দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি সড়কের পাশে একদল শিক্ষার্থী কুরআন তিলাওয়াত করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও উপস্থিত রয়েছেন। কাছেই পাহাড়ি ছড়ায় উদ্ধারকর্মীর পোশাক পরিহিত ব্যক্তিদের কার্যক্রমও চালাতে দেখা যায়। নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার সঙ্গে জড়িয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু যাচাই করে দেখা যায ভিডিওটি নেপালের নয়, উদ্ধারকর্মীদের পোশাকেও অন্য দেশের নাম। এটি পুরোনোও। এ ধরণের আরও দুটি ভিডিও সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে। তবে যাচাই বলছে এর কোনোটিই নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার সময়কার নয়।
২৬ আগস্ট নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর ক্যাপশনে লেখা, ‘নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করছেন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।’ কোথাও আবার বলা হয়েছে, নেপালের বন্যাকবলিত এলাকায় আল্লাহর আজাব থেকে শহরকে রক্ষা করতে শিক্ষার্থীরা কুরআন পাঠ করছেন।
৫০ এর অধিক ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলে ভিডিওটি ছড়িয়েছে। ক্যাপশনগুলো একই ধাঁচের রকমফের।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
একই ভিডিও এক্সেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে লেখা হয়, ‘এটাই বিশ্বাসের শক্তি। ভিডিওটি নেপালের, যেখানে কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা হচ্ছে। মাশা আল্লাহ।’
লিংক: এখানে
তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি নেপালের নয়। এটি মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানের এবং ২০২৬ সালের জুনের।
ভিডিওটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের ছবি রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। সার্চে একটি সংস্করণ ২৫ জুন কিরগিজস্তানের চুই অঞ্চলের ‘Ministry of Emergency Situations’–এর প্রেস বিভাগের সঙ্গে যুক্ত একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পাওয়া যায়।
লিংক: এখানে
অ্যাকাউন্টটির বায়োতে উল্লেখ করা, এটি কিরগিজস্তানের চুই অঞ্চলের জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। ওই অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত অন্য ভিডিওগুলোতেও একই ধরনের ইউনিফর্ম পরা উদ্ধারকর্মীদের দেখা যায়। তাঁদের লাইফ জ্যাকেটেও স্পষ্টভাবে ‘Kyrgyzstan Rescue’ লেখা রয়েছে।
এ ছাড়া ২৬ জুন কিরগিজস্তানের একাধিক ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একই ঘটনার আরও ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, কিরগিজস্তানের কেগেতি উপত্যকায় পানিতে ভেসে যাওয়া ছয় বছরের এক শিশুকে উদ্ধারে অভিযান চলছিল।
২৫ জুন প্রকাশিত আরও কয়েকটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে একই দৃশ্য পাওয়া যায়। সেসব পোস্টে বলা হয়, উদ্ধার অভিযান চলাকালে ছয় বছরের ওই শিশুর জন্য মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কোরআন তিলাওয়াত করে প্রার্থনা করছেন।
কিরগিজস্তানের একটি সংবাদমাধ্যমের ২৬ জুনের প্রতিবেদনে ঘটনাটি সম্পর্কে জানা যায়, ২৩ জুন দুই নারী ও পাঁচ শিশুকে নিয়ে একটি গাড়ি কেগেতি নদীতে পড়ে যায়। দুই নারী ও তিন শিশু গাড়ি থেকে বের হয়ে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও ১২ বছরের এক মেয়ে ও ৬ বছরের এক ছেলে পানির স্রোতে ভেসে যায়।
লিংক: এখানে
পরবর্তী সময়ে উদ্ধারকারীরা মেয়েটির মরদেহ উদ্ধার করেন। তিন দিন ধরে অনুসন্ধানের পর ২৬ জুন ছয় বছরের ছেলেটির মরদেহও উদ্ধার করা হয়।
‘অক্ষত’ বুদ্ধমূর্তির ভিডিওটি ২০২৪ সালের
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যায় চারপাশের ঘরবাড়ি, সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একটি বিশাল বুদ্ধমূর্তি অক্ষত অবস্থায় রয়েছে, এমন দাবিতে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ‘নেপালে বিপর্যয়কর এবং ধ্বংসাত্মক বন্যার তীব্র স্রোতের মধ্যেও গৌতম বুদ্ধের একটি বিশাল প্রতিবিম্ব অটল এবং অক্ষত অবস্থায় স্থির হয়ে রয়েছে—অলৌকিক নয় বাস্তব।’
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার নয়। এটি ২০২৪ সালের বন্যার সময়কার। ভিডিওতে দেখা বুদ্ধমূর্তিটি নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের চিতওয়ান জেলার নারায়ণগড়ে নারায়ণী নদীর পাশে অবস্থিত। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের ছবি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ২০২৪ সালে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একই ভিডিও পাওয়া যায়।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
২০২৪ সালের ভিডিওগুলোর সঙ্গে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি মিলিয়ে দেখা হলে ক্যামেরার অবস্থান, ভিডিওর দৃশ্য, রং এবং মূর্তির পাশ দিয়ে পানির প্রবাহ—সবকিছুতেই মিল পাওয়া যায়।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে টানা মৌসুমি বৃষ্টিতে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধস দেখা দিয়েছিল। ওই সময় চিতওয়ান জেলার সিমালতাল এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসে ৬৫ জন যাত্রী নিয়ে দুটি বাস নদীতে ভেসে যায়।
লিংক: এখানে
সেই বন্যার সময় নারায়ণগড়ের একই বুদ্ধমূর্তির পাশ দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ার আরও ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ৭ জুলাই ২০২৪ নারায়ণগড়ে নারায়ণী নদীর পানি বুদ্ধমূর্তিটির পাদদেশে আঘাত করার একটি ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
লিংক: এখানে
নেপালের স্থানীয় ‘দৈনিক কান্তিপুর ডেইলির’ সাংবাদিক রমেশ কুমার পৌডেলের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও ৬ জুলাই ২০২৪ একই বুদ্ধমূর্তির পাশ দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ার ভিডিও ও সংবাদের ছবি পাওয়া যায়। এসব দৃশ্যের সঙ্গে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির মিল রয়েছে।
দুই এলাকা একই ভোটেকোশি–ত্রিশূলী–নারায়ণী নদী ব্যবস্থার অংশ হলেও তারা অনেক দূরে অবস্থিত। সাম্প্রতিক বন্যার মূল বিপর্যয় ঘটেছিল তিব্বত সীমান্তের কাছে উজানের এলাকায়, আর বুদ্ধমূর্তিটি রয়েছে অনেক নিচের দিকে চিতওয়ানে।
লিংক: এখানে
৪১ জনের ধর্মান্তরের ভিডিওটি সৌদি আরবের
নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পর ৪১ জন নেপালি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন—এমন দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও দাবি করা হয়েছে, ‘নেপালে ভয়াবহ মহাপ্লাবনের পরপরই ৪১ জন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন!’
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক, ষষ্ঠ লিংক
তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, দাবিটির সঙ্গে সাম্প্রতিক নেপালের বন্যার কোনো সম্পর্ক নেই। ভিডিওটি ২৬ আগস্ট নেপালে বন্যার ঘটনার অনেক আগেই অনলাইনে ছিল।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের ছবি রিভার্স ইমেজ সার্চ করে একই ভিডিওর একটি সংস্করণ ২০২৩ সালের ১১ জুন ইউটিউবে পাওয়া যায়। ভিডিওটির ক্যাপশনে ছিল, ‘নেপাল থেকে ৪১ জন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।’
লিংক: এখানে
অধিকতর যাচাইয়ে ২০২২ সালের ২৯ ও ৩১ জুলাই ফেসবুকে প্রকাশিত একই ধরনের কয়েকটি ছবিও পাওয়া যায়। সেসব পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, সৌদি আরবে ৪৪ জন নেপালি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
৩১ জুলাইয়ের একটি পোস্টে বলা হয়, সৌদি আরবের আল-দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ৪৪ জন নেপালি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। একই ছবির আরেকটি পোস্টও ২৯ জুলাই প্রকাশিত হয়েছিল।
ভিডিওটির স্থান সম্পর্কেও গুগল ম্যাপে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত গাজওয়া আল-মুতাইরি মসজিদের বিভিন্ন ছবি ও ফুটেজের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর দৃশ্য মিলিয়ে দেখা হয়। এতে ভিডিওতে দেখা স্থাপনা ও মসজিদের অবস্থানের মধ্যে মিল পাওয়া যায়।
লিংক: এখানে
তবে এখানে একটি বিষয় আলাদা করে উল্লেখ করা প্রয়োজন। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিরা সত্যিই ৪১ বা ৪৪ জন নেপালি কি না এবং তাঁরা ঠিক কবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, তা এই যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বরং যে ভিডিওটি ব্যবহার করে দাবিটি ছড়ানো হয়েছে, সেটি অন্তত ২০২৩ সাল থেকেই অনলাইনে রয়েছে এবং ভিডিওটির সঙ্গে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার কোনো সম্পর্ক নেই।