‘চা’কে কেবল কৃষিপণ্য হিসেবে গণ্য করার সুপারিশ আত্মঘাতী: হোসেন জিল্লুর রহমান
চা খাত নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত টাস্কফোর্সের সুপারিশে একে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সমালোচনা করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি এই সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবগুলো বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে বড় ধরনের স্ববিরোধিতা। এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
‘চা–শিল্পের পুনর্গঠন ও চা–শ্রমিকদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব’ বিষয়ে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় এ কথা বলেন খ্যাতনামা এই অর্থনীতিবিদ। আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এ পরামর্শ সভা হয়। এ সভার আয়োজক ছিল পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি), সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) ও ব্রাত্যজন রিসোর্স সেন্টার (বিআরসি)।
গত জুলাই মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্স ১০টি সুপারিশ দেয়। এর মধ্যে ‘চা’কে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করে চা–বাগানগুলো যাতে কম সুদে ঋণ পায়, তার ব্যবস্থা করা, ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা ইত্যাদি সুপারিশ রয়েছে।
আজ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, চা–শিল্পের সমস্যা কেবল বাণিজ্যিক সংকটের নয়, এখানে উৎপাদনশীলতারও বড় ঘাটতি রয়েছে। সব কোম্পানি এক নয়—কেউ উৎপাদনশীল ও শ্রমিকবান্ধব, আবার কেউ চরম অব্যবস্থাপনায় চলছে। তাই সবাইকে এক পাল্লায় না মেপে মূল আলোচনাটা হওয়া উচিত পুরো খাতের টেকসই বিকাশ নিয়ে।
চা মূলত কৃষি ও শিল্পের এক মিলিত রূপ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ‘টি ইন্ডাস্ট্রি ইন বাংলাদেশ: আ ভায়াবিলিটি স্টাডি শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক খাত’ বা ‘কৃষি-শিল্প খাত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর মাধ্যমে চা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত দুই ধরনের কাজের মিশ্রণকে তুলে ধরা হয়। ব্যাংকের ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের ‘কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা’ অনুযায়ী, চা উৎপাদন দুটি ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ কৃষি এবং ৪০ শতাংশ শিল্প।
এসব বিষয় উল্লেখ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান প্রস্তাবে সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এসব সুপারিশের স্ববিরোধিতা স্পষ্ট। সরকার সংস্কারের কথা বলছে। অথচ সংকীর্ণ স্বার্থে চা–এর পরিচয় বদলের চেষ্টা চলছে। খাতের টেকসই সংস্কারের বদলে সস্তা সুবিধার জন্য একে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সরকার যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কথা বলছে, সেখানে এই পরিকল্পনায় চা–শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও জীবনমান পুরোপুরি উপেক্ষিত।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান রাজস্ব সংকটের সময়ে মালিকদের নিজস্ব দায়—যেমন বাগানের স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের খরচ সরকারের কাঁধে চাপানোর পাঁয়তারা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি উপেক্ষা করে চা খাতের সংস্কারে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটিতে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের বদলে বিদেশি পরামর্শকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অত্যন্ত হতাশাজনক। মনে রাখতে হবে, চা কেবল একটি অর্থকরী ফসল নয়; এর একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত (হেরিটেজ) মূল্য রয়েছে। সেই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে তড়িঘড়ি করে খাতের চরিত্র পরিবর্তনের যেকোনো সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হবে।
পরামর্শ সভায় ‘বাংলাদেশের চা–শিল্প পুনর্গঠন: চা–শ্রমিকের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনাপত্র বা অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন সেড-এর পরিচালক ফিলিপ গাইন। পরামর্শ সভার পটভূমি ও আলোচনাপত্র উপস্থাপনের সময় তিনি বলেন, সরকার চা–শিল্প পুনর্গঠনে যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তার মধ্যে চা–শ্রমিক বা তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রেড ইউনিয়নের কোনো প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যে টাস্কফোর্স এবং পরবর্তী সময়ে যে মনিটরিং ও এডভাইজরি কমিটি গঠন করেছে, তার মধ্যে সরকারের বাইরে কেবল চা–বাগানমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশি চা সংসদের প্রতিনিধি আছে।
ফিলিপ গাইন বলেন, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬০টি চা–বাগানের মধ্যে ৭০-এর অধিক চা–বাগান দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহির সমস্যা, দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, কারখানা চালানোর অদক্ষতা ইত্যাদি কারণে লোকসানে চলে এবং মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকে। এ জন্য অনেক সময় শ্রমিকের বেতন পরিশোধে অনিয়ম দেখা যায়।
সেড-এর চেয়ারপারসন এবং নিজেরা করি–এর সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন চা–শিল্পকে অন্য শিল্পের মতো চিন্তা করার সুযোগ নেই। কারণ, চা–শ্রমিকেরা চা–বাগানের ভেতরেই থাকেন। এই শিল্প নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে চা–শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।
টাস্কফোর্স কমিটিকে ‘বণিকতান্ত্রিক’ কমিটি হিসেবে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিমউদ্দিন খান প্রশ্ন করেন, ‘কমিটির বেশির ভাগ সদস্য কোন বিবেচনায় নির্বাচিত হলো? বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিত।’
টাস্কফোর্সে শ্রমিক প্রতিনিধি বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি নেই, টাস্কফোর্সের গঠন নিয়ে এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি আরও বলেন, ‘চা–শ্রমিকের মতো ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর বেলায় জমির মালিকানার মতো মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করে চা–শিল্পের যে পুনর্গঠন, তা মানা যায় না।’
চা–শ্রমিক খায়রুন আকতার বলেন, আগের সরকারের আমলে কেবল মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার চা–শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে। এখনকার সরকারও কেবল মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে চা খাত নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে চা–শ্রমিক বলতে গর্ব বোধ করি। আমি কখনোই নিজেকে কৃষিশ্রমিক বলতে রাজি নই।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ এম হাসেমী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বিসিএসইউ) ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল, চট্টগ্রাম জেলার বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি তপন দত্ত এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফি রতন। সভায় চা–বাগানের ২০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।