উর্দুকে চাপিয়ে দিতে বাংলা লিপি পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে শোষণমুক্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের অবসানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার আশা করলেও দ্রুতই তার মোহভঙ্গ ঘটে। নতুন রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী শুরুতেই আঘাত হানে এ অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। মূলত ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

এ সময়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাংলা লিপিকে আরবি হরফে রূপান্তরের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। রাজনীতিক ও মার্ক্সীয় তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর তাঁর ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, এই উদ্যোগের মূলে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক মানসিকতা। তাদের ধারণা ছিল, বাংলা ভাষার সংস্কৃতজাত বৈশিষ্ট্য পাকিস্তানের ইসলামি কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

এই পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনে। সেখানে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলা লিপি পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। গবেষক বশীর আলহেলালের ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ অনুযায়ী, সরকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বার্ষিক ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় এবং পূর্ব বাংলার ২১টি কেন্দ্রে আরবি হরফে বাংলা শেখানোর কার্যক্রম শুরু করে।’ হুরফুল কুরআন’ সমিতির মাধ্যমে প্রচার করা হয় যে, অভিন্ন হরফ ব্যবহারের ফলে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংহতি বাড়বে। তবে এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালিকে তার ঐতিহ্য ও সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানান ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ১৯৪৮ সালের এক সাহিত্য সম্মেলনে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’’ তাঁর এই বক্তব্য শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া পরিচয় সংকটের বিপরীতে বাঙালির জাতিগত সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

আরবি হরফে বাংলা প্রবর্তনের সরকারি হীন চেষ্টার বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার শিক্ষাবিদ ও ছাত্রসমাজ দ্রুতই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই প্রতিরোধের কেন্দ্রে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠিয়ে এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানায়। তাদের প্রধান যুক্তি ছিল—মাতৃভাষার লিপি পরিবর্তন করলে এ অঞ্চলে নিরক্ষরতা চরম আকার ধারণ করবে, কারণ বাঙালির জন্য আরবির চেয়ে বাংলা অক্ষর আয়ত্ত করা অনেক বেশি সহজ ও স্বাভাবিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জগন্নাথ কলেজ, ইডেন কলেজসহ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত পূর্ব বাংলা সরকার একটি প্রেসনোট জারি করতে বাধ্য হয়। সেখানে জানানো হয়, বাংলা লিপির ভাগ্য নির্ধারণের চূড়ান্ত অধিকার কেবল এ দেশের জনগণের।

সাংস্কৃতিক এই বিরোধের সমান্তরালে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বৃদ্ধি পায়। কর্ডন প্রথা, খাদ্যসংকট ও মুসলিম লীগের একদলীয় আচরণের ফলে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাজনীতিক ও লেখক কামরুদ্দীন আহমদ তাঁর ‘বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মুসলিম লীগ তখন পূর্ব বাংলাকে কার্যত একটি বাজার বা উপনিবেশ হিসেবে বিবেচনা করত।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে এবং শামসুল হকের সাধারণ সম্পাদকত্বে দলটির আত্মপ্রকাশ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধের সূচনা করে। শামসুল হক পঠিত ‘মূল দাবি’ শীর্ষক পুস্তিকাটি ছিল পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলিল।

১৯৪৮-৪৯ সালের এই ঘটনাক্রম ছিল মূলত একই ঐতিহাসিক ধারার অংশ। গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘আওয়ামী লীগ: উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। বাংলা লিপি রক্ষার লড়াই এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ছিল ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালের সংগ্রামের প্রাথমিক প্রস্তুতি।

প্রশাসনিক নির্দেশে ভাষা বা লিপি পরিবর্তনের এই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া ছিল স্বাভাবিক। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অভিজ্ঞতার ধারক। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো ভাষাকে দমন করার চেষ্টা করলে তার প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হয়। বাংলা লিপি রক্ষার এই লড়াই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একটি বৈশ্বিক প্রতীকে রূপ লাভ করে।

তথ্যসূত্র:

১. বদরুদ্দীন উমর—পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি।

২. শেখ মুজিবুর রহমান—অসমাপ্ত আত্মজীবনী।

৩. বশীর আল্হেলাল—ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।

৪. অলি আহাদ—জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ‘৭৫।

৫. কামরুদ্দীন আহমদ—বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ।

৬. মহিউদ্দিন আহমদ—আওয়ামী লীগ: উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০।

৭. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম (সম্পাদিত) —সাময়িকপত্রে ভাষা আন্দোলন।