এত ব্যয়ের মেট্রোরেলে ভাড়া কত দাঁড়াবে

মেট্রোরেলফাইল ছবি

সরকার আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যে প্রশ্ন সামনে আসছে, তা হলো এত ব্যয়ের মেট্রোরেলে ভাড়া কত দাঁড়াবে? প্রকল্পগুলো থেকে যে আয় হবে, তা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হবে তো?

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গতকাল বুধবার ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা, বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত তিনটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেয়।

তিন প্রকল্পের মোট ব্যয় আড়াই লাখ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। মেট্রোরেলের আয় আসে ভাড়া থেকে। বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলতে হলে ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে অনেক বেশি। নইলে ঋণ পরিশোধের জন্য বিপুল ভর্তুকি দিতে হবে। সেটাও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে।

মেট্রোরেল আইন ২০১৫–এ গণপরিবহনটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘জনসাধারণকে স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত ও উন্নত গণপরিবহনসেবা প্রদান’। এই আইনের একটি ধারায় ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল পরিচালনার ব্যয় এবং জনসাধারণের আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়গুলো বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

এত ব্যয়ের মেট্রোরেলে ভাড়া কত দাঁড়াবে? প্রকল্পগুলো থেকে যে আয় হবে, তা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হবে তো?

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উত্তরা-মতিঝিল পথে মেট্রোরেলে যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়, তা আশপাশের দেশগুলোর মেট্রোরেলের ভাড়ার চেয়ে বেশি। সরকার তখন বলেছিল মেট্রোরেল ধনী ও গরিবের। তবে গরিবদের মেট্রোরেলে চড়তে দেখা যায় না।

মেট্রোরেল
ফাইল ছবি

বর্তমানে উত্তরা-মতিঝিল পথে চলাচলকারী মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ করলে ভাড়া গুনতে হয় ৯০ টাকা। দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। ঢাকার কোনো বাসেই এত ভাড়া নেই। মেট্রোরেলের সমান দূরত্বে বাসে ভ্রমণ করলে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা। আর ঢাকার বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। অবশ্য মেট্রোরেল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি)। ঢাকার বেশির ভাগ বাসে এসি নেই।

দেখা যাচ্ছে, উন্নত গণপরিবহন হচ্ছে। তবে তা স্বল্প ব্যয়ের নয়। গণপরিবহনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়।

একনেকে গতকাল যে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার একটি নতুন। দুটি প্রকল্পের প্রস্তাব সংশোধন করা হয়েছে। আড়াই লাখ কোটি টাকায় তিনটি প্রকল্পের আওতায় পাতাল ও উড়াল মিলে ৬৪ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার মেট্রোরেল পথ নির্মাণ করা হবে।

তিন প্রকল্পের মোট ব্যয় আড়াই লাখ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। মেট্রোরেলের আয় আসে ভাড়া থেকে। বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলতে হলে ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে অনেক বেশি। নইলে ঋণ পরিশোধের জন্য বিপুল ভর্তুকি দিতে হবে। সেটাও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে।

তিন প্রকল্পে গড়ে কিলোমিটারপ্রতি মেট্রোরেল নির্মাণ ও ট্রেন চালুর জন্য ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। উত্তরা-মতিঝিল পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। তবে কয়েক দফা ব্যয় বাড়ে। এই পথটির পুরোটাই উড়ালপথে।

ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয়েছে ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা।

জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ দুটির ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অন্য প্রকল্পটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে। ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, গতকালের একনেক বৈঠকে জাইকার ঋণের দুটি প্রকল্প (এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ উত্তর) আলোচ্যসূচিতে প্রথমে ছিল না। শুধু এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণে নেওয়া নতুন প্রকল্পটি (লাইন-৫ দক্ষিণ) অনুমোদন করার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবসংবলিত দুটি প্রকল্প যুক্ত করা হয়। কারণ, লাইন-৫ দক্ষিণের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। এই প্রকল্প আগে অনুমোদন হলে বেশি ব্যয়ের প্রকল্প সংশোধন নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এ জন্য একসঙ্গে তিন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।

বর্তমানে উত্তরা-মতিঝিল পথে চলাচলকারী মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ করলে ভাড়া গুনতে হয় ৯০ টাকা। দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। ঢাকার কোনো বাসেই এত ভাড়া নেই। মেট্রোরেলের সমান দূরত্বে বাসে ভ্রমণ করলে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা। আর ঢাকার বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। অবশ্য মেট্রোরেল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি)। ঢাকার বেশির ভাগ বাসে এসি নেই।

আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ অসম্ভব

২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় মেট্রোরেলের চলাচল শুরু হয়। আয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) টিকিট বিক্রি থেকে অনিরীক্ষিত (প্রভিশনাল) উত্তরা-মতিঝিল পথে মেট্রোরেলের আয় ছিল ৪০০ কোটি টাকার মতো। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিকিট বিক্রি করে আয় ছিল প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা। ২০২২ সালে আংশিক চালুর পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ২২ কোটি টাকার বেশি।

সব মিলিয়ে মেট্রোরেলের যাত্রীভাড়া থেকে সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত আয় হয়েছে ৬৬৬ কোটি টাকা। এর বাইরে দোকানভাড়া, বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য খাত থেকে বছরে ২০ কোটি টাকার মতো আয় হয়।

আরও পড়ুন

ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, শুধু বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে গত অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। শুরুতে মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতির দরকার হলে তা প্রকল্পের আওতায় ঠিকাদার বহন করত। গত জানুয়ারি থেকে ঠিকাদারের খরচ বহন করার সময় শেষ হয়ে গেছে। এখন রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় নিজেদের করতে হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এই খাতে ব্যয় আরও বাড়বে।

সব মিলিয়ে মেট্রোরেলের যাত্রীভাড়া থেকে সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত আয় হয়েছে ৬৬৬ কোটি টাকা। এর বাইরে দোকানভাড়া, বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য খাত থেকে বছরে ২০ কোটি টাকার মতো আয় হয়।

উত্তরা-কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে জাইকার কাছ থেকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এই ঋণ সুদ-আসলে প্রতিবছর দুটি কিস্তিতে আগামী ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের কিস্তির টাকার পরিমাণও বেড়ে যাবে।

ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, নির্মাণকালীন ১০ বছর পর্যন্ত জাইকার ঋণের মূল কিস্তি দিতে হয়নি, যা গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে পরিচিত। ২০২৩ সালের জুন থেকে সীমিত আকারে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত কিস্তি হিসেবে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হবে। উত্তরা-মতিঝিল পথে এখন যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হবে না।

ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা বলছেন, জাপানের ঋণে বাস্তবায়নাধীন নতুন দুটি প্রকল্পের জন্য জাইকা থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার মতো ঋণ নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী ৪০ বছরে এই ঋণ সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পটির জন্য এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিপুল ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিল। ব্যয় বাড়ানোর জন্য জাইকার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়েছে। কিন্তু জাইকা দরপত্র ব্যবস্থা উন্মুক্ত করে কিংবা দর-কষাকষি করে ব্যয় কমানোর বিষয়ে রাজি হয়নি।

ব্যয় কেন বাড়ে

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, জাইকার ঋণের এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যার ফলে জাপানি ঠিকাদারেরা বাড়তি সুবিধা পায়। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা, দরপত্র প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়েও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। দরপত্রের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে জাইকার অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা তৈরি করা কঠিন হচ্ছে।

দরপত্রের কারিগরি শর্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর একটি উদাহরণ এমআরটি লাইন-১-এর পাতালপথ নির্মাণে ‘ওয়ান-পাস জয়েন্ট’ পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা জাপানের নিজস্ব প্রযুক্তি।

আরও পড়ুন

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিপুল ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত ছিল। ব্যয় বাড়ানোর জন্য জাইকার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়েছে। কিন্তু জাইকা দরপত্র ব্যবস্থা উন্মুক্ত করে কিংবা দর-কষাকষি করে ব্যয় কমানোর বিষয়ে রাজি হয়নি।

যে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ। আগেই দেশে ঋণের বোঝা নিয়ে চলছে। এই বোঝার ভার আরও বেড়ে গেল। এখন দেশের মানুষ বহন করতে পারবে কীভাবে, সেটাই প্রশ্ন।
বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক

ঢাকার জন্য মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহন দরকার—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সরকার একমত। বাড়তি ব্যয়ের কারণে নতুন মেট্রোরেল নির্মাণ না করলে সরকার বদনামে পড়বে, এমনটাও আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, যে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ। আগেই দেশে ঋণের বোঝা নিয়ে চলছে। এই বোঝার ভার আরও বেড়ে গেল। এখন দেশের মানুষ বহন করতে পারবে কীভাবে, সেটাই প্রশ্ন। তিনি বলেন, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দেখা গেছে, উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের পথটি সবচেয়ে লাভজনক হবে। সেখানেই ব্যয় তোলা যাচ্ছে না।

এই অধ্যাপক আরও বলেন, জাইকা মেট্রোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। ঠিকাদারও জাপানের, প্রযুক্তি তাদের, তদারকের দায়িত্বও জাপানের। তারা ঋণ দেয় জাপানি মুদ্রায় ইয়েনে। পণ্য কেনা হয় ওই দেশ থেকে। বাংলাদেশকে পরে ঋণ পরিশোধ করতে হয় ডলারে। এত দুর্বলতা রেখে প্রতিযোগিতামূলক দরে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন