ওয়াটার এটিএমে আশার আলো

টেকনাফের জালিয়া পাড়ার এটিএম বুথ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন এক নারীছবি: এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের সৌজন্যে

প্রতিদিন পুকুর থেকে লবণাক্ত পানি আনতে হতো। আর ওই পানি শরীরে লেগে অনেক জায়গায় দগদগে ঘা, চুলকানি আর অসহনীয় জ্বালা অনুভব করতেন কোহিনূর আক্তার। প্রতিদিন মাথায় ভারী কলসি নিয়ে দূরপথ হাঁটতে হতো ৩৮ বছর বয়সী এই নারীকে। এই কষ্ট শুধু শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও তাঁকে বিধ্বস্ত করত। এসব স্মৃতি ভুলতে পারেন না কুতুবদিয়া দ্বীপের বৈদ্যরপাড়ার কোহিনূর।

দেশের উপকূলের মানুষের পানির কষ্ট দিন দিন বাড়ছে। শুধু উপকূলই নয়, দেশের যেকোনো প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম এলাকায় পানির কষ্ট আছে। আরও সঠিক করে বললে বলতে হয়, সেই কষ্ট আসলে নারীদের বেশি। প্রাকৃতিক দিক দিয়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কষ্ট। পানির জন্য নারীর এই অবদানকে মাথায় রেখেই এবারের বিশ্ব পানি দিবস পালিত হচ্ছে ‘পানি ও লিঙ্গসমতা’—এই ধারণার ওপর। এ থিমের মূল প্রতিপাদ্য ‘পানি প্রবাহিত হলে সমতা বৃদ্ধি পায়’। মূলত নারী ও কন্যাদের নেতৃত্ব, উচ্চকিত কণ্ঠস্বর, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও অধিকারের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে এই থিম সামনে রেখে, যা পানির সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কাপড় টেনে শরীরের ক্ষত আর লুকাতে হয় না কোহিনূরের 

এ প্রতিবেদনের শুরুটা হয়েছিল কোহিনূর আক্তারের কষ্টের গল্প দিয়ে। শুধু জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে ভেসে আসা অনিশ্চয়তায় নয়, চোখের লোনাজল মুছে এক নতুন জীবনের গল্পও আছে কোহিনূরের জীবনে। শত বছর ধরে পুকুরের পানি সংরক্ষণ করে নিরাপদ খাওয়ার পানি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন উপকূলের মানুষ। খুব সহজেই দূষণের শিকার হওয়া এই পুকুরের পানি নানারকম পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও জনস্বাস্থ্যের প্রতি হুমকির এক জলাধার। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর দূষণ অনেক বাড়ে। ঠিক এমন পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন কোহিনূর আক্তার।

কোহিনূরের যন্ত্রণার অবসান ঘটে যখন এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ পরিচালিত পানি শোধনাগার প্ল্যান্ট চালু হয়। তিনি ও তাঁর মতো ভুক্তভোগী নারীরা এখন স্মার্ট এটিএম কার্ডের মাধ্যমে প্ল্যান্টের কাছে অবস্থিত ওয়াটার এটিএম বুথ থেকে পানি সংগ্রহ করেন। যাঁরা অপেক্ষাকৃত দূরে বসবাস করেন, তাঁরা জারের মাধ্যমে পানি নিতে পারেন এবং রয়েছে ‘হোম ডেলিভারি’র ব্যবস্থা। ভ্যানগাড়ির মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরাসরি গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। কোহিনূরের চোখে এখন নতুন আলো, চোখের লোনাজল শুকিয়ে স্বস্তির ঝিলিক। কোহিনূর বলছিলেন, ‘আমি আর কাপড় টেনে শরীরের ক্ষত লুকাই না। এনজিও ফোরাম শুধু পানি দেয়নি, আমাদের স্বাস্থ্য আর মর্যাদাও ফিরিয়ে দিয়েছে।’

এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ টেকনাফ ও কুতুবদিয়া উপকূলীয় অঞ্চলে খাওয়ার পানির তীব্র সংকট মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। আর এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছে দাতা সংস্থা ইউনিসেফ। পানি শোধনাগারে ভূ-উপরিস্থ খালের মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি সাত ধাপের অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধন করে পানযোগ্য ও বিশুদ্ধ নিরাপদ পানিতে রূপান্তর করা হয়।

ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্ল্যান্ট
ছবি: এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের সৌজন্যে

নিশিদের কষ্ট লাঘব

টেকনাফের দমদমিয়ার ১৪ বছরের কিশোরী নিশির গল্পটাও বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়, উপকূলজুড়ে এমন হাজারো নিশিকে স্কুল শেষে মাথায় পানির কলসি নিয়ে হাঁটতে হতো সরু ও অনিরাপদ পথে দূরের পুকুরের পানি আনতে। নিশি বলছিল, ‘অনেক সময় একাই হাঁটতে হতো, মেয়েদের উত্ত্যক্তও করা হতো। এসব খুব কষ্টের স্মৃতি।’ 

নিশিদের বাড়ির দরজায় এখন সরবরাহের ভ্যান বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিচ্ছে। নিশির কথা, ‘এখন আর কলসি নিয়ে হাঁটতে হয় না, স্কুল শেষে বিশ্রাম করি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করি। এনজিও ফোরাম আমার সময়, আত্মবিশ্বাস আর বন্ধুদের ফিরিয়ে দিয়েছে।’

নিরাপদ পানি প্রাপ্তি সহজ হওয়ায় মেয়েদের মিনস্ট্রুয়াল হাইজিন (মাসিক) ব্যবস্থাপনাও স্বাস্থ্যকর ও উন্নত হয়েছে। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বেড়েছে এবং তারা তাদের মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে।

উপকূলের মানুষের কষ্ট লাঘব করতে এনজিও ফোরাম যে পানির শোধনাগার প্ল্যান্ট করেছে, সেখান থেকে নামমাত্র মূল্যে এই পানি সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় লোকজন ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে অন্যান্য সেবার প্রচলিত মূল্যের চেয়ে কম ধরে ১০০ টাকার এটিএম কার্ড দিয়ে ৬৫০ লিটার পানি বুথ থেকে সংগ্রহ করা যায়। হোম ডেলিভারির ক্ষেত্রে ৪৫০ টাকা দিয়ে একটি ট্যাপ ডিসপেন্সার ও ২০ লিটার পানির জার সরবরাহ করা হয়। জার শেষ হলে ১২ টাকায় তা আবার ভর্তি করা যায়। মূলত পরিবহন খরচের জন্যই হোম ডেলিভারিতে দামের একটু তারতম্য হয়।

পানির জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার 

টেকনাফ ও কুতুবদিয়ায় টেকসই ও সৌরশক্তিচালিত জলবায়ুবান্ধব পানি শোধনাগার প্ল্যান্ট ও এটিএম কার্ড সেবার গ্রাহকসংখ্যা বর্তমানে ৩১ হাজার। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্ল্যান্টগুলো এমনভাবে স্থাপিত হয়েছে, যাতে তা বন্যার পানিতে, ঘূর্ণিঝড় ও জোয়ারের সময়েও ডুবে না যায় এবং পানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। প্রতিটি প্ল্যান্টে স্থানীয় ও প্রশিক্ষিত অপারেটর দায়িত্ব পালন করছেন, যা সঠিক ব্যবস্থাপনা ও স্থায়িত্বশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখছে।

নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩২ শতাংশ হচ্ছে উপকূলীয় এলাকা। উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততার প্রকোপ, আর্সেনিক, ভূ-উপরিস্থিত পানির উৎসগুলোয় দূষণ, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহনসংকট—সবকিছু মিলিয়েই সমস্যার গভীরতা অনেক। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৬ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ‘সবার জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার। উপকূলীয় এলাকায় এ লক্ষ্য অর্জন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।’

এসডিজি–৬–এর লক্ষ্য পূরণের প্রচেষ্টা

এসডিজি-৬ পানি ও স্যানিটেশন খাতে কেবল প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত লক্ষ্য অর্জন নয়, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, লিঙ্গসমতা ও মানবিক মর্যাদা বৃদ্ধির কথাও বলে। উপকূলীয় এলাকায় নারীদের পানি ও জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মর্যাদা নিশ্চিত করতেই হবে। পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত হলে নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অগ্রগতি ও নেতৃত্বের পথ সুগম হয়। এবারের পানি দিবসের মূলভাব সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। 

লেখক: পরিচালক, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড রিসোর্স মবিলাইজেশন, এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ।