বর্তমানে গণমাধ্যমে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছে। অপসাংবাদিকতাসহ নানা কর্মকাণ্ডের কারণে এক শ্রেণির গণমাধ্যম প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এ জন্য সঠিক সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই প্রেক্ষাপটে সরকার গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগ আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু কমিশনকে হতে হবে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত এবং প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। এটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে লাভ হবে না। একইসঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। একইসঙ্গে সাংবাদিকতার সুরক্ষার জন্য গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষেরও যথাযথ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
‘গণমাধ্যম কমিশন: সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা। আজ শনিবার রাজধানীতে ডেইলি স্টার সেন্টারে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস)।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, আশার কথা শোনা যাচ্ছে যে নতুন সরকার একটা গণমাধ্যম কমিশন করবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংস্কার কমিশন বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছিল। তার মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য কিছু সুপারিশও দেওয়া হয়। কিন্তু ওই সরকার আশ্বাস দিলেও কিছুই করেনি। এখন নতুন সরকার যদি সেই উদ্যোগ সঠিকভাবে এগিয়ে নেয়, তাহলে অবশ্যই সরকারকে সাধুবাদ জানাতে হবে।
পূর্ব অভিজ্ঞতা টেনে কামাল আহমেদ আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কমিশন হয়, কিন্তু যে উদ্দশ্যে হয় সেই উদ্দেশ্যে অর্জিত হয় না। কমিশন সরকারের অধিপ্তর বা বিভাগের মতো কাজ করতে শুরু করে। এ কমিশন যাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য গঠিত হবে, সেই উপকারভোগীরা (গণমাধ্যম) যদি সব সময় সতর্ক না থাকে, চাপ বজায় না রাখে তাহলে এ কমিশনও কোনোদিন সফল হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, যে গণমাধ্যম কমিশন তৈরি হবে, প্রত্যাশা থাকবে সেটা যেন বিচ্ছিন্ন কোনো কিছু না হয়। সেটা এমনভাবে তৈরি হোক, যাতে সব সময় অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এবং তাদের মতামত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে।
অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্সের (অ্যাটকো) মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম নানা সংকটের কথা তুলে ধরে টেলিভিশন ও সংবাদপত্র শিল্প ভালোভাবে ঠিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বর্তমান মিডিয়া শিল্পকে ঠিক না করলে কোনো কমিশন কাজ করবে না বলে মনে করেন ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ। তিনি বলেন, কমিশন কোথায় কাজ করবে, সেই পরিবেশটা তো তৈরি হতে হবে?
সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, সেলফ রেগুলেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে নিজেদের ঘাটতি ঠিক করা জরুরি।
মতবিনিময় সভার শুরুতেই স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান। তিনি বলেন, তাঁরা চান সবার মতামতের ভিত্তিতে এই কমিশন করা হোক। এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের খসড়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন।
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল, আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন, দ্য ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি, চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, সংবাদ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন, যশোরের দৈনিক গ্রামের কাগজ পত্রিকার সম্পাদক মবিনুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি পান্থ রহমান, সাংবাদিক জিমি আমীর প্রমুখ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রেজোয়ানুল হক, যমুনা টেলিভশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ, আইএমএসের কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ।