়ার। সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।