গত কয়েক দশক ধরে মানুষের জীবনযাত্রায় দ্রুতই ডিজিটাল রূপান্তর ঘটছে, যার প্রভাব পড়ছে সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও। ডিজিটাল প্রযুক্তির গতি-প্রকৃতি বোঝা যায়, এমন সব পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত অন্তত সে কথাই বলছে। ২০২৩ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট সচল মোবাইল ফোনের সংখ্যা ১৭ কোটি ৯৯ লাখ। এর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে ৬ কোটি ৬৯ লাখের বেশি। ইন্টারনেট ব্যবহারের হার থেকে দেখা যায়, দেশের জনসংখ্যার ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষই এ সুবিধা গ্রহণ করছেন। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার কারণে দেশের ২৬ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন। এর মানে দেশে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়মিত ব্যবহার করছেন এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৪৭ লাখের বেশি। ওপরে উল্লেখ করা এসব তথ্য–উপাত্ত থেকে খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে দেশের একটা বড় অংশের মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আরও বেশি প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও ডিজিটাল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে যোগাযোগসহ নানান কারণে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এই প্রয়োজন অস্বীকার করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আর সমাজের অংশ হিসেবে ডিজিটাল প্রযুক্তির সব ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএন উইমেন বাংলাদেশ পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২১ দশমিক ২৫ শতাংশই নারী। পাশাপাশি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ডিজিটাল বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারী উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য ও সেবা নিয়ে অনলাইনে হাজির থাকছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনে নারীর ভূমিকা বাড়ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীর অংশগ্রহণ একদিকে যেমন বাড়ছে, তেমনি অনলাইনে নারীদের প্রতি হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকিও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা-বিদ্বেষ, সহিংসতা ও হয়রানির সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে নারী। বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত একটি সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, ২০২১ সালে সংগঠিত সাইবারক্রাইমের ৭০ শতাংশ ভুক্তভোগীই নারী। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা ৬৪ জন নারীই জীবনের কোনো না কোনো সময় অনলাইনে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে আবার যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন ৮০ ভাগের বেশি নারী। এ ছাড়া অশ্লীল ছবি বা অনৈতিক প্রস্তাবের বার্তা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে ৫৩ ভাগের বেশি নারীকে। এভাবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান উপায়ে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারীরা। এ যেন দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার উল্টোচিত্র।
ওপরের উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নারীর জন্য অনিরাপদ জায়গায় পরিণত হয়েছে। এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হলে সমাজ, অর্থনীতি, ডিজিটাল অগ্রযাত্রাসহ দেশের উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে। নারীদের অনলাইনে অনিরাপদ রেখে অগ্রগতির কোনো লক্ষ্য পূরণ করাই সম্ভব নয়। এ কারণে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা দরকার। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোয় নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির উপায় কী হতে পারে, অনলাইনে নারীর প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিরাপদ রাখার মধ্য দিয়ে কীভাবে তাদের হয়রানি ও সহিংসতা থেকে মুক্ত রাখা যায় এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় কীভাবে তাদের ভূমিকা আরও বৃদ্ধি করা যায়—এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে।
নারীর জন্য নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও এর ব্যবহারকারী দুই পক্ষেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। বেশ কিছু সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ইতিমধ্যে নারীর জন্য নিরাপদ অনলাইন স্পেস তৈরিতে কাজ শুরু করেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তা ও প্রাইভেসির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বেশ কিছু ফিচার নিয়ে এসেছে। তবে এ ধরনের কয়েকটি ফিচারই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নারীর প্রতি হওয়া হয়রানি বা সহিংসতা প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়।
অনলাইনে নারীদের নিরাপদ রাখতে হলে ডিজিটাল স্বাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। ডিজিটাল স্বাক্ষরতা ও সচেতনতা তৈরি করতে হলে দেশের সরকার ও ডিজিটাল ক্ষেত্রগুলোয় অবদান রাখতে চায় এমন অংশীদারদের ভূমিকা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার–প্রচারণা চালাতে হবে। অন্তত সবাই যেন এটা জানতে পারে, অনলাইন বা অফলাইন যেখানেই নারীর প্রতি হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটুক না কেন, সেটা অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে। লক্ষণীয় হলো, প্রচলিত আইনি কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এর একটি উদাহরণ। অভিযোগ উঠেছে, এই আইনটি সত্যিকারের ভুক্তভোগীকে নিরাপত্তা বা সুরক্ষা দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে। আইনি কাঠামোর এসব অসংগতি যত দ্রুত সম্ভব দূর করতে হবে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন—সবকিছুরই ভালো–মন্দ দুটি দিক রয়েছে। আজকের যুগে আমরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছি, এখন এগুলো ছাড়া আমাদের পক্ষে জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। যেহেতু পিছিয়ে যাওয়ার সময় আর নেই, তাই ভয়ভীতি কাটিয়ে অনলাইনেও নারীর সফল পদচারণ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ ডিজিটাল স্পেস একজন নারীকেও সুদক্ষ ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ইশরাত হাসান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী