পুরান ঢাকায় চম্পা বিবির সমাধি, শায়েস্তা খানের সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক ছিল
পুরান ঢাকার সরু একটি গলি। দুই পাশে সারি সারি দোকান। একটি দোকানের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাড়ে তিন শ বছরের পুরোনো এক সমাধিসৌধ। লোহার গ্রিলের দরজায় তালা। গম্বুজের গায়ে শেওলা, চারপাশে লতাগুল্ম। ভেতরে সাদা গিলাফে ঢাকা একটি কবর। এই সমাধি চম্পা বিবির। কে ছিলেন তিনি, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যেই মতভেদ আছে। অথচ তাঁর নামেই পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের পাশ থেকে চকবাজারের কাছাকাছি বিস্তীর্ণ একটি এলাকার নাম হয়েছে চম্পাতলী। এলাকার রাস্তার নামকরণও হয়েছে তাঁর নামেই—‘চম্পাতলী লেন’।
সমাধিসৌধের ফটকের ওপর পাথরের ফলকে লেখা, ‘ছোট কাটারা স্থিত চম্পা বিবির মাজার, সায়েস্তা খান কর্তৃক ১৬৭১ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত।’ ফলকটি নির্মাণের সময় জানায়, কিন্তু চম্পা বিবির পরিচয়ের রহস্যের জট খোলে না।
চম্পা বিবির না আছে কোনো ছবি, না আছে নিশ্চিত কোনো বংশপরিচয়। সাড়ে তিন শ বছরের বেশি সময় ধরে চম্পা বিবির পরিচয়ের রহস্যের জট খোলেনি।
চম্পা বিবির পরিচয় নিয়ে যত জটিল রহস্যই থাকুক, তাঁর সমাধি খুঁজে পাওয়া অতটা জটিল নয়। বুড়িগঙ্গার তীরের অদূরে ঢাকার অতি বিখ্যাত ও ততোধিক দুর্দশাগ্রস্ত মোগল স্থাপনা ছোট কাটরার প্রথম ফটকের কাছেই চম্পা বিবির সমাধি। অবশ্য তাঁর সমাধির অবস্থাও খুব সুবিধার নয়। ছোট কাটরার সঙ্গে তুলনা করলে চম্পা বিবির সমাধিসৌধের হাল এখনো বেশ ভালো বলেই কবুল করতে হয়। যদিও এর গম্বুজ ছেয়ে গেছে শেওলায়, আর চারপাশ দিয়ে গজিয়ে ওঠা লতাগুল্মের পরাক্রমে স্থাপত্যশৈলী চোখে দেখার উপায় নেই।
চম্পা বিবির সমাধি হাকিম হাবিবুর রহমান লেনের পাশে। সরু এই পথ ধরে চলে গেলে সমাধিসৌধটি চোখে পড়ার সম্ভাবনা বিশেষ নেই। সারি সারি দোকানের আড়ালে পড়ে গেছে এই স্থাপনা। সরাসরি সামনের দোকানটি একতলা। ফলে ভালো করে তাকালে সমাধির গম্বুজের পশ্চিমের খানিকটা অংশ দেখা যায়। মূল সৌধ থাকে চোখের আড়ালে।
লোহার গ্রিলের তালাবদ্ধ দরজায় দাঁড়ালে ভেতরের চম্পা বিবির অন্তিম শয্যার অনেকটা অংশ নজরে আসে। মেঝে থেকে উঁচু করে বাঁধাই করা কবরটি সাদা গিলাফে ঢেকে রাখা। গিলাফটি বেশ পরিচ্ছন্নই দেখা গেল। ভেতরে পূর্ব দিকের দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া। দূর থেকে দেখে মনে হলো ভেতরে দেয়ালের পলেস্তারা কোথাও কোথাও ঝরে পড়েছে। বোঝাই যায় নিয়মিত পরিচর্যার ঘাটতি যথেষ্ট। আর বয়সও তো কম হলো না। পুরো ৩৫৫ বছর।
কে এই চম্পা বিবি
চম্পা বিবি বেঁচে ছিলেন ঢাকার মোগল যুগে। নাম ‘চম্পা’ বলে অনুমান করা হয় তিনি বাঙালিই হবেন। তবে সুবাদার নবাব শায়েস্তা খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঠিক কী ছিল, তা নিয়েই ইতিহাসবিদদের মধ্য রয়েছে অনেক রকম মত।
ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুনের বইয়ে নবাবের কন্যা হিসেবে চম্পা বিবির উল্লেখ রয়েছে। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বইয়ে আছে স্ত্রী। আর হাকিম হাবিবুর রহমানের মতে তিনি ছিলেন নবাবের উপপত্নী। রহমান আলী তায়েশের বইয়েও বলা হয়েছে স্ত্রী বা উপপত্নী হতে পারেন। ফলে চম্পা বিবির পরিচিতি নিশ্চিত হতে পারেননি ঐতিহাসিকেরা। তবে চম্পা বিবির সঙ্গে নবাবের সম্পর্ক যা–ই হোক, তা যে খুব ঘনিষ্ঠ ছিল, সে প্রমাণ দিচ্ছে এই সমাধিসৌধ। যেটি নবাব নিজে তৈরি করেছিলেন।
‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া জানিয়েছেন, সুবাদার শায়েস্তা খান ১৬৬৩ সালে বসবাসের জন্য ছোট কাটরা নামের তিনতলাবিশিষ্ট ইমারতটি নির্মাণ করেছিলেন। তিনি নিজে এখানে বসবাস করেছেন কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। নবাব থাকতেন মূলত লালবাগের কেল্লায়। তবে এখানে নবাবের কনিষ্ঠ পুত্র খোদাবন্দ খান ওরফে মির্জা বাঙালি ও চম্পা বিবি বসবাস করতেন। পরে তাঁদের বংশধরেরাও বহুকাল এখানে বসবাস করেছেন।
মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন
নবাব শায়েস্তা খান যে কেবল প্রশাসক হিসেবেই খ্যাতিমান ছিলেন, তা নয়; স্থপতি হিসেবেও বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল তাঁর। ছোট কাটরা, লালবাগ কেল্লার ভেতরে কন্যা পরী বিবির সমাধি, চম্পা বিবির সমাধি, মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট শায়েস্তা খান মসজিদের মতো তাঁর নির্মিত স্থাপনাগুলো ঢাকার এককালের সমৃদ্ধি ও গৌরবময় ইতিহাসের স্মারক হয়ে আছে।
চম্পা বিবির সমাধিসৌধটি এক গম্বুজবিশিষ্ট। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার বর্ণনা অনুসারে, সৌধটি বর্গাকারে তৈরি। বাইরের দিক থেকে প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৭.২৭ মিটার। ইটের তৈরি সৌধটির চার পাশের প্রতিটি দেয়ালের মাঝবরাবর একটি করে দরজা। এই দরজাগুলোর দুই পাশে সরু মিনার দিয়ে অলংকৃত। ছাদের ওপর একমাত্র গম্বুজটি আট কোনাকৃতির ড্রামের ওপরে অবস্থিত। আদিতে সমাধিটি ছিল ছোট কাটরার প্রাঙ্গণের ভেতরে।
মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ছোট কাটরা ওয়াকফ করে দেওয়া হয়েছিল। ছোট কাটরার সম্পত্তি অনেক হাতবদলের মধ্য দিয়ে নানাজনের মালিকানায় চলে গেছে।
ইতিহাসের স্মারক, সংরক্ষণ নেই
চম্পা বিবির সমাধির আশপাশের বাসাবাড়ির সবই এখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি। চম্পা বিবির সমাধিটি এখন সম্মিলিতভাবে কয়েকটি পরিবার দেখভাল করে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রবীণ ব্যবসায়ী তারা মিয়া। ছোট কাটরাতেই তাঁর পাইকারি ব্যবসার দোকান। গত রোববার তাঁর ছেলে মো. মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, চম্পা বিবির মাজার স্থানীয় সাতটি পরিবার মিলে তদারক করে থাকে। এককভাবে কারও দায়িত্বে নেই। বর্ষার সময় বলে গম্বুজের ওপরের অংশ ইদানীং পরিষ্কার করা হয়নি। সে কারণে কিছু ঘাস–লাতা জন্মেছে। জানালেন, এগুলো তাঁরা পরিষ্কার করে ফেলবেন।
চম্পা বিবির সমাধির ছবি তোলা হলো অপর পাশের এক ভবনের দোতলার বারান্দার গ্রিলের ভেতর থেকে। তবে ‘মহিলার মাজার’ বলে ভেতরে পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই। সমাধির পরিচর্যাকারীদের একজন ফটকের সামনে সুইচ চেপে ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দিলেন। এতে দূর থেকে সমাধির খানিকটা অংশ মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দী করা গেল।
মোগল শাসনর পরে ছোট কাটরা জরাজীর্ণ হয়ে যায়। কোম্পানি আমলে ভবনটি সংস্কার করে শেফার্ড নামের এক পাদরি এখানে বসবাস করেছিলেন বলে মুন্সী রহমান আলী তায়েশ তাঁর ‘তাওয়ারিখে ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, শেফার্ড এ সময় চম্পা বিবির সমাধিসৌধের ভেতরের মূল কবরটি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। পরে আবার কোনো এক সময় সমাধিটি হয়তো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। এশিয়াটিক সোসাইটির ‘ঢাকা কোষ’–এ বলা হয়েছে, চম্পা বিবির সমাধিসৌধটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ নয়।
সরকারিভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় ছোট কাটরার আদি রূপ বিলুপ্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক এই মোগল স্থাপত্যকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা দুরূহ। তবে চম্পা বিবির সমাধি যেহেতু এখনো টিকে আছে, সে কারণে স্থাপনাটি যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে সুরক্ষিত রাখার সুযোগ এখনো রয়েছে।