বিশ্বে সমুদ্রপথে সার পরিবহনের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ হয় ওমান উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রণালিটি প্রায় বন্ধ। এতে সারের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। এ পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, জুন পর্যন্ত সারের মজুত আছে। তবে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সার আমদানির জন্য নতুন উৎস খোঁজা হচ্ছে।
এর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে তিনটি নতুন উৎস থেকে সার আমদানির বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে অনুরোধ করেছে। গত ১৬ মার্চ দেওয়া ওই চিঠির পর মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও ভিয়েতনামে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। ইতিবাচক সাড়া পেলে এই তিন দেশ থেকে সার আমদানি করা হবে। তবে কী পরিমাণ আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য দেয়নি শিল্প মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয় ব্রাজিল ও চীন থেকে সার আনার বিষয়ে যোগাযোগ শুরু করেছে।
কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মজুত এ অর্থবছর পর্যন্ত পর্যাপ্ত আছে।’ এর পাশপাশি বিকল্প উৎস খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেখান থেকে আনতে দাম কম পড়বে, সেখান থেকে আনা হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সার আমদানি করে থাকে। বিসিআইসি আমদানি করে ইউরিয়া সার। বিএডিসি করে নন–ইউরিয়া সার, যেমন টিএসপি, এমওপি এবং ডিএপি সার।
বর্তমান মজুত দিয়ে এখন সংকট না হলেও সার আমদানি না হলে প্রভাব পড়বে আমন উৎপাদনে। আমন দেশের দ্বিতীয় প্রধান ধানের মৌসুম। এবার আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮১ লাখ মেট্রিক টন। জুলাই–আগস্ট থেকে আমনের বীজতলা প্রস্তুতের কাজ শুরু হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার ৬০ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হবে।
বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, টিএসপির মজুত আছে বর্তমানে ৩ লাখ ২২ হাজার টন, ডিএপির মজুত ৪ লাখ ৩৭ হাজার টন এবং এমওপির মজুত রয়েছে ৩ লাখ ১৮ হাজার টন।
আমদানি–মজুত পরিস্থিতি
বিসিআইসি বলছে, দেশে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ২৬ লাখ টন। চলতি অর্থবছরে (২০২৫–২৬) এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৮ টন। বর্তমানে মজুত আছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন। ৪ লাখ টন মজুতকে নিরাপদ ধরা হয়।
এর বাইরে আরও দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের আহ্বান করেছে বিসিআইসি। সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সঙ্গে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ভিত্তিতে আরও তিন লাখ টন ইউরিয়া আনার বিষয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। তবে তা আসা নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের নথি বলছে, এ বছরের মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত ইউরিয়া সারের চাহিদা ৪ লাখ ২৪ হাজার ২১৩ টন, টিএসপির চাহিদা ১০ লাখ ৭৭ হাজার, ডিএপি ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৩৪ টন এবং এমওপির চাহিদা ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ টন।
বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, টিএসপির মজুত আছে বর্তমানে ৩ লাখ ২২ হাজার টন, ডিএপির মজুত ৪ লাখ ৩৭ হাজার টন এবং এমওপির মজুত রয়েছে ৩ লাখ ১৮ হাজার টন।
সব বাজারের গাণিতিক বিশ্লেষণগুলো হচ্ছে। যে উৎস সাশ্রয় হবে, আমাদের জন্য সেখান থেকে সার আনব।
ডিএপি আমদানি হয় সৌদি আরব, মরক্কো ও চীন থেকে। টিএসপি আসে মরক্কো ও তিউনিশিয়া থেকে। এমওপি আনা হয় রাশিয়া ও কানাডা থেকে।
কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, হরমুজ প্রণালি বাদ দিয়ে অন্য কোন পথে সার আনা যায়, সেটা নিয়ে কাজ চলছে। এর মধ্যে মন্ত্রীর উদ্যোগে চীনের সার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। পণ্যমূল্য আর পরিবহন—এ দুটো মিলে সারের দাম কম পড়বে, এমন উৎস থেকে সার আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উদাহরণ দিয়ে কৃষিসচিব বলেন, ‘যেমন ব্রাজিলের সার আছে। দাম কম, কিন্তু পরিবহন খরচ বেশি। আনতে গেলে সবমিলে খরচ বেশি পড়বে। সব বাজারের গাণিতিক বিশ্লেষণগুলো হচ্ছে। যে উৎস সাশ্রয় হবে, আমাদের জন্য সেখান থেকে সার আনব।’
উৎপাদন পরিস্থিতি
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আমদানি পর্যাপ্ত থাকলেও দেশীয় উৎপাদনে পিছিয়ে গেছে বিসিআইসি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সার কারখানাগুলোয় উৎপাদিত হয়েছিল ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৭৯১ টন। চলতি অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৮২ হাজার ৫২২ টন।
কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘আমরা নরসিংদীর ঘোড়াশাল–পলাশ ইউরিয়া সার কারখানাটি চালু করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল (গ্যাসের সরবরাহ) নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’
বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদী জেলার এ সার কারখানার প্রতিদিন উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৮০০ টন। এ কারখানার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৯ লাখ ২৪ হাজার টন। দেশে সার কারখানা আছে সাতটি। এর মধ্যে ছয়টি কারখানায় উৎপাদন করা হয় ইউরিয়া সার। অন্যটি টিএসপি সার উৎপাদন করে। তবে গ্যাসসংকটে গত অর্থবছরে প্রায় প্রতিটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়।
বাড়ছে দাম
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কেন্দ্র করে বিশ্বে সারের দাম বেড়েই চলেছে। বিসিআইসি এ বছরের জানুয়ারিতে ইউরিয়া কিনেছিল প্রতি টন ৪০০ থেকে ৪৫০ মার্কিন ডলারে। এ বছরের মার্চে প্রতি টনে মূল্য দাঁড়ায় ৭১৭ মার্কিন ডলার। বিএডিসি বলছে, এ বছরের জানুয়ারিতে ডিএপি সারে টনে দাম পড়েছিল ৬৫১ ডলার। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৮০০ ডলারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা গত মার্চ এক প্রতিবেদনে বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে ইউরিয়া সারের দাম ১৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সংঘাত অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও আফ্রিকার দেশগুলো সারের সরবরাহ সংকটে পড়বে। এতে ফসল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে। তাতে বেড়ে যাবে খাদ্যদ্রব্যের দাম।
বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, সার আমদানি থেকে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সময় লাগে কমপক্ষে ১৮০ দিন বা ৬ মাস। সেটি মাথায় রেখে এখন থেকে সার আমদানির নতুন উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে, যাতে অক্টোবর থেকে বোরো মৌসুম শুরু হলে কৃষককে সারের সংকটের মুখে পড়তে না হয়।