‘টু–থার্ড মেজরিটি’ অভিশাপ, আবারও যেন ভোগ করতে না হয়: বদিউল আলম মজুমদার
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদে দুই–তৃতীয়াংশ আসনে মেজরিটি (সংখ্যাগরিষ্ঠতা) হলো অভিশাপ। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই অভিশাপ একাধিকবার এসেছিল। তাই নতুন করে সেই অভিশাপে যেন আবার পড়তে না হয়, সে জন্য অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
আজ সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে এ কথা বলেন বদিউল আলম মজুমদার। ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল ও গুম প্রতিরোধ/প্রতিকার অধ্যাদেশ স্থগিত: সুশাসন ও মানবাধিকারের অগ্রযাত্রার প্রতি হুমকি’ শীর্ষক এই নাগরিক সংলাপের আয়োজক ভয়েস ফর রিফর্ম।
‘কার্স অব টু-থার্ড মেজরিটি’র (দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিশাপ) উদাহরণ হিসেবে ১৯৭৩, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই ইতিহাসের শিক্ষা নিতে হবে যে আবারও যেন টু-থার্ড মেজরিটির ওই যে অভিশাপ, যেন এটা ভোগ না করতে হয়।’
যখনই কোনো দল সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তখনই তার পরিণতি দেশের জন্য নেতিবাচক হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সুজন সম্পাদক। তিনি বলেন, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পাওয়ার ফলে সংবিধানের বিতর্কিত সংশোধন, বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ এবং নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগের মানসিকতাকে তিনি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিশাপ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কোনো কমিশনে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের বাইরে দু-একজন সদস্যের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের কারণে মূল সুপারিশ অগ্রাহ্য করা অসংবিধানিক ও অযৌক্তিক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘নোট অব ডিসেন্ট’–কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে জনগণের সম্মতিকে উপেক্ষা করার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ বলেন তিনি।
সংসদের সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের সংসদ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মতো সার্বভৌম নয়। যেহেতু বাংলাদেশে একটি লিখিত সংবিধান রয়েছে, তাই সংসদ সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়, বরং সংবিধানের অধীনে পরিচালিত।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম। গুমের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অমানবিক প্রথা বন্ধ করা সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকারের অনেক ব্যক্তি গুমের শিকার। কিন্তু যাঁরা নিজেরা গুমের শিকার, তাঁরা এই প্রথাকে বন্ধ করতে এত আপত্তি কেন করবেন, সেটা বোধগম্য নয়।
শহিদুল আলমের মতে, রাজনীতিকদের কথা ও কাজের অমিল এবং নিয়ন্ত্রণের অভাব দুর্নীতি ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। গদি পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে সুফল পাওয়া যায় না। তিনি আয়নাঘরের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের অস্ত্র হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং এই অমানবিক ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মানজুর–আল–মতিন। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণসংক্রান্ত অধ্যাদেশ দ্রুত গৃহীত হলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকারী আইনটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও গুম বন্ধের ম্যান্ডেট রক্ষায় সরকারকে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিচার বিভাগ স্বাধীন করার আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষমতাসীনরা মেজরিটির বড়াই করে সংস্কার থেকে পিছিয়ে গেলে চব্বিশের মতো আরেকটি গণ–অভ্যুত্থান কোনো না কোনো সময় শুরু হবে বলেন কুমিল্লা–৪ আসনের ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন না হলে জাতি আবারও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা বলেন, বিচারের সুশাসন ও স্বাধীনতা নিশ্চিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং গুমবিরোধী অধ্যাদেশ কার্যকর রাখা জরুরি। এগুলো বাতিল বা দুর্বল করলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ বাড়বে এবং অপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া তাসনিম জারা আরও বলেন, সফল অভ্যুত্থানের পর তাই পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে না গিয়ে নাগরিক অধিকার রক্ষায় বিদ্যমান আইনি সরঞ্জামগুলো আরও শক্তিশালী ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী, রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার প্রমুখ।