ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি, আর কী যুক্ত হলো, কী বাদ গেল
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হওয়ার আগে সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামের আলোকচিত্র ও নিদর্শনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল ছবি ছিল। গতকাল রোববার সংগ্রহশালা উন্মুক্ত করার পর সেই ছবিগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের একক ছবি বাদ দেওয়ার পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি।
সংগ্রহশালায় সাঁটানো মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি আজ সোমবার ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন করার প্রতিবাদে জামায়াতের সাবেক আমির, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত (পরে প্রয়াত) গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার ছবি সংগ্রহশালায় টাঙিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা।
বর্তমানে সংগ্রহশালায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছেষট্টি সালের ছয় দফা, আটষট্টির আগরতলা মামলা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি নেই। তবে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত অংশে ১৯৭৪ সালের বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলের বিয়ের ছবি ও কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর একটি সংবাদ রাখা হয়েছে।
সংগ্রহশালায় রাখা (দুপুর পর্যন্ত) মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবির একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের সময়ের ছবি। ওই বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন। আরেকটি ১৯৪০ সালের লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের দলগত ছবি। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের কাটিং।
এ ছাড়া সংগ্রহশালায় এ কে ফজলুল হক, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবি রাখা হয়েছে।
কেন বাদ বঙ্গবন্ধুর ছবি
সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে তাঁর কোনো ছবি রাখা হয়নি। তবে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত তিনটি পেপার কাটিং বাঁধাই করে রাখা হয়েছে। ‘বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই’ শীর্ষক সংবাদের পেপার কাটিং এবং চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের দুটি ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে সংগ্রহশালার সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর “ফ্যাসিবাদের সব আইকনের” ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আমি সরিয়েছি এমন নয়।’
নতুন করে সংগ্রহশালা সাজানোর সময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে ৭ মার্চের বিষয়টি যুক্ত করেছি, ছয় দফা আন্দোলনের বিষয়টি যুক্ত করেছি এবং সেক্টর কমান্ডারদের ছবিও যুক্ত করেছি। ১৯৭১-পরবর্তী মুজিবের ছবিও আছে, ১৯৭১-পূর্ববর্তী মুজিবের ছবিও আছে।’ বঙ্গবন্ধুর একক ছবি না রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, একক ছবি রাখা হয়নি—এটা ঠিক নয়। ছয় দফা আন্দোলনের একক ছবি আছে। ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে একটি কাঠের আর্টওয়ার্কও রাখা হয়েছে।
তবে পুরো সংগ্রহশালা ঘুরে ছয় দফা আন্দোলনের শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি দেখা যায়নি।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখার বিষয়ে ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, জিন্নাহর ছবির সঙ্গে একটি ক্যাপশন রয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর দেওয়া একটি বক্তব্যের সূত্রে ছবিটি রাখা হয়েছে। জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করা বা তাঁর পক্ষে কোনো কিছু দেখানো হয়নি; বরং তিনি যেসব ইভেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেগুলোর ছবিই রাখা হয়েছে।
বদলেছে উপস্থাপনা
সংস্কারের পর সংগ্রহশালায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের নানা আলোকচিত্র রাখা হয়েছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদ থেকে শুরু করে সে সময়ের আন্দোলনের কিছু দৃশ্য ও মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাসহ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবি রাখা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর মুখাবয়ব, সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবি স্থান পেয়েছে সংগ্রহশালায়। এসব ছবির নিচের দিকে মুক্তিযুদ্ধে একটি খোদাই চিত্র আছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুও আছেন।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলের ছবি হিসেবে খাল খনন; খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের একসঙ্গে একটি স্থিরচিত্র; জিয়াউর রহমানের যুদ্ধের সময়ের দুটি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের একটি ছবি স্থান পেয়েছে।
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ১৪টি স্থিরচিত্র সেখানে রাখা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে শহীদ নূর হোসেনের শরীরে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা সেই আইকনিক ছবি। এ ছাড়া ডাকসুর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত শহীদদের তালিকা, শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াসহ আরও কয়েকটি ছবি সেখানে রাখা হয়েছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে ১৯৯১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের বিশেষ কোনো স্থিরচিত্র পাওয়া যায়নি।
সংগ্রহশালায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ, কবি জসীমউদ্দীন, আবুল কাশেম ফজলুল হক, মুনীর চৌধুরী, আবুল ফজলসহ বরেণ্য সাহিত্যিকদের ছবি স্থান পেয়েছে। স্থান পেয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর থেকে লাশ আনা, জানাজা এবং কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফনের ছবি।
রাব্বানী-রাশেদের নাম নেই ড্যাশবোর্ডে
ঐতিহাসিক ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ীদের ড্যাশবোর্ডে ২০১৯ সালে নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরের নাম লেখা হলেও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বিজয়ীর নাম খালি রাখা হয়েছে। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে বিজয় লাভ করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের (বর্তমান নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রত্ব না থেকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠলে বর্তমান প্রশাসন পদ বাতিল করে জিএস ঘোষণা করেন রাশেদ খানকে (প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা)।
এ বিষয়ে ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো একটি বিতর্ক রয়েছে। সিন্ডিকেট থেকে বিষয়টি পাস হলেও এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। আবার গোলাম রব্বানীর জিএস পদে থাকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পদটি ফাঁকা রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে আবার নতুন করে কাউকে ওই পদে বহাল করার নিয়ম নেই। এ নিয়ে বিরোধ ও বিভ্রান্তি আছে। তাই আপাতত পদটি খালি রাখা হয়েছে। বিষয়টির সমাধান হলে নাম যুক্ত করা হবে।