নুর চেহের বেগম
ছবি: প্রথম আলো

চট্টগ্রাম নগরের সল্টগোলা ক্রসিং মোড়। রাস্তার পূর্ব পাশে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ চলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা। টার্মিনালের ভেতরে সারি সারি কনটেইনার। এর মধ্যে একটি অংশে রয়ে গেছে কিছু গাছ।

আর এই টার্মিনালের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ৮৭ বছর বয়সী নুর চেহের বেগমের। টার্মিনালের ভেতরে ছিল তাঁর স্বামী আলীম উল্লাহর পৈতৃক ভিটা। সেই ভিটা নিয়ে নেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। উচ্ছেদের নোটিশ পেয়ে মারা যান স্বামী। প্রশাসনের ভুলে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নেয় অন্যরা। কিন্তু হাল ছাড়েননি নুর চেহের বেগম। ৩৮ শতক জমির ক্ষতিপূরণের জন্য ৪০ বছরের দীর্ঘ লড়াই তাঁর। ৩০ বছর আগে আদালতের রায়ও পেয়েছেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণের টাকা এখনো পাননি।

বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে ৩ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক শুনানিতে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শাহ আলম বীর উত্তম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শুনানিতে বন্দরের অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুর চেহের বেগম ও তাঁর ছেলে মিজানুর রহমান।

চট্টগ্রাম বন্দরের একটি প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার পরও ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি বৃদ্ধা নুর চেহের বেগম।

স্বামীর মৃত্যু, বেঁচে থাকার লড়াই

চট্টগ্রাম নগরের সল্টগোলা ক্রসিং মোড় এলাকায় ছিল নুর চেহের বেগমের স্বামী আলীম উল্লাহর বসতভিটা। স্থানীয় একটি মাজারের খাদেম ছিলেন তিনি। আজ থেকে ৪০ বছর আগে তাঁর জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। ১৯৮২ সালের ১৯ মার্চ জমি থেকে উচ্ছেদের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল আলীম উল্লাহকে। এর আগে ক্ষতিপূরণ বা আগাম কোনো নোটিশ পাননি। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে নোটিশ পাওয়ার দুই দিনের মাথায় ২০ মার্চ ভোরে মারা যান আলীম উল্লাহ। এরপর ঠাঁই হয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পাশের এলাকা তক্তার পোল এলাকায় ভাড়া বাসায়। সেখানে বিধবা বড় মেয়ে বিবি আয়েশা ও ছেলে মিজানুর রহমানকে নিয়ে থাকেন নুর চেহের বেগম।

৪ আগস্ট সকালে সেখানে কথা হয় নুর চেহের বেগম ও মিজানুর রহমানের সঙ্গে। পুরোনো দিনের প্রসঙ্গ তুলতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল এই বৃদ্ধার। তিনি বলেন, লোকজনের পরামর্শে তখন কাপড় বিক্রি শুরু করেছিলেন। আরেকটু বাড়তি আয়ের জন্য বিয়েবাড়িতে মসলা বাটার কাজও করতেন।

স্বামীর মৃত্যুর দুই দিন পর জন্ম হয় ছেলে মিজানুর রহমানের। এরপর ভিটা হারানোর ক্ষতিপূরণের জন্য মাঠে নামলেন তিনি। জমির মালিকানা ও ক্ষতিপূরণের জন্য ১৯৮৯ সালে আদালতের আশ্রয় নিয়েছিলেন নুর চেহের বেগম। ১৯৯০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন। এই রায় পাওয়ার পর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য ১৯৯২ সালে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন তিনি। বন্দর কর্তৃপক্ষকেও একাধিকবার চিঠি দেন। বিষয়টি নিয়ে নুর চেহের বেগম, জেলা প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ২০ বারের বেশি চিঠি চালাচালি হয়। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।

ভুল প্রশাসনের, ভুগছেন নুর চেহের

জেলা প্রশাসন ও বন্দরের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিউমুরিং জেটির পণ্য রাখার স্থান নির্মাণের জন্য দক্ষিণ হালিশহর মৌজার ৭২ দশমিক ২৫ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। এর ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৭ লাখ ১৭ হাজার টাকা জেলা প্রশাসনকে পরিশোধ করা হয়। জেলা প্রশাসন ১৯৮৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জমি বন্দর কর্তৃপক্ষ বুঝিয়ে দেয়।

নুর চেহের বেগমের স্বামীর ৩৮ শতক বা ২৩ কাঠা জায়গা অধিগ্রহণ হয়েছিল। এই এলাকায় অবস্থানভেদে প্রতি শতক জায়গার বাজারদর
প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা এবং মৌজা দর ১০ লাখ টাকা বলে জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক। এই হিসাবে বাজারদর অনুযায়ী
নুর চেহের বেগমের জমির দাম আসে ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

নুর চেহের বেগমকে দেওয়া বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি চিঠিতে বলা হয়, নুর চেহেরের স্বামী আলীম উল্লাহর বাবা সুলতান আহাম্মদের ওয়ারিশ পরিচয় দিয়ে আবুল খায়ের ও আবু ছৈয়দের পক্ষে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা থেকে জমির ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নিয়েছেন। তাঁরা মূল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বঞ্চিত করে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলেছেন। এই টাকা উদ্ধারের জন্য ১৯৯৪ সালে জেলা প্রশাসন ছয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছয়টি সার্টিফিকেট মামলা করেছে। সেই মামলা এখনো চলছে। এই মামলা এত দিন চলার কথা না বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়াউদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাবে বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলে আছে।

এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে বিষয়টির সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষকেও সে অনুরোধ করা হয়েছে। মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে বলে জানান তিনি।

নুর চেহেরের ছেলে মিজানুর ২০১৩ সালে বন্দরে নিরাপত্তা কর্মীর চাকরি পান। তবে জমির ক্ষতিপূরণের আদায়ের জন্য বিভিন্ন সংস্থায় ধরনা দেওয়ার কারণে ছেলে মিজানুর রহমানের ওপর বন্দর কর্তৃপক্ষ ক্ষিপ্ত বলে অভিযোগ করেন নূর চেহের বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নূর চেহের বেগম চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘বাচ্চার (ছেলের) জন্য ভয় লাগতেছে। ওরা আমার ছেলের ভাত কেড়ে নিতে চায়। এসব শুনে ভয় করে। যদি ছেলের চাকরি চলে যায় তাহলে আমরা কই যাব?’

ক্ষতিপূরণের টাকা আদায়ে লড়াই করতে করতে এখন ক্লান্ত আর অসুস্থ এই বৃদ্ধা। জীবনের শেষ মুহূর্তে তাঁর একটা চাওয়া, ভিটা থেকে উচ্ছেদের ক্ষতিপূরণের টাকা আর পুনর্বাসনের যেন ব্যবস্থা করা হয়।

ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ৪০ বছর ধরে একজন নারীর বিভিন্ন সংস্থার দুয়ারে দুয়ারে ঘোরার বিষয়টিকে জাতির জন্য দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন সনাক-টিআইবির চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক অবিচার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এটা তার প্রমাণ। ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়া ভুলের দায় প্রশাসনের।