‘মিম গ্যাসের কারণে মারা গেছে, সুপারভাইজার বলছে আগুন কম, নিভা যাইব’
‘আমার মিম গ্যাসের তাপের কারণে মারা গেছে। কারখানার সুপারভাইজার তাদের বের হতে দেয় নাই। সুপারভাইজার বলছিল আগুন কম, নিভা যাইব; তোমরা বইসা থাকো এখানে। আমার মিম বের হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করছে, পারে নাই।’—এভাবেই আহাজারি করছিলেন কেরানীগঞ্জের কদমতলীতে গ্যাসলাইটার কারখানায় মারা যাওয়া মিমের বাবা মো. দেলোয়ার হোসেন খান।
আজ শনিবার কদমতলী চৌরাস্তার আল বারাকাহ হাসপাতালের পাশের গ্যাসলাইটার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে এ পর্যন্ত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে কে নারী, কে পুরুষ তা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। পরে মরদেহগুলোর মধ্যে তিনজন নারী বলে পুলিশ নিশ্চিত করে। এই তিনজনের একজন মিম আক্তার পাখি।
আজ বেলা ১টা ১১ মিনিটে আগুন লাগে। দেড় ঘণ্টা চেষ্টার পর বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভাতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস।
বিকেল চারটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের পরিদর্শক মো. আনোয়ারুল ইসলাম পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের এ তথ্য জানান। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিটফোর্ড) মর্গ থেকে জানা যায়, পাঁচজনের মধ্যে এ পর্যন্ত তিনজনের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে একজনের পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। অন্য দুজনের পরিবারের কেউ এখনো যোগাযোগ করেনি। বাকি দুজনের লাশ এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
মিমের বাবা মো. দেলোয়ার হোসেন খান অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার মিমের শরীরের কোনো অংশ পুড়ে যায়নি। তার শরীরের জামাকাপড়েও পোড়া দাগ নেই। সে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেছে। যারা কারখানার ভেতরে ছিল, তাদের বের হওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় মারা যায়।’
প্রতিদিন মিম দুপুরে বাসায় ভাত খেতে আসত। সোয়া একটার দিকে বাসায় এসে ভাত খাওয়ার কথা তার। ঠিক এর তিন-চার মিনিট আগেই আগুন লাগার খবর শুনতে পান দেলোয়ার। তিনি বলেন, কারখানার ভেতরে অনেকগুলো দরজা ছিল। সুপারভাইজার তাদের বের হতে না দেওয়ায়, কেউ বের হতে পারেনি। কয়েকজন দেয়াল টপকে ওপর দিয়ে বের হয়ে আসে।
দেলোয়ার হোসেন খান কেরানীগঞ্জের কদমতলীর ওই গ্যাসলাইটার কারখানার পাশে একটি বাসায় দারোয়ানের কাজ করেন। সেই বাসাতেই বাবা–মেয়ে থাকতেন। আজ সকাল সাতটার দিকে কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন।
দেলোয়ার বলেন, ‘আগুন লাগার সময় আমি বাসার পানির পাম্প চালু করছিলাম। তখন একজন বলল আগুন লাগছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম কোথায়? বলল ওই পারে। আমার বাসা থেকে চার-পাঁচটা বাসার পর ওই কারখানা। তারপর মিমরে কল দিলাম, রিং বাজে। দুই-তিনটা রিং হলো। মিম কল ধরে না। এদিক দিয়ে আমি দৌড়ে দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করলাম। মানুষের ভিড়ে সামনের দিকে আগাতে পারলাম না আর। আমার মাইয়া আর আইব...না, আমার মাইয়াকে ওরা মাইরা ফালাইছে।’
মিমের ডাকনাম পাখি। কারখানায় সবাই তাকে পাখি নামে চেনে। বয়স আনুমানিক ১৭ বছর। তার চার বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। স্বামী কারাগারে। সন্তানকে শাশুড়ির কাছে রেখে বাবার সঙ্গে এখানে থেকে চাকরি করছিল মিম। এই কারখানায় তিন থেকে চার মাস কাজ করছিল। ঈদের ছুটির পর গত রোববার কাজে যোগ দেয়।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এই বাবা আহাজারি করছিলেন আর বলছিলেন, প্রতিদিন সকালে কারখানায় মেয়েকে নাশতা দিতে যেতেন। আজ মেয়ে হলুদ রঙের জামা পরে এসেছিল।