সভাপতির বক্তব্যে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি ও নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘বৈষম্য বেড়েছে, তা–ই সংকটও বড়। এ সরকার ব্যবসাবান্ধব সরকার। সবকিছুই তাদের চাপের মুখে হচ্ছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের শেষ আশ্রয় ছিল, সেগুলো সরকারমুখী হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের ওপর নির্ভরশীল, সরকার যা চায়, সেভাবেই কাজ করে। প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে আজ অবস্থা খারাপ হতো না।’

ধনী এগোচ্ছে খরগোশের গতিতে আর গরিব এগোচ্ছে শামুকের গতিতে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে এম এম আকাশ বলেন, বাংলাদেশে অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ দশমিক ৪।

সমাজের প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানিয়ে রামেন্দু মজুমদার বলেন, তাঁদের এই সংগঠন মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব পালন করবে ও ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করবে।

গত ৫০ বছরে যতটুকু উন্নয়ন ঘটেছে তার স্বীকৃতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তবে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা বৈষম্য আরও বাড়িয়েছে। বৈষম্য বেশি হলে সমাজে চাহিদা কম তৈরি হয়। তখন উৎপাদন ও বিনিয়োগ কমে যায়। বৈষম্য কমাতে হবে।

প্রধান বিরোধী ও সরকারি দুই দলই দেশে অনুদার গণতন্ত্র চালাতে ইচ্ছুক। মানুষ একজনের কর্তৃত্ব অস্বীকার করলে আরেকজনের কর্তৃত্ব আসবে। এখানে সংসদ সদস্য পদের জন্য, উচ্চপদের জন্য কাকে মনোনীত করা হবে—সব নির্ধারিত হচ্ছে অগণতান্ত্রিকভাবে।
এম এম আকাশ, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, দেশের অর্জন ধরে রাখতে হবে এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সামাজিক আন্দোলনে তরুণদের যুক্ত করতে হবে। সম্ভাবনার জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।

আলোচনা চক্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ ‘নির্বাচন–পূর্ব বাংলাদেশ: রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিধারা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়, দেশের ভেতরের শোষণ–বৈষম্য–নির্যাতন থেকে জনগণকে মুক্ত করতে হবে। মানুষকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে হবে। আত্মশক্তি, উন্নয়ন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য নিরসনে সবকিছু কীভাবে সুষমভাবে অর্জন করা যাবে, সে পথ খুঁজে বের করতে হবে।

বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে এম এম আকাশ বলেন, দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল সব মানুষ সুষমভাবে পাচ্ছে না। ধনী–গরিবের মধ্যে আয়–সম্পদ–শিক্ষা–চিকিৎসা বৈষম্য দৃষ্টিকটুভাবে বাড়ছে। বাজার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। রাষ্ট্র তাদেরই সেবা করছে। ভবিষ্যতে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা বৈষম্যহীন এবং টেকসই না–ও হতে পারে।

বর্তমান উন্নয়নধারায় গরিবের একেবারে কিছুই হচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন এম এম আকাশ। তিনি বলেন, ধনী এগোচ্ছে খরগোশের গতিতে আর গরিব এগোচ্ছে শামুকের গতিতে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ দশমিক ৪।

এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, নানা উন্নতির পরও বাংলাদেশের মানুষ অসন্তুষ্ট। কারণ, সমতা ও সুশাসনের অভাব। যে উন্নয়ন হচ্ছে, তা বণ্টন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দিক থেকে আদর্শ উন্নয়ন বলা যাবে না।

প্রধান বিরোধী দল বা সরকারি দল উভয়ই কর্তৃত্বপরায়ণ বলে মন্তব্য করেন এম এম আকাশ। বলেন, ‘দুই দলই দেশে অনুদার গণতন্ত্র চালাতে ইচ্ছুক। মানুষ একজনের কর্তৃত্ব অস্বীকার করলে আরেকজনের কর্তৃত্ব আসবে। এখানে সংসদ সদস্য পদের জন্য, উচ্চপদের জন্য কাকে মনোনীত করা হবে—সব নির্ধারিত হচ্ছে অগণতান্ত্রিকভাবে, তা হচ্ছে কখনো টাকাপয়সা ও স্বজনপ্রীতি এবং সচরাচর শীর্ষ কর্তৃত্বের মাধ্যমে। এখানে কালোটাকা সিস্টেম (রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা) ও ক্ষমতার অংশ হয়ে গেছে।’

কল্যাণ অর্থনীতির জন্য নতুন রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং সুশাসন ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক এম এম আকাশ।

এদিকে আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন মানেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন না। উন্নয়ন বলতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বোঝায়। জবাবদিহিহীনতা দেশের মূল সংকট বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় আলোচনা চক্রে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক শফি আহমেদ, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) খুলনা শাখার সভাপতি শেখ বাহারুল আলম, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ।