‘ইউএন বাংলা’ ফন্টের কারিগর তিনি
‘বাংলা বর্ণমালা নিয়ে কাজে আবেগটা বেশি কাজ করে। ইউএন বাংলা ফন্টটি জাতিসংঘের জন্য করা। এটি আমার জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া।’ এভাবেই কথাগুলো বললেন মো. মুহিববুর রহমান। তিনি ‘ইউএন বাংলা’ ফন্টটি তৈরি করেছেন।
এবারের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ইউএন বাংলা ফন্ট ইউনিকোডে এনেছে বাংলাদেশে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। গতকাল সোমবার ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার ও শুভেচ্ছাদূত অভিনেত্রী জয়া আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্করণটি প্রকাশ করেন।
ইউএন বাংলা ফন্ট তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন মুহিববুর। তিনি বাংলা টাইপফেস ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট ও মোশন গ্রাফিক নিয়ে কাজ করেন। সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে মুহিববুর ইউএন বাংলা ফন্টসহ তাঁর অন্যান্য বাংলা ফন্ট নিয়ে কাজের গল্প শোনান।
মুহিববুর পরিচিতজনদের কাছে ‘রাজন’ নামে পরিচিত। ইউএন বাংলা ছাড়াও তাঁর ডিজাইন করা টাইপফেসের মধ্যে রয়েছে—রাজন শৈলী, রাজন প্রংশু, রাজন আঁকিবুঁকি। রাজন শৈলী ও রাজন প্রংশু টাইপফেস দুটি ২০১৪ সালে সবার জন্য বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করেন তিনি।
বিভিন্ন সংবাদপত্র ও বেসরকারি টেলিভিশনে বাংলা ফন্ট নিয়ে কাজ করেছেন মুহিববুর। তিনি এখন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রধান ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত। তাঁর তৈরি টাইপফেস বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে।
মুহিববুর জানান, তিনি ইউএনডিপি বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং কনসালট্যান্ট হিসেবে অনেক আগে থেকেই কাজ করছেন। এই দায়িত্বের বাইরে তিনি ইউএন বাংলা ফন্ট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইউএনডিপি বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে আসছেন।
২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ইউএন বাংলা ফন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে ইউএনডিপি বাংলাদেশ। তখন শুধু বিজয় সফটওয়্যারে ফন্টটি ব্যবহার করা যেত। কিন্তু এখন ফন্টটি ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহারের জন্য ইউনিকোড রেগুলার ভার্সনে আনা হয়েছে। পরে প্রয়োজন হলে ফন্টটির আরও উন্নয়ন করা হবে বলে জানান মুহিববুর। তিনি বলেন, উন্নয়নের এই কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া।
পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা করেছেন মুহিববুর। তিনি বলেন, হাতের কাছে অসংখ্য ইংরেজি ফন্ট আছে। এতে নানান বৈচিত্র্যও আছে। সে তুলনায় বাংলা ফন্ট নিয়ে তেমন কাজ হচ্ছে না। আর কাজ হলেও নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা বর্ণমালাগুলোই বিকৃত করে ফেলা হচ্ছে।
মুহিববুর জানান, নির্ভুল ও নান্দনিক ফন্ট তৈরি করতে হলে বাংলা বর্ণ কতটি, যুক্তাক্ষর কতটি, ‘কার’ (স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ) ও ‘ফলা’ (ব্যঞ্জন বর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপ) কী কী, কোন বর্ণের সঙ্গে বসলে কী আকার ধারণ করে, তা নিয়ে যথেষ্ট ধারণা থাকতে হয়। যেমন বাংলা বর্ণমালায় বর্ণসংখ্যা ৫০টি (স্বরবর্ণ ১১টি ও ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি)। কিন্তু এর যুক্তাক্ষর সংখ্যা ২০০টির বেশি। এর মধ্যে অনেক যুক্তাক্ষর আছে, যেগুলো দুটি বর্ণ মিলে ভিন্ন একটি আকার ধারণ করে। ফন্ট তৈরির ক্ষেত্রে শুধু আলাদাভাবে ৩০০টির মতো ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের আকার তৈরি করলেই হয় না; একটি বর্ণের সঙ্গে আরেকটি বর্ণ যোগ করলে যেন সামঞ্জস্য থাকে, দেখতে যেন একই রকম মনে হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়।
ইউএন বাংলা ফন্ট নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মুহিববুর বলেন, ইউএন লেখাটি কীভাবে লেখা হয়, তার সঙ্গে মিল রেখে প্রথমে ফন্টটি কেমন হতে পারে, তা কল্পনা করেছেন তিনি। এরপর প্রতিটি বর্ণ কাগজে পেনসিল দিয়ে এঁকে বিভিন্নভাবে দেখতে হয়েছে তাঁকে। নতুন ফন্ট মানেই হলো, তা অন্য কোনো ফন্টের সঙ্গে মিলবে না। এমনকি কাছাকাছিও হতে পারবে না। তাই পরিশ্রমটা একটু বেশিই করতে হয়েছে।
ফন্টের নামের বিষয়ে ডিজাইনার মুহিববুর বলেন, নামটা যাতে মানুষ মনে রাখতে পারে, সহজেই সার্চ দিতে পারে, নামকরণের ক্ষেত্রে তা মাথায় রাখতে হয়। আবার ফন্টের বৈশিষ্ট্য কেমন, তা–ও নামের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হয়। সব মিলিয়ে ফন্টটি সুন্দর হলে তা পাঠকের মনে গেঁথে যায়। এ ক্ষেত্রে প্রথম আলোর নিজস্ব ফন্টের উদাহরণ দিয়ে এই ডিজাইনার বলেন, এই পত্রিকার যেকোনো অংশ দেখলেই পাঠক চট করে বুঝতে পারে যে এটা প্রথম আলো।
মুহিববুর বলেন, বাংলা ফন্ট তৈরির প্রক্রিয়াটা ইংরেজি ফন্ট থেকে অনেকটা কঠিন, জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে অনেক ডিজাইনার বাংলা ফন্ট নিয়ে কাজ শুরু করে কিছুদিন পর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এই আগ্রহ হারিয়ে ফেলার অন্যতম কারণ হতে পারে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। তাই এই কাজে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বাংলায় প্রতিবেদন তৈরিসহ বিভিন্নভাবে বাংলা ভাষা ব্যবহার করছে। ইউএনডিপি বাংলাদেশের ফেসবুক পেজের বিভিন্ন পোস্ট বাংলায় লেখা হচ্ছে। ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসও তাদের ওয়বসাইট ও ফেসবুক পেজে বাংলা ভাষা ব্যবহার করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা ফন্ট নিয়ে কাজের অনেক সম্ভাবনা দেখছেন মুহিববুর। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর তাগিদ দেন তিনি।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ দিবসটি জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোতে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। বর্তমানে জাতিসংঘের কাজে ছয়টি ভাষা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয়। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষাগুলো হলো ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, আরবি, রুশ ও চীনা। বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার আহ্বান জানিয়েছে আসছে বাংলাদেশ।