তাঁদের একজন লুৎফুর কবির। তাঁর গ্রামের বাড়ি গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায়। বেসরকারি চাকরির সুবাদে তিনি ঢাকার বনশ্রী এলাকায় থাকেন। লুৎফুর কবির বলেন, পদ্মা সেতু দিয়ে ভ্রমণের দিনটি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল তাঁর পরিবারের কাছে। কারণ, সেদিন পর্যটনমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। প্রথম দিনের পর্যটক হিসেবে পর্যটন ভবন থেকে ট্যুরিস্ট কোস্টার ছাড়ার সময় তাঁদের ফুল দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। কোস্টার ছাড়ার সময় তাঁদের হালকা নাশতাও দেওয়া হয়। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে মাওয়া প্রান্ত দিয়ে তাঁদের বহনকারী কোস্টারটি পদ্মা সেতুর ওপর ওঠে। মাওয়া থেকে জাজিরা প্রান্তে যেতে তাঁদের ১২ মিনিটের মতো সময় লেগেছে। বাস একটু ধীরে গেছে, যেন সবাই নদী ও সেতু ভালো করে দেখতে পারে। পদ্মা সেতু পেরিয়ে বাস প্রথমে থামে ফরিদপুরের ভাঙা ইন্টারসেকশনে। সেখানে অন্যদের মতো তাঁরাও বাস থেকে নামেন ও সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কেউ কেউ সেলফিও তোলেন।

default-image

১৫ মিনিটের মতো সেখানে অবস্থানের পর ঘাসবন নামের একটি রেস্তোরাঁয় যান সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে পৌনে সাতটার দিকে। রেস্তোরাঁর পক্ষ থেকে আবার তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। সেখানে সবাই বিশ্রাম নেন। সবাইকে প্যাকেজের আওতায় নুডলস, চিকেন ফ্রাই ও পানীয় নাশতা হিসেবে দেওয়া হয়। প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানের পর তাঁরা আবার রওনা দেন। এ দিন ঢাকায় ফিরতে রাত প্রায় ১১টা বেজে যায়।

লুৎফুর কবির বলেন, ‘পর্যটন করপোরেশনের প্যাকেজটা এমন করে করা যে দিনের আলোয় পদ্মা সেতু দেখতে পেরেছি, আবার রাতেও দেখতে পেরেছি।’

‘পর্যটন করপোরেশনের গাড়ি ২টি ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে চলেছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হলে দেখা যায় জোরে গাড়ি চালায়। যেহেতু পরিবার নিয়ে গেছি, সেই জায়গায় থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, এটা আমার কাছে ভালো লেগেছে’ যোগ করেন লুৎফুর কবির।

default-image

পর্যটন করপোরেশনের ট্যুরিস্ট কোস্টার দুটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি)। গাড়ির ভেতরে ফ্রি ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে, তবে প্রথম দিন কারিগরি ত্রুটির কারণে তা ব্যবহার করতে পারেননি পর্যটকেরা। যাত্রীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় গাড়িতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে, যা পর্যটন করপোরেশন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেই সঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সীদের কোনো খরচ দিতে হয় না।

পাঁচ বছরের কম বয়সী কন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে ওই কোস্টারে পদ্মা সেতু ভ্রমণ করেন ঢাকার তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া এলাকার আরিফুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাড়ির পরিবেশ চমৎকার ছিল। পর্যটকদের সবাই বন্ধুসুলভ ছিলেন। খুব মজা করতে করতে গিয়েছি ও এসেছি। সার্বিকভাবে খুব ভালো অনুভব করেছি।’

দুই বাসের সঙ্গে পর্যটন করপোরেশনের দুজন কর্মকর্তা ও এই প্রতিষ্ঠানের অধীন ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের দুজন শিক্ষার্থী ছিলেন। আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যাওয়া কর্মকর্তাদের ব্যবহার খুবই বন্ধুসুলভ ছিল।’

পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে গেলেও নদী পাড়ে দাঁড়িয়ে মূল সেতুর অবকাঠামো দেখার ব্যবস্থা ছিল না। সেতুর জাজিরা প্রান্তে পর্যটন করপোরেশনের নিজস্ব হোটেল-মোটেল নেই। এই দুটি ব্যবস্থা থাকলে আরও ভালো হতো বলে মনে করেন আরিফুর।

সরকারিভাবে যে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এই বিষয়ই সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে রাজধানীর শ্যামলী এলাকার এলিয়স ম্যাকাওলি গোমেজের। তিনি তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে পদ্মা সেতু ভ্রমণে যান। এলিয়স ম্যাকাওলি গোমেজ বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হচ্ছে। তারপর খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে তাদের যে সার্বিক ব্যবস্থাপনা, সবকিছুই মোটামুটি ভালোই ছিল। যেহেতু অনেকেই পরিবার নিয়ে যাবে, তাই পদ্মা সেতুর আশপাশের দু-একটি জায়গা দেখানো গেলে ভালো হতো বলেও মনে করেন এলিয়স ম্যাকাওলি গোমেজ।

পদ্মা সেতু ভ্রমণের এই আয়োজনে বেসরকারি চাকরিজীবী মনিরুল ইসলামের কোনো পূর্বপরিচিত সঙ্গী ছিল না। তবে তিনি মোটেই একাকিত্ব বোধ করেননি। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ওখানে গিয়ে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। আমরা পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। দেখলে কারও মনেই হতো না যে আমরা অপরিচিত। পরিবার নিয়ে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরাও খুব আনন্দ করেছেন। এটা অন্যরকম এক অনুভূতি ছিল।’

সম্পূর্ণ নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু হয়েছে, পর্যটকেরা সবাই বিষয়টি নিয়ে গর্ব করছেন বলে উল্লেখ করেন মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতু দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের নামতে দেয়নি। একটু ধীরগতিতে বাস গেছে। আমরা বাস থেকেই পদ্মা সেতু দেখেছি।’

পর্যটন করপোরেশনের কর্মকর্তারা পর্যটকদের যথাসময়ে গাড়িতে ওঠাতে, নাশতা সরবরাহ করতে উদ্যোগী ছিলেন উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম বলেন, তাঁদের কথাবার্তাও সুন্দর ছিল।

প্রথম দিনের ভ্রমণে পর্যটকদের সঙ্গী হয়েছিলেন পর্যটন করপোরেশনের যে দুজন কর্মকর্তা, তাঁদের একজন করপোরেশনটির উপব্যবস্থাপক (ভ্রমণ ও বিপণন) শেখ মেহদি হাসান। তিনি বলেন, শুরুতে শুধু শুক্র ও শনিবার ট্যুরিস্ট বাস চললেও চাহিদা বেশি থাকায় তা আরও এক দিন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পর্যটন করপোরেশন। আগামী ৯ আগস্ট থেকে প্রতি মঙ্গলবারও এ বাসে করে পদ্মা সেতু দেখতে নিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ শুক্র, শনি ও মঙ্গলবার সপ্তাহে এই তিন দিন পর্যটন করপোরেশনের প্যাকেজটি চালু থাকবে। অবসরপ্রাপ্ত, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থী—মানে যাঁদের অফিস নেই, তাঁদের মঙ্গলবার প্রাধান্য দেওয়া হবে। শুক্র ও শনিবার চাকরিজীবীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।

মেহদি হাসানের ভাষ্যমতে, চাহিদা থাকলেও এখনই তাঁরা বাসের সংখ্যা বাড়াতে চান না। তিনি বলেন, ‘আমরা সেবার মান ধরে রাখার চেষ্টা করব। সে জন্য চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনই গাড়ির সংখ্যা বাড়াব না। কারণ, পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে ভালো মানের রেস্তোরাঁ নেই। ঘাসবন নামে আমরা যে রেস্তোরাঁর ব্যবস্থা করেছি, সেটাই ওখানে মোটামুটি ভালো। আমরা নিয়মিত যাব দেখে তারা এসি লাগিয়েছে। প্রথম দিন বিদ্যুতের জন্য পর্যটকেরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সুবিধা না পেলেও পরের দিন পেয়েছেন। ওই এলাকায় ভালো মানের রেস্তোরাঁর ব্যবস্থা হলে গাড়ির সংখ্যা বাড়ানো হবে।’

পর্যটন করপোরেশনের তিনটি ট্যুরিস্ট কোস্টার রয়েছে। সব কটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। ভ্রমণের প্রথম দিন উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা থাকায় বাস ছাড়তে ও ফিরতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। তবে তার পরের দিন গত শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে বাস ছাড়ে এবং রাত ১০টার আগেই ফিরে আসে বলে জানান শেখ মেহদি হাসান।

শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ট্যুরিস্ট কোস্টারে করে পদ্মা সেতু ভ্রমণ প্যাকেজটির খরচ ছিল জনপ্রতি ৯৯৯ টাকা। আগামী সপ্তাহ থেকে তা জনপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন