সত্যজিৎ রায় বহুমুখী প্রতিভার এক বিস্ময়কর প্রতিমূর্তি। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাই নন; ছিলেন একাধারে গল্পকার, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, অলংকরণশিল্পী, সম্পাদক ও প্রকাশক। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রে মানবজীবনের সহজ-সরল অথচ গভীর সত্যগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে, যেখানে গ্রামবাংলার মাটি, শহুরে জীবনের টানাপোড়েন ও মানুষের অন্তর্জগৎ একসূত্রে গাঁথা। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মেলবন্ধনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক স্বতন্ত্র ভাষা, যা আজও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ডাকটিকিট প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই বিশ্ববরেণ্য বাঙালি চলচ্চিত্রকারকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
ভারতীয় ডাক বিভাগ ১৯৯৪ সালের ১১ জানুয়ারি সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশ করে। সেটি ছিল দুটি ডাকটিকিটের সমন্বয়ে একটি সি–টেন্যান্ট (একাধিক ডাকটিকিটে একটি ধারাবাহিক দৃশ্য)। সি– টেন্যান্টের ছয় রুপি সমমূল্যের প্রথম ডাকটিকিটে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের একটি স্থিরচিত্র তুলে ধরা হয় এবং ১১ রুপি মূল্যের অন্য ডাকটিকিটে স্থান পেয়েছে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতিসহ ১৯৯২ সালে পাওয়া অস্কার সম্মাননার স্মারকচিহ্ন। ভারতের সাধারণ টিকিটেও (ডেফিনেটিভ স্ট্যাম্প) উঠে আসেন সত্যজিৎ রায়। জলছাপযুক্ত তিন রুপি সমমূল্যের সেই সাধারণ টিকিট প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালের ১ মার্চ।
ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র ডমিনিকা ২০০০ সালের ২১ এপ্রিল বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ছয়টি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। সেগুলোর মধ্যে প্রথম দুটি ডাকটিকিটেই স্থান পেয়েছেন সত্যজিৎ রায়। প্রথম ডাকটিকিটে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতির নিচে উল্লেখ করা হয় অশনি সংকেত চলচ্চিত্রের কথা। এটি ১৯৪৩ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা ববিতা অভিনীত চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। মুক্তির বছরেই এটি বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ‘স্বর্ণ ভালুক’ পুরস্কার জয় করে। দ্বিতীয় ডাকটিকিটে তাঁর নির্মিত আরেকটি চলচ্চিত্র মহানগর-এর একটি স্থিরচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। চিত্রে আরতি মজুমদারের চরিত্রে অভিনীত মাধবী মুখার্জি ও তাঁর শিশুপুত্র পিন্টু চরিত্রে অভিনীত প্রসেনজিৎ সরকারকে দেখা যায়। মহানগর ১৯৬৪ সালে শ্রেষ্ঠ পরিচালক ক্যাটাগরিতে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘রৌপ্য ভালুক’ পুরস্কার লাভ করে।
ভারত ও ডমিনিকার পর সত্যজিৎ রায় উঠে আসেন বাংলাদেশের ডাকটিকিটে। তাঁর শততম জন্মবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০২১ সালের ২ মে ১০ টাকা সমমূল্যের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। বহুরঙা এ ডাকটিকিটের ছিদ্রক দূরত্ব ১২.৫। নকশাকার শিল্পী সুমন্ত কুমার। এটি মুদ্রিত হয়েছিল এক লাখ কপি। ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত বিশ্ব ডাকটিকিট ক্যাটালগ স্ট্যানলি গিবনস–এ এটি বাংলাদেশের ১৪২৪ নম্বর ডাকটিকিট হিসেবে তালিকাভুক্ত।
সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস বাংলাদেশ। তিনি ১৯২১ সালের ২ মে তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সেই জন্মশহর কলকাতেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম, বিশেষ খাম, বিশেষ সিলমোহরসহ বিভিন্ন ডাক প্রকাশের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে আরও অসংখ্য স্যুভেনির ও স্মরণিকা।