ইউএপিতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করেছে দঙ্গলবাজেরা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।

সংগঠনটি বলছে, শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য থাকায় সুপরিকল্পিতভাবে ও নানান অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাকে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে খর্ব করা হয়েছে। তা ছাড়া শিক্ষককে চাকুরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।

আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নিন্দা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রেস টিম।

বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বহু সংকট নিরসনের প্রত্যাশা ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বাক্‌স্বাধীনতা রক্ষা করা। বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বাক্‌স্বাধীনতা লালনেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু অভ্যুত্থান–উত্তর বাংলাদেশে এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে উগ্র দঙ্গলবাজেরা।

বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু স্বাধীন মতপ্রকাশ বা ভিন্নমত পোষণ করার কারণে অনেক শিক্ষককে হেনস্তা ও হয়রানি করা হচ্ছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ধর্মানুভূতিকে ঢালাওভাবে সস্তা ঢাল বানানো হয়েছে। এই প্রবণতার সর্বশেষ শিকার ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং তাঁকে সমর্থন করা ওই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মোহসীন।

শিক্ষক নেটওয়ার্ক জানায়, ভুক্তভোগী দুই শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যথাক্রমে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক। সচেতন মহল মাত্রই জানেন, কলা ও মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনে সমাজের প্রথাগত অনেক বিশ্বাস ও ধারণা নিয়ে একাডেমিকভাবেই ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। শিক্ষকেরা সেভাবেই পাঠদান ও জ্ঞানচর্চা করেন। কিন্তু, একজনের সঙ্গে অন্যজনের শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য থাকায় সুপরিকল্পিতভাবে ও নানা অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে তাঁকে চাকুরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।

শিক্ষক নেটওয়ার্ক মনে করে, লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ আমলে এনে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যা সত্যিকারার্থে বিদ্যায়তনিক চর্চার স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট।

শিক্ষক লায়েকা বশীর ১৭ বছর ধরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি তিনি নানাবিধ প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ও আনুষ্ঠানিক কর্মে এবং পদে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানায় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এ ছাড়া শিক্ষকতার নৈতিক অবস্থান থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যার সবচেয়ে বড় নজির জুলাই আন্দোলনে সম্মুখভাগে ভূমিকা পালন করা।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক স্বেচ্ছাচারী দঙ্গলবাজ শিক্ষার্থী ও তাঁদের প্রতি নমনীয় মনোভাব পোষণকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। সংগঠনটি জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই পরিস্থিতিতে এমন এক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও অগণতান্ত্রিক। দুজন শিক্ষকের প্রতি এমন অন্যায় আচরণে সহকর্মী হিসেবে শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্যরা অত্যন্ত সংক্ষুব্ধ।

শিক্ষক নেটওয়ার্ক পুরো ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নীরব ভূমিকায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। সংগঠনটি চারটি দাবি উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অবিলম্বে লায়েকা বশীর ও ড. সায়েম মোহসীনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া দঙ্গলবাজদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ ধরনের শিক্ষাবিরোধী অপতৎপরতা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরতদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকুরিচ্যুতির হুমকি প্রদান বন্ধ ও যথোপযুক্ত নীতিমালা বাস্তবায়ন করে তাঁদের কর্মজীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার স্পিরিটকে রক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক ধারণাকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে।