এক নাগরিক, এক কার্ডের লক্ষ্যেই এগোচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা
ফ্যামিলি কার্ডকে সরকার শুধু নতুন এক ভাতা কর্মসূচি হিসেবে দেখছে না; বরং এটিকে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের মেয়াদ শেষ হলেও দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। তাই আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে খণ্ডিত কর্মসূচির পরিবর্তে একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কতটা কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে, তা নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডের একটি হোটেলে ‘হাউ দ্য ফ্যামিলি কার্ড ক্যান পুশ দ্য ফ্রন্টিয়ারস অব সোশ্যাল সেফটি নেট ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধিকে ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে আরও বিস্তৃত করতে পারে) শীর্ষক এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এটি আয়োজন করে আন্তর্জাতিক গ্রোথ সেন্টার (আইজিসি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের অপ্রতুলতা, বিভিন্ন কর্মসূচির বিচ্ছিন্নতা, সুবিধাভোগী নির্বাচনে অন্তর্ভুক্তি ও বাদ পড়ার ক্ষেত্রে ভুল এবং সহায়তার প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো বহুদিন ধরেই চিহ্নিত হয়ে আছে। এ বাস্তবতায় শুধু নতুন কর্মসূচি চালু করলেই হবে না, বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।
জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক ঝুঁকির কারণে ভবিষ্যতে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও অভিঘাত–সহনশীল করে গড়ে তোলার প্রয়োজন বলে মত দেন এই উপদেষ্টা।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বিস্তৃত আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এমন একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব; যা সংবিধানে স্বীকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সমতার লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারের লক্ষ্য, একটি গণতান্ত্রিক মানবকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন ও সংস্কারের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আর্থিক চাপের মধ্যেও ৪১ লাখ পরিবারের জন্য ১৪ হাজার কোটি টাকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। কারণ, এটিকে ব্যয় নয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘মানুষের ভোগক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।’
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘এক নাগরিক, এক কার্ড’ ধারণা বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারকে একীভূত করা নয়; বরং তাদের মধ্যে তথ্য আদান–প্রদানের সক্ষমতা নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরকার, রাজস্বসহ বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করবে, তবে সেগুলোর মধ্যে নির্ভুল ও কার্যকর তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সুবিধাভোগী নির্বাচনকে আরও নির্ভুল করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সহায়তায় হালনাগাদ দারিদ্র্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত যাচাই–বাছাই ব্যবস্থার ওপর বৈঠকে জোর দেন উপদেষ্টা তিতুমীর।
দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে পরিবারভিত্তিক সহায়তার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, মৌসুমি অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব–সংক্রান্ত সহায়তাকেও একই কাঠামোর আওতায় আনতে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এ জন্য পরবর্তী বাজেট থেকেই কীভাবে একটি দক্ষ ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব আহ্বান করেন তিনি।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠারও অংশ। তাই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, নাগরিক সমাজ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বিস্তৃত আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এমন একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা সংবিধানে স্বীকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সমতার লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
গোলটেবিল বৈঠকে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)–এর নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের (আইজিসি) কান্ট্রি ইকোনমিস্ট আমিনুল আমানের সঞ্চালনায় বৈঠকে স্বাগত বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী প্রমুখ।