নবনির্বাচিত সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমন প্রতিশ্রুতি অতীতেও শোনা গেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এবার কি তার ব্যতিক্রম ঘটবে—এই প্রশ্নই এখন আলোচনায়।
শিক্ষা খাতের দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ১২ দফার একটি প্রাথমিক কার্যসূচি ঘোষণা করেছেন। সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারের কয়েকটি অঙ্গীকার এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কার্যসূচিতে শিক্ষার বাজেট বাড়ানো, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার জোরদার করা (ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব), বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, শিক্ষাক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতি পর্যালোচনা, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার গুরুত্ব এবং সব ধরনের বিদ্যালয়ে ন্যূনতম শিখনমান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তব্যে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দুর্নীতি দূর করা, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এবং কারিগরি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেছেন।
দুই.
সম্প্রতি গণসাক্ষরতা অভিযান ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইআইডির উদ্যোগে শিক্ষা বিষয়ে দুটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে একটিতে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।
গণসাক্ষরতা অভিযানের আলোচনায় ১২ দফা কার্যসূচিকে স্বাগত জানিয়ে কয়েকটি অতিরিক্ত প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত শিক্ষা বাজেট যেন বিশেষভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয় হয়, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা, বিদ্যালয়ে মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি (মিড ডে মিল) সম্প্রসারণ এবং একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন প্রণয়ন। পাশাপাশি শিক্ষায় অর্থায়নের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো একটি শিক্ষা কর বা এডুকেশন সেল চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে গণসাক্ষরতা অভিযান ও সহযোগী সংগঠনগুলো সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলেও জানায়।
আইআইডির গোলটেবিল বৈঠকে গবেষক ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের শিক্ষাবিদেরা অংশ নেন। আলোচনায় বলা হয়, শিক্ষাব্যবস্থার সব উদ্যোগের ফল শেষ পর্যন্ত প্রতিফলিত হওয়া উচিত শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতায়; কিন্তু বাস্তবে সেখানেই বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্রমেই কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এর পরিণতিতে অনেক শিশুই পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। হতদরিদ্র, আদিবাসী ও বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন শিশুদের অবহেলার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা শিক্ষায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিন.
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী তাঁদের প্রাথমিক কার্যসূচির কথা বলেছেন। গণসাক্ষরতা অভিযান, আইআইডি ও অন্য অংশীজনেরা নিজেদের প্রত্যাশা ও দাবি তুলে ধরেছেন। তবে আলোচনায় মূলত সাধারণ বিদ্যালয় শিক্ষার বিষয়ই এসেছে। অথচ উচ্চশিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক ও জীবনব্যাপী শিক্ষাসহ আরও অনেক উপখাত রয়েছে, যেগুলোও নানা সমস্যায় জর্জরিত এবং প্রত্যাশা ও দাবিতে ভরপুর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, পরিবর্তনের সূচনা কোথা থেকে এবং কীভাবে হবে।
অতীতে শিক্ষার উন্নয়নে বহু লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। কেন তা হয়নি, সেই বাধাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার পথ খুঁজতে হবে। খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন সংস্কারের তালিকা দিয়ে শিক্ষার মতো জটিল খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। প্রয়োজন সুস্পষ্ট কৌশল, কার্যপদ্ধতি, দায়িত্ব বণ্টন, জবাবদিহি ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা। এর জন্য সমীক্ষা, পর্যালোচনা ও সুবিবেচনার ভিত্তিতে দক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি প্রশ্ন থেকেই যায়, বর্তমান গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এই পরিবর্তন আনার সক্ষমতা ও আগ্রহ কতটা রয়েছে।
চার.
সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্ত বড় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বড় শহরের বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি নিয়ে শিশু ও অভিভাবকদের দুর্ভোগ ও উদ্বেগ চলে আসছে বহুদিন থেকে। পছন্দের বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বহু অর্থ ব্যয়ে প্রাইভেট কোচিং, ভর্তি-বাণিজ্য এবং শিশুদের চাপ ও উদ্বেগ অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। বৈষম্য ও শিশু-অভিভাবকদের দুর্ভাবনার অন্তত আংশিক সমাধান হিসেবে ২০১১ সালে প্রথম শ্রেণিতে এবং ২০২১ সাল থেকে অন্য শ্রেণিতেও ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে কিছু শর্তসাপেক্ষে লটারিপ্রথা চালু হয়। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৭ সাল থেকে লটারি প্রথা বাতিল করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করে ভর্তি করা হবে।
তাহলে অপেক্ষাকৃত কম মেধার শিশুদের প্রতি কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেই? লটারি প্রথা বাতিল করলে বিদ্যালয় শিক্ষার মান কীভাবে বাড়বে, সেটা বোধগম্য নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে, প্রতিটি এলাকায় মানসম্মত বিদ্যালয়ের অভাব। এত দিন সেই সমস্যার সমাধান করা হয়নি। এখনো কি সেই ধারায় চলবে?
পাঁচ.
অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টাদের উদ্যোগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সংস্কারের জন্য দুটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির দুটি প্রতিবেদনে বিদ্যালয় শিক্ষার প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হয়তো চূড়ান্ত সমাধান নয়, তবে এই বিশ্লেষণ ও সুপারিশগুলো কাজে লাগানো জরুরি।
প্রতিবেদন দুটিতে অতীতে সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রচলিত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর হাতে সংস্কারের দায়িত্ব থাকলে কার্যকর পরিবর্তন কঠিন। তাই সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সংস্কার টাস্কফোর্স গঠন প্রয়োজন।
প্রধান উপখাতগুলোর জন্য আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। বিদ্যালয় শিক্ষার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স প্রয়োজন, পাশাপাশি সম্পূর্ণ শিক্ষা খাতের জন্য একটি সমন্বিত পরিষদ থাকতে পারে। এই পরিষদের দায়িত্ব হতে পারে পাঁচ বছরের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা ও ১০ বছরের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়নে নেতৃত্ব দেওয়া। শিক্ষা সংস্কারে কার্যকর সূচনা করতে এমন উদ্যোগই হতে পারে প্রথম জরুরি পদক্ষেপ।
* মতামত লেখকের নিজস্ব