তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান

বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের বাসভবনে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে প্রবাসী বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে উন্মুক্ত বিনিয়োগ প্রস্তাব আহ্বান করেছে সেখানকার বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কাজী মোহাম্মদ জাবেদ ইকবালের বাসভবনে আয়োজিত এক অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এ সময় তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), জ্বালানি, ডেটা সার্ভিস, হসপিটালিটি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য বিকাশমান খাতে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রবাসীদের সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।

কনসাল জেনারেল জাবেদ ইকবাল বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য কনস্যুলেট সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য, দিকনির্দেশনা, সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় এবং সম্ভাবনাময় খাত নির্ধারণে কনস্যুলেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কনসাল জেনারেল বলেন, বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রবাসীদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কনস্যুলেটের দরজা সব সময় উন্মুক্ত। যে কেউ তাঁদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন।

সভায় অংশগ্রহণকারী প্রবাসী উদ্যোক্তারা বলেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে বিনিয়োগ-পরবর্তী অনুমোদন, জমি বরাদ্দ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংযোগ, কর সুবিধা ও মুনাফা ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। এ কারণে তারা বিডার সেবা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়
ছবি: প্রথম আলো

ডেটা সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব

সভায় উদ্যোক্তা হাসিবুল শরীফ বলেন, সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো সরকার এখন প্রবাসীদের কথা শুনছে। সম্প্রতি তিনি ডেটা সেন্টার স্থাপনের একটি প্রস্তাব দেন এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই জবাব পান। পরে কনস্যুলেট থেকে তাঁকে জানানো হয়, বাংলাদেশে এ ধরনের বিনিয়োগ উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে এবং কী কী সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে চান বলে জানান তিনি।

হাসিবুল শরীফ পরে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে এআই-ভিত্তিক (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক) ডেটা সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহব্যবস্থার মানোন্নয়ন সম্ভব। এটি একটি বড় প্রকল্প, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। তাঁর মতে, এ ধরনের এআই ডেটা সেন্টার বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, এআই এখন ভবিষ্যৎ নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা। নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেট এবং ২০০০-এর দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেভাবে জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে, এআই প্রযুক্তিও তেমনি আগামী দিনে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সময়মতো এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।

বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে নাসির খান বলেন, সরকার প্রবাসীদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করে এবং এনআরবি (প্রবাসী বাংলাদেশি) হিসেবে তাঁরা কী ধরনের সুবিধা পেতে পারেন, এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা চান। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ হলে আরও বেশি প্রবাসী উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন।

সভায় মোহাম্মদ বাসিত বলেন, তিনি বাংলাদেশে এনার্জি (জ্বালানি) ও হসপিটালিটি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। এসব খাতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স–প্রক্রিয়া স্বল্প সময়ে বা নির্ধারিত ফির মাধ্যমে সহজভাবে সম্পন্ন করা গেলে বিনিয়োগ আরও বাড়বে। কোনো বিনিয়োগকারী সমস্যায় পড়লে কনস্যুলেট দ্রুত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মত দেন।

এ সময় ওয়াহিদুর রহমান জানান, লাস ভেগাসে অনুষ্ঠেয় বাণিজ্য মেলায় অংশ নিতে এখানকার ব্যবসায়ীরা আগ্রহী। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ থেকে প্লাস্টিক ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।

বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ হলে আরও বেশি প্রবাসী উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন বলে সভায় মত দেওয়া হয়
ছবি: প্রথম আলো

সৈয়দ নাসির উদ্দিন জেবুল দেশে বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট বিবেচনায় নিয়ে প্রবাসী উদ্যোক্তাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্যবসায়ীদের অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে তিনি আরও খোঁজখবর নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন প্রথম আলোকে বলেন, বিডা পুনর্গঠনের পর প্রবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা একটি ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। এনআরবি বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন, সমস্যা ও প্রক্রিয়াগত চাহিদা দেশীয় বিনিয়োগকারীদের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় এই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একজন নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই ডেস্কে এনআরবি বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘এন্ড-টু-এন্ড সাপোর্ট’ নিশ্চিত করছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিডা সহায়তা দিয়েছে এবং একাধিক সফল বিনিয়োগ উদ্যোগের উদাহরণও রয়েছে।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বিডার লক্ষ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগকে আরও সহজ, দ্রুত ও ফলপ্রসূ করা। প্রবাসীরা শুধু আর্থিক সক্ষমতাই নয়, বরং বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উচ্চমানের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছেন, যা দেশের অনেক খাতে এখনো যথেষ্টভাবে বিকশিত হয়নি। এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আশিক চৌধুরী উদাহরণ হিসেবে লন্ডনের একজন প্রবাসী বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীর কথা উল্লেখ করেন, যিনি নিউরোসাইকোলজিস্ট হিসেবে ব্র্যাকের সঙ্গে এবং এনআরবি ফান্ডের অর্থায়নে বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আরও বলেন, এনআরবি বিনিয়োগকারীরা তাঁদের নিজ নিজ দক্ষতা ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র অনুযায়ী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানভিত্তিক বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে তাঁরা সরাসরি বিডার সঙ্গে অথবা কনস্যুলেটের মাধ্যমেও তাঁদের বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিতে পারেন।

মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিএনপির সভাপতি বদরুল আলম চৌধুরী (শিপলু), মিখায়েল খান, আসিফ ইকবাল, মনিরুল ইসলাম, খালিদ খুদা, সৈয়দ হাসান ফেরদৌস, ফিরোজ ফখরী, মোয়াজ্জেম চৌধুরী প্রমুখ।