এক মুরগি ২৫ টুকরা, সবজি কেবল লাউ–আলু

সোহরাওয়ার্দী হলের ডাইনিংয়ের খাবার
ছবি: প্রথম আলো

সাধারণত এক কেজি ওজনের মুরগি কত টুকরা করা হয়—এই প্রশ্ন করতেই মুরগি দোকানিদের কেউ বললেন ১২ টুকরা, কেউ বললেন ১০। তবে ১০ বা ১২ নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে এক কেজি ওজনের একটি মুরগি কমপক্ষে ২৫ টুকরা করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের পাতে জোটে নামমাত্র মাংসের টুকরার ঝোল আর এক ফালি আলু।

মাছের ক্ষেত্রেও একই চিত্র আবাসিক হলের ডাইনিংয়ে। বাজারের সবচেয়ে কম দামি মাছই জোটে শিক্ষার্থীদের কপালে। এই তালিকায় আছে সবচেয়ে ছোট আকারের রুই (নলা), চাষের পাঙাশ, ছোট ছোট তেলাপিয়া।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে দশকের পর দশক ধরে একই ধরনের খাবার দেওয়া হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে খাবারের মান নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তখনো শিক্ষার্থীরা খাবারের মান উন্নয়নসহ ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন, বিক্ষোভ করেছিলেন। কিন্তু প্রায় এক বছরেও কোনো উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীরা বলছেন, খাবারের মান আগেও খারাপ ছিল। এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের খারাপ।

ডাইনিংয়ে দুপুর ও রাতের খাবারের তালিকায় থাকে ভাত, ডাল, মাছ বা মাংস এবং সবজি বা ভর্তা। দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আর ক্যানটিনে খাবারের মান একটু ভালো হলেও দাম ৩৫–৬০ টাকা পড়ে যায়।

সর্বশেষ গত ২৭ নভেম্বর দুপুরে ডাইনিংয়ের খাবারের মান বৃদ্ধিসহ ১৫ দফা দাবিতে এ এফ রহমান হলের মূল ফটকে তালা দেন শিক্ষার্থীরা। পরে খাবারের মান বৃদ্ধির আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা তালা খুলে দেন। এর আগে গত ১৩ নভেম্বর খাবারের মানবৃদ্ধিসহ আট দাবিতে আলাওল হলের মূল ফটকে তালা দেন শিক্ষার্থীরা। আর ৩১ অক্টোবর খাবারের মানবৃদ্ধি, পানির সমস্যা সমাধানসহ ৬ দাবিতে হলে মূল ফটকে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা৷

৩১ অক্টোবর খাবারের মানবৃদ্ধি, পানির সমস্যা সমাধানসহ ৬ দাবিতে হলে মূল ফটকে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা৷
ফাইল ছবি : প্রথম আলো

খাবারের মান বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে উপাচার্য শিরীণ আখতারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে উপাচার্যের বরাত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও শহীদ আবদুর রব হলের প্রাধ্যক্ষ রবিউল হাসান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, খাবারে সরাসরি ভর্তুকি না দেওয়া হলেও আসবাব, গ্যাস, কর্মচারীদের বেতন—সবকিছু দেওয়া হয়৷ খাবারে সরাসরি ভর্তুকি দিতে হলে বরাদ্দের প্রয়োজন। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) বিষয়টি জানাবেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত শিক্ষার্থীদের খাবারে পুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করা। ভর্তুকির বিষয়ে তিনি বলেন, ভর্তুকি দিলে এ টাকা অপব্যবহারের সুযোগ থাকে। আবার খাবারের দাম বাড়ালে অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে সরকার থেকে রেশন চাইতে হবে। অথবা টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। তাহলে সরাসরি ভর্তুকি না দিয়ে কম দামে পণ্য কিনে ২৫ থেকে ৩০ টাকার মধ্যেই ভালো খাবার নিশ্চিত করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শতকোটি টাকার নির্মাণকাজ হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষ বাড়ছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে যাঁরা বসবেন, তাঁদের স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে কোনো কিছুই কাজে আসবে না।
জাকির হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি

খাবারের দাম কত

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১১টি আবাসিক হল আছে। এর মধ্যে ৭টি ছাত্রদের ও ৪টি ছাত্রীদের। এসব হলে প্রায় সাড়ে চার হাজার ছাত্র আর চার হাজার ছাত্রী রয়েছে। ছেলেদের সাতটি হলেই ক্যানটিন আছে। মাস্টার দা সূর্য সেন হল ছাড়া অন্যগুলোতে ডাইনিংও রয়েছে। ডাইনিংয়ে দুপুর ও রাতের খাবারের তালিকায় থাকে ভাত, ডাল, মাছ বা মাংস এবং সবজি বা ভর্তা। দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আর ক্যানটিনে খাবারের মান একটু ভালো হলেও দাম ৩৫–৬০ টাকা পড়ে যায়।

ছাত্রীদের বেশির ভাগই রান্না করে খেলেও হলের অর্ধেক ছাত্র খান ডাইনিংয়ে। বাকি অর্ধেক ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দোকান ও ক্যানটিনে খান।

দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রিপন দুই বছর ধরে শাহ আমানত হলে থাকছেন। শুরুতে তিনি নিয়মিত ডাইনিংয়ে খেতেন। এখন কদাচিৎ যান। রিপন বলেন, নিয়মিত ডাইনিংয়ে খেলে বুক জ্বালাপোড়া করে। এ কারণে তিনি এখন বেশির ভাগ সময় বাড়তি দামে হোটেলে খান। মাঝেমধ্যে অবশ্য ডাইনিংয়েও খান।

সোহরাওয়ার্দী হলের ডাইনিংয়ের খাবার
ছবি: প্রথম আলো

খাবার মানসম্পন্ন নয় স্বীকার করে বলে শাহজালাল হলের প্রাধ্যক্ষ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়া হলের প্রাধ্যক্ষ মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বাজারের নিত্যপণ্যের যে দাম, তাতে ২৫ টাকায় বা ৩০ টাকায় মানসম্মত খাবার দেওয়া সম্ভব নয়। খাবারে সরাসরি ভর্তুকি দেওয়ারও কোনো নির্দেশনা নেই। এককভাবে হল কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সব হলের প্রাধ্যক্ষের সম্মতির প্রয়োজন হয়। ১৬ ডিসেম্বরের আগে সব হলের প্রাধ্যক্ষ মিলে খাবারের বিষয়টি সমাধান করার জন্য সভা করবেন।

সবজি শুধু লাউ–আলু, ডাল যেন ‘হলুদ পানি’

ডাল। শিক্ষার্থীরা বলেন ‘হলুদ পানি’
ছবি: প্রথম আলো

১০টি আবাসিক হলের ডাইনিংয়ে মাছ, মুরগি, সবজি, ডাল, ভর্তা পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে দেওয়া হয় কলমি ও কচুশাক। মাছ, মুরগির মতো সবজি ও ডাল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে ক্ষোভের শেষ নেই। সবজি হিসেবে কখনো লাউ, আবার কখনো দেওয়া হয় আলু। মাঝেমধ্যে দেওয়া হয় মিষ্টিকুমড়া আর আলুভর্তা। যেদিন যে সবজির দাম সবচেয়ে কম থাকে, সেই সবজিই দেওয়া হয়। আর মসুর ডালকে শিক্ষার্থীরা ‘হলুদ পানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

শাহাব উদ্দিন নামের সোহরাওয়ার্দী হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, নামে ডাল হলেও গামলায় ডালের ছিটেফোঁটা থাকে না। স্বচ্ছ এ পানি হলুদে ভর্তি থাকে।

১১ মাস ধরে ডিম নেই

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১১ মাস আগেও খাবারের তালিকায় ডিম ছিল। কিন্তু এখন নেই। আগে ১০ টাকায় ডিমের ঝোল বা অমলেট পাওয়া যেত। হালি ৩৮ টাকা হওয়ার পর থেকে তালিকা থেকে ডিম বাদ দেওয়া হয়।

শহীদ আব্দুর রব হলের ডাইনিং পরিচালক আবদুল বাতেন ও আলাওল হলের ডাইনিং পরিচালক মো. ইকরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সবজিসহ বাজারে সবকিছুর দামই বাড়তি। দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিম বাদ দেওয়া হয়েছে। ২৫ টাকায় এর চেয়ে ভালো খাবার দেওয়া সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে মুরগি ২০-২২ টুকরা করতে হচ্ছে।

ডাইনিংয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রায়ই কথা বলি। শিক্ষার্থীরা ডাইনিংয়ের খাবার খেয়ে অনেক খুশি।
শিপক কৃষ্ণ দেবনাথ, সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষ

পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকেরা যা বলছেন

বাজারের সবচেয়ে কম দামি মাছই জোটে শিক্ষার্থীদের কপালে। এই তালিকায় আছে সবচেয়ে ছোট আকারের রুই (নলা), চাষের পাঙাশ, ছোট ছোট তেলাপিয়া
ছবি: প্রথম আলো

এ ধরনের খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিচাহিদা মিটছে না বলে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকেরা। বুক জ্বালাপোড়া ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়ে প্রতি মাসে গড়ে হলের ৭০ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে যান।

শিক্ষার্থীদের হলে যে ধরনের খাবার দেওয়া হয়, তাতে প্রোটিন পূরণের কোনো সুযোগ নেই বলেছেন করেছেন চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের উপপরিচালক পুষ্টিবিদ হাসিনা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রোটিনের অভাবে শিক্ষার্থীরা স্মৃতিশক্তি লোপসহ নানা সমস্যায় ভুগতে পারেন। বিশেষ করে মেয়েরা অল্প বয়সেই ভিটামিন ডির অভাবজনিত রোগ ও হাড়ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। ডিম বন্ধ রাখা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। কারণ, ডিমকে বলা হয় সুপারফুড।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. আবু তৈয়ব প্রথম আলোকে বলেন, একজন শিক্ষার্থীর দৈনিক ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ ক্যালরির প্রয়োজন হয়। ডাইনিংয়ের খাবারে এ ক্যালরি পূরণের কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে অনেকটা পুষ্টিহীন দেহ নিয়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে বসেন।

‘শিক্ষার্থীরা খাবার খেয়ে অনেক খুশি’

শহীদ আবদুর রব হলের খাবার। যেখানে সবজি বলতে বেশির ভাগ সময়ই দেওয়া হয় আলু
ছবি: প্রথম আলো

খাবারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো ভর্তুকি দেয় না; এমনকি খাবারের মান নিয়ে হল কর্তৃপক্ষও নিয়মিত তদারকি করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নিয়মিত তদারক করেন বলে দাবি করে সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষ শিপক কৃষ্ণ দেবনাথ বলেন, ‘ডাইনিংয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রায়ই কথা বলি। শিক্ষার্থীরা ডাইনিংয়ের খাবার খেয়ে অনেক খুশি।’

অবশ্য শিপক কৃষ্ণের সঙ্গে মিল নেই ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এস এম মনিরুল হাসানের বক্তব্যের। আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের যে খাবার দেওয়া হয়, তা মানসম্মত নয় বলে স্বীকার করে এস এম মনিরুল হাসান বলেন, ভর্তুকি দেওয়া ও খাবারের দাম বাড়ানোর বিষয়ে তাঁরা আলোচনা করবেন।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ

হলগুলোতে শুধু নিম্নমানের খাবার নয়, রয়েছে সুপেয় পানি ও পরিচ্ছন্নতার অভাব। ডাইনিংগুলোর পরিবেশ বেশির ভাগই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। শৌচাগারগুলো যাচ্ছেতাই। কক্ষের ভেতর ভাঙাচোরা চেয়ার টেবিল।

এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পড়াশোনা হয় না বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন। তিনি বলেন, হলের খাবারের মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ। কর্তৃপক্ষের উচিত ভর্তুকির ব্যবস্থা করা। খাওয়াদাওয়া ঠিক না থাকলে, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ না থাকলে কোনোভাবেই পড়ায় মনোযোগ দেওয়া যায় না।

জাকির হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শতকোটি টাকার নির্মাণকাজ হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষ বাড়ছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে যাঁরা বসবেন, তাঁদের স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে কোনো কিছুই কাজে আসবে না।